নেতাদের বক্তব্যে আশ্বাস ও বাস্তবায়ন সঙ্গে জনতার করতালি

রণজিৎ মোদক || শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট ১০:০৭ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ শনিবার

নেতাদের বক্তব্যে আশ্বাস ও বাস্তবায়ন সঙ্গে জনতার করতালি

মঞ্চের শিল্পী গান গাচ্ছেন। মাঝে মাঝে নিজেই গানের মাঝে উচ্চস্বরে মাউথ অর্গান হাতে নিয়ে বলছেন, তালি হবে তালি। শিল্পীর গাওয়া গান শ্রোতার ভালো লাগলে প্রাণের মাঝে আনন্দ শিহরন জাগাই স্বাভাবিক গান শুনে কেউ কাঁদে, গান শুনে কেউ নাচে, গানের ভাব, গানের পরিবেশ সুর লয়ে কুরসর্পকেও অবহিত করে। শুনেছি সুরের রাজা সংগীতশিল্পী তানসেন গান গেয়ে বৃষ্টি নামাতে পারতেন, এমনকি গান গেয়ে ফুল ফোটাতেন। আর বর্তমানে একশ্রেণীর প্রখ্যাত মঞ্চ শিল্পীরা তাদের গানের বাহবা পেতে চেয়ে চেয়ে হাততালি নিয়ে মঞ্চ মাতান।

আমরা আনন্দ প্রেমী সুখ প্রত্যাশী, শান্তি-সুখের দর্শক-শ্রোতা সকল, শিল্পীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আর কত হাততালি দিয়ে দিয়ে হাত লাল করবো। গান শিল্পীদের কথা না হয় বাদই দিলাম। তথাকথিত রাজনৈতিক নেতাদের কথাই বলছি মঞ্চ কাপানো বক্তৃতা আর স্বপ্নের ফুলজুরি ছড়ানো কথার মালার ফাঁকে ফাঁকে সমস্বরে শ্লোগান আর হাততালির ব্যবস্থা করা না হলে লোকাল নেতার সম্মান এমনকি পদ-পদবি নিয়েও টিকে থাকা দায়। নেতার মান রক্ষা এবং নিজের পদ-পদবি রক্ষার জন্য হলেও টাকা দিয়ে ভাড়াটে জনতার মিছিল সহ দল ভারীর আয়োজন করা নতুন কিছু নয়।

অতীতে আপনারাই দেখেছেন এমন কি শুনেছেন কেউ বলছেন, আমার শহর সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দিবো। কেউ বলছেন আমার এলাকায় গাছে গাছে সোনার ফল ফলাবো। এখানে অবশ্য জোরে হাততালি দিতে হবে। আমাদের বাবার বাবা যা শুনিনি আমার বাবা যা দেখেনি, সেই সব আমরা দেখবো সেকি কম কথা! জোরে জোরে হাততালিতো দিতেই হবে। পরোটা ভাজি খাইয়ে খোলা ট্রাকে করে সভায় নিয়ে আসছে অমুক ভাই। কম কথা কি? ভাই চলেন নেতার দোহাই দিয়ে, আমরা চলি ভাইয়ের দোহাই দিয়ে। ক্যামেরার সামনে যেয়ে জোরে জোরে হাততালি দিবো। আগামী কালকের পত্রিকায় ছবি প্রকাশ হবে। দেখিস মহল্লায় মহল্লায় আমরাও নেতা হয়ে যাবো। এ গেল ভাড়াটিয়া জনতা গোপন মনের আশা। আশা করতেতো বাধা নেই। আশা বুকে নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। নেতা হওয়া সহজ কথা নয়, সে কথা ভাড়াটে মিছিলকারীরা না জানলেও বিজ্ঞজন জানেন। নেতাকে অনেক ত্যাগ, সহিষ্ণুতা ও কর্মঠ হতে হয়। বিদ্যা সম্পন্ন এবং দূরদর্শী দৃষ্টি সম্পন্ন হতে হয়।

ফতুল্লা কুঠিবাড়ির মাঠ। বর্তমানে ডিআইটি মাঠ। কখনো খেলার মাঠ, কখনো ঐতিহ্যবাহী গরুরহাট, কেউ আবার মঙ্গলবারের হাট বলেও জানেন। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম তারিখ নববর্ষে বৈশাখী মেলা বসে এই ডিআইটি মাঠে। এই মাঠে বহু রাজনীতি নেতা নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রেখেছেন। বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা এমনকি এরশাদ সাহেব বাদ পড়েননি। ফতুল্লার ডিআইটি মাঠকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা ছিল।

ফতুল্লা ডিআইটি মাঠে এলাকাবাসী তিনবার পৃথক পৃথক হাততালি দিয়েছেন। শিল্পপতি মুক্তিযোদ্ধা দানবীর মোহাম্মদ আলী এরশাদ আমলে বলেছিলেন কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন। তুখোড় রাজনীতিবিদ গিয়াস উদ্দিন ডিআইটি মাঠের দক্ষিণ পাশে হাসপাতাল নির্মাণ করবেন। সে অনেক দিনের কথা। অতীতের কথা কেউ মনে রাখে, কেউ মনে রাখেনা। তবে বর্তমানে সেই ডিআইটি মাঠের যে হাল-হকিকত স্বচক্ষে কেউ না দেখলে বুঝবেন না। এই মাঠে কলেজ হাসপাতাল কোনটাই হয়নি।

সম্প্রতি ফতুল্লার ডিআইডি মাঠের পশ্চিম দক্ষিণ কোণে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জাতীয় স্যানিটেশন প্রকল্পের উদ্যোগে কমিউনিটি ল্যাট্রিন/পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করেছেন। জনস্বার্থের খাতিরে এবার একটি হাততালি দিতেই হয়। যে বাসস্ট্যান্ডে না আছে যাত্রী ছাউনি, না আছে ভালো স্টল, সেখানে পার্শ্ববর্তী সমবায় মার্কেট ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে ল্যাট্রিন নির্মাণ মন্দ না। রাজধানীর ঢাকা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের পরেই ফতুল্লা লঞ্চ টার্মিনাল। এখানে প্রয়োজনের তাগিদেই সুন্দর অ্যাটাচ টয়লেট সহ যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে। ছয়-সাত মাস না যেতেই তার যে চেহারা তা দেখার কেউ রয়েছেন বলে মনে হচ্ছে না।

আর যাই হোক না হোক ডিএনডি এলাকার পানি নিষ্কাশনে ডিএনডি উন্নয়নে মেগা প্রকল্প নির্মাণ অর্ধকোটি মানুষের জন্য আশীর্বাদ। প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্যকে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধা জানায় ডিএনডিবাসী। তবে বন্দরবাসীও বেশ কয়েকবার হাততালি দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার আমল থেকে বেশ কয়েকবার হবে। একমাত্র শীতলক্ষ্যা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তরকে কেন্দ্র করে। এইতো সেদিন বারদী থেকে নবীনগর ফেরিঘাট হয়ে শহরে এলাম। এখানে সেতু এখনো নির্মাণ হয়নি। তবে দধির স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য অবশ্যই বন্দরবাসীর পক্ষে হাততালি। গানের মঞ্চ থেকে রাজনীতির মঞ্চ সর্বত্র চলছে হাততালির প্রতিযোগিতা।

এসব মেকি এবং স্বার্থ হাসিলের অভিনয়। তবে এখন সাধারণ মানুষ বর্ষাকালীন পুটি মাছের ন্যায় দলবেঁধে মিটিং-মিছিলে যাচ্ছে না। একটি সময় ছিল মিটিং মিছিল ও সভা-সমাবেশে লোকের কমতি ছিল না। মানুষ তার অন্তরের তাগিদেই আদর্শগত কারণে নেতা-নেত্রীর ডাকে সাড়া দিতো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন আগরতলা মামলায় কারাগারে ছিলেন, তখন কোটি জনতার স্লোগান ছিলো ‘জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো।’ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্রই স্কুল-কলেজে জনতার বিশাল মিছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে শেখ হাসিনা যখন জেলে বন্দী তখন আওয়ামী জনতার রাজপথ প্রকম্পিত মিছিল আর মিছিল। ভালো এবং সুন্দর কাজে দেশের মানুষ অবশ্যই উৎসাহিত ও প্রশংসার হাততালি দেবেন এটাই বাস্তবতা। সারাবিশ্বে অদৃশ্য মহাভয়ের করোনা সবকিছু স্তব্দ করে দিয়েছে। এ মহা দুর্যোগের সামনে নিয়ে যারা যেখানে যেভাবে মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের জন্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রার্থনা জানাবো। আরো উৎসাহিত করব শত শত বার হাত তালি দিয়ে।

দেশকে এগিয়ে নিতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণে আওমীলীগ নেতাদের বিষয়ভিত্তিক দায়িত্ব পালনে আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২ সেপ্টেম্বর গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ কথা বলেন। শ্রদ্ধেয় নেত্রী করোনা, বন্যা, ঝড় এবং রোহিঙ্গাসহ নানামুখী সমস্যার সমাধানে কাজ করে যাচ্ছেন। শুধু দেশবাসী নয় সারাবিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ নেত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সাধুবাদ জানাচ্ছে। আর যারা সুযোগ সন্ধানী শিল্পপতি, ব্যবসায়ীরা হাইব্রিড হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনে যোগদান করে নেতা-নেত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে সিংহাসনে বসে ভূমি দখল থেকে সর্বত্র অর্থলোলুপ সিংহরূপে আত্মপরিচয় তাদের কথায় জনতা আর হাততালি দেবে না আমার বিশ্বাস। মানুষ নেতাকে নয়, নেতার নীতিকে সালাম জানায়। হুট করে দল হুট করে নেতা বনে যাওয়া দেখতে চায় না মানুষ। নেতা হওয়া আর নেতা তৈরি করা এক কথা নয়। তৃণমূলের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনের মধ্যে দিয়েই নেতা-নেত্রীর সম্মান বৃদ্ধি পায়। নেতা-নেত্রীর ডাকে প্রাণ দিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে জনতা।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও