সন্ত্রাসী মাস্তানরা দলের বোঝা

আনোয়ার হোসেন || (চেয়ারম্যান নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ এবং সভাপতি নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগ) ০৯:৪৬ পিএম, ২৫ আগস্ট ২০২০ মঙ্গলবার

সন্ত্রাসী মাস্তানরা দলের বোঝা

১৯৭৪ সাল। দেশে তখন খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। উদ্দেশ্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা তহবিল গঠন করেছিলাম, সেটা বঙ্গবন্ধুর হাতে দেয়া। নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন সংসদ সদস্য একেএম সামসুজ্জোহা সাহেবের নেতৃত্বে তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি রোকনউদ্দিন এবং আমি সাধারণ সম্পাদক গেলাম বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। বঙ্গবন্ধু আমাদের খোঁজখবর নিলেন, ছবি তুললেন, নানা পরামর্শ দিলেন। তখন আমরা তরুণ, ছাত্র রাজনীতি করি। বঙ্গবন্ধু আমার কাঁধে হাত দিলেন। জাতির পিতার হাত আমার কাঁধ স্পর্শ করেছে এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এটা আমি কখনও ভুলতে পারব না।

অনেক কথার মধ্যে এক সময় বঙ্গবন্ধু আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘তোদের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে আমাকে টাকা দিলি। তোরা এখন না খেয়ে কাহিল হয়ে পড়লে তখন আমি কী করব?’ তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের জ্ঞানের খুব অভাব। মানুষের জ্ঞান না থাকলে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব নয়। সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ প্রয়োজন। কিন্তু দেশে তো সোনার মানুষের অভাব। চারদিকে চাটুকার আর চাটুকার।’ বঙ্গবন্ধু অনেক দুঃখের কথা আমাদের বললেন, আমাদের লেখাপড়ায় মনোযোগ দেয়ার পরামর্শ দিলেন।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের সকালে রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর ডালিমের ঘোষণা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। এখন কী করা উচিত সে ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতারা দিশেহারা। তখন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সামসুজ্জোহা সাহেব। তিনি বললেন, ‘সবাই সেভ সাইডে চলে যাও’। কিন্তু আমরা একটা কিছু করতে চেয়েছিলাম।

আমি ও ছাত্র ইউনিয়নের রোকনউদ্দিন মিলে কি করা যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলাম। রোকনউদ্দিন তখন তোলারাম কলেজের ভিপি আর আমি জিএস। কিছু একটা যে করা দরকার তাতে আমরা দু’জনই একমত। প্রতিবাদী মিছিল করার চিন্তা এলো মাথায়। কিন্তু এ সময়ে কীভাবে মিছিল করব! ১৬ কিংবা ১৭ আগস্ট, তারিখটা ঠিক মনে নেই। নারায়ণগঞ্জ শহরে আমার ও রোকনের নেতৃত্বে মিছিল হলো। শহরের ডিআইটি মসজিদের সামনে থেকে সেøাগান ধরলাম ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই’। টার্গেট ছিল দুই নম্বর রেল গেট পর্যন্ত যাওয়া। কিন্তু দুই নম্বর গেট পর্যন্ত যেতে পারিনি, দু’দিক দিয়ে পুলিশ দৌড়ে এলো আমাদের ধরতে। কেউ চুনকা পাঠাগারের গলি দিয়ে, কেউ দুই নম্বর রেল গেটের দেওভোগের গলির দিকে ছুটে পালালেন। ঝটিকা মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। ওটাই ছিল মুজিব হত্যার প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জে প্রথম বিক্ষোভ মিছিল।

ওই যে বঙ্গবন্ধুর স্পর্শ আমাদের শরীরে ছিল সেই তাড়না থেকেই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আমরা মিছিলটি করেছিলাম। তখন কে যে কার লোক সেটা বিশ্বাস করা যেত না। আমরা কোরআন শরিফ আর বঙ্গবন্ধুর ছবি রেখে শপথ করাতাম যে, আমরা বঙ্গবন্ধুর হত্যা প্রতিবাদী লড়াইতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছি। এরপরই পাড়া-মহল্লায় লোকজনকে একত্র করেছি। এই সাহস দেখানোর কারণে জেল হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ আমরা করতে পেরেছিলাম।

বঙ্গবন্ধুর সব সময় খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করেছেন। স্বাধীনতার আগে মওলানা ভাসানী তাকে নির্বাচনে অংশ না নিতে বলেছিলেন। ব্যালট বাক্সে লাথি মারতে বলেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, ব্যালট বাক্সে লাথি মেরে বাংলাদেশ স্বাধীন করা যাবে না। বাংলাদেশের নেতা কে সেটা জনগণ থেকে স্বীকৃতি পেতে হবে। ’৭০-এর নির্বাচনে সেটা প্রমাণিত হয়েছে। ফলে স্বাধীনতার ডাক দিতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হোসেন সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলার মতো নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু আঙুল উচিয়ে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে স্বাধীনতার ডাক দেয়ার মতো নেতা একজনই। বঙ্গবন্ধুর মতো নিঃস্বার্থ নেতা দ্বিতীয় কেউ সৃষ্টি হয়নি।

মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভালো ছাত্রদের খুব পছন্দ করতেন তিনি। শিক্ষার ওপর অনেক জোর দিতেন। বলতেন, রাজনীতিতে শিক্ষিত লোক দরকার।

যতদিন বেঁচে থাকব বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো মনে রাখব। যতই বাধাই আসুক আমি তা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের লড়াইয়ে অগ্রগামী থাকব। বঙ্গবন্ধুর সেই কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। আমার ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এমন কোন কাজ করিনি যাতে থানায় আমার নামে একটা জিডি হয়। অন্তত আমাকে মানুষ খারাপ লোক বলবে এমন কাজও কখনও করিনি, তেমন কাজ প্রশ্রয়ও দেইনি। এটা আমার প্রাপ্তি তো বটেই, পাশাপাশি দলেরও গর্ব। এলাকার শিক্ষিত, নিঃস্বার্থ লোক নেতৃত্বে আসলে ভালো মানুষও দলে ভিড়বে। নইলে চাটুকারের অভাব হবে না। এসব আদর্শ পেয়েছি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অনেক কষ্টে আমাদের দিন কেটেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে অনেক কিছু করেছি। মিছিল করতে গেলেই পুলিশ হামলা করত, আমরা দৌড়ে পালিয়ে গেলে পুলিশ মিছিলের মাইক কেড়ে নিয়ে যেত। পুলিশকে টাকা দিয়ে সে মাইক ছাড়িয়ে আনতে হয়েছে। তখনকার কোন আওয়ামী লীগ নেতার সহযোগিতা পাইনি। এক বন্ধুর কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে মাইক ভাড়া করেছি। পুলিশ মাইক ছিনিয়ে নিত। টাকা-পয়সা দিয়ে মাইক ছাড়িয়ে আনতে হয়েছে। তখন মন্টু ঘোষ, দেলোয়ার হোসেন চুন্নু, জহিরউদ্দিন কাবলু, মুসলিম খান আমাদের সঙ্গে ছিল। মুসলিম খান ও আমরা লুকিয়ে কোমরে বেঁধে লিফলেট নিয়ে যেতাম। টানবাজারে একটা দোকানে আড্ডা ছিল সেখানে লিফলেট রাখতাম। মুসলিম খানের দায়িত্ব ছিল আশা হলে লিফলেট ছাড়ার, সঙ্গে থাকত আরেকজন যে পাহারা দিত কেউ আসছে কিনা তা দেখতে। ডায়মন্ড হল, মেট্রো হলে আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেয়া হতো। রাতভর চিকা মেরেছি। গোরস্থান এলাকায় একদল চিকা মারত, আর আমরা পাহারা দিতাম। আর্মির জিপ যাওয়ার সময় আমরা গোরস্থানে পালিয়ে যেতাম। এমন সময় পার করেছি আমরা। পঁচাত্তরের পর এই আওয়ামী লীগ নিয়ে অনেক খেলা হয়েছে। মিজান লীগ, মালেক লীগ, অমুক লীগ, তমুক লীগ হয়েছে। আমাদের যাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই তারা শুধু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের চিন্তা করেছি। আমরা নিরাশ হয়ে গিয়েছিলাম। জেলে থাকাবস্থায় জেল থেকে বের হতে পারব কিনা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে কিনা সন্দিহান ছিলাম। ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ বলতে একটা কথা আছে।’ মানুষের আশার তো শেষ নেই।

শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসবেন সেটা আমরা ভাবতে পারিনি। কিন্তু মানুষের চাহিদা ছিল- বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউই নেতৃত্বে আসুক। কিন্তু অনেক মেকানিজমের পর এটা সম্ভব হয়েছে। আমরা সম্মেলনে ছিলাম। তখন তো নানা গ্রুপে বিভক্ত দল। শেখ হাসিনা আসায় আওয়ামী লীগের ঐক্য বজায় ছিল। তিনি যখন সভানেত্রী নির্বাচিত হলেন তখন আমরা আবার আশায় বুক বাঁধলাম; নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে।

১৯৭৯ সালে দেশে এসে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমি বাপ-মা সব হারিয়েছি, এখন আপনারাই বাপ, আপনারাই মা। আমি বাংলাদেশে শুধু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তিনি কথা রেখেছেন। কিন্তু বিভিন্ন সময় তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।

১/১১ এ অনেক নেতাকর্মী পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা দলকে সুসংগঠিত রাখতে বিভিন্ন জেলায় জেলায় ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছেন। সে সময় দলের ভেতরে থেকে অনেকেই শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটা পারেনি। এখন শেখ হাসিনা কঠোরহস্তে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। কাউকে ছাড় না দিচ্ছেন না।

বঙ্গবন্ধু এই দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করেছে, সত্য কথা আঙুল উঁচিয়ে দরাজ কণ্ঠে বলেছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে কিন্তু তার আদর্শ তো রয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যকন্যা বাবার আদর্শে এ দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধুকে গুটিকয়েক নেতা কালো কোট পরে ঘিরে রেখেছিলেন। তখন বাইরেটা দেখতেই দেননি বঙ্গবন্ধুকে। কিন্তু শেখ হাসিনা সেই ভুলটা করেননি। তিনি সারা দেশের তার নেতাকর্মীদের ওপর নজর রাখছেন। কোথায় কোন আওয়ামী লীগ নেতা, শ্রমিক নেতা ভালো আছে তাদের খুঁজে বের করে মূল্যায়ন করছেন।

১৫ আগস্ট এলে আমাদের বুক কেঁপে ওঠে। দলের মধ্যে হাইব্রিড নেতা ঢুকে গেছে। জিকে শামীম, সম্রাট, সাহেদের মতো লোকজন কিন্তু আমাদের মতো লোকজনের হাত ধরেই দলে ঢুকেছে। আমরা সাবধান না হলে আরেকটা ১৫ আগস্ট ঘটতে পারে সেটা শেখ হাসিনা বুঝতে পেরেছেন। ফলে তিনি কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না।

আমার ছাত্রজীবনটা আমি জেলে কাটিয়েছি। বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যার মতো অন্যায়ের প্রতিবাদ আমি করছি। প্রতিবাদ করতে গিয়ে জুলুম-অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। জেল খাটতে হয়েছে। আর্মিরা আমাকে যে নির্যাতন চালিয়েছে তাতে আমি টানা ৯ মাস টাইফয়েড জ্বরে ভুগেছি। আমি যে বাঁচব সে আশা পরিবারের কারও ছিল না। আওয়ামী লীগে আমার অবদান কিংবা যোগ্যতা কিন্তু কোন অংশে কম নয়। এখন তো এমপির ছেলে এমপি, চেয়ারম্যানের ছেলে চেয়ারম্যান হচ্ছে। আমার বাবা আওয়ামী লীগ করেননি। সেটাই আমার অপরাধ? একথা শুনে শেখ হাসিনা আমাকে মূল্যায়ন করেছেন।

সন্ত্রাসী, মাস্তানরা দলের বোঝা। তাদের দ্বারা দল হয় না। এরা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। বঙ্গবন্ধু এটা চাইতেন না। বঙ্গবন্ধু যেটা চাইতেন সেটাই আমি করছি এবং করে যেতে চাই। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই।

আওয়ামী লীগের কর্মী তো আগেই হয়েছি। কিন্তু পঁচাত্তরের দুঃসময়েও আমরা কাজ করেছি। কাজ করেছি শুধু একটা তাগিদে, বঙ্গবন্ধুর হাত আমার মাথায় পড়েছিল। আমার লোভ-লালসা কিছু নেই। অনেক চোখ রাঙানি দেখেছি। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দ্বারাই নির্যাতিত হয়েছি। মানুষের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য নির্যাতিত হয়েছি। এ বৃদ্ধ বয়সেও আপসের রাজনীতিতে বিশ্বাস আমি করি না। সৎ রাজনীতিবিদের প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করার তা আমি করবো।

(দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত উপ সম্পাদকীয় কলাম হতে নেওয়া)।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও