অন্ধকারে ঢাকা এক জন্মদিন

রফিউর রাব্বি || তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর বাবা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ০৯:০০ পিএম, ৪ অক্টোবর ২০২০ রবিবার

অন্ধকারে ঢাকা এক জন্মদিন

৫ অক্টোবর ত্বকীর জন্মদিন। পঁচিশ বছর পূর্ণ হলো। কোন কোন জন্মদিনের আনন্দ ছাপিয়ে ওঠে মৃত্যুর দুঃখবোধ, শূন্যতা, হাহাকার। ত্বকীর জন্মদিনটিও তেমনি। এ যেন এক হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে তোলা।

পঁচিশ বছর আগের এক বিকেলে শহরটি যখন ঢাকের শব্দে মুখর হয়ে উঠেছিল, বিসর্জনের আনন্দ-বেদনায় প্রকম্পিত ছিল রাজপথ- সে বিজয়া দশমীতে ১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর জন্ম। খর্বদেহে মুষ্টিবদ্ধ হাত, কিন্তু জানিনা কী প্রতিজ্ঞা ছিল তখন।

চলে যাওয়ার পরে ওর খেরো খাতায় দেখেছি- ‘যুদ্ধের সেই সব নায়কেরা ডাক দিয়ে যায়Ñ/ জাতির জন্যে, জেগে ওঠার জন্যে/ ওই জাতির জন্যে; যারা ধ্বংসের মধ্যেও/ নতুন জীবনের ডাক দিয়ে যায়;/ তুমি কি শুনতে পাও/ সেই সব শহিদদের কন্ঠস্বর/ যা প্রতিধ্বনি হচ্ছে বহুদিন ধরে?/ ... যাঁরা ভয়ের মধ্যে জন্ম গ্রহণ করে/ তাঁরা অপেক্ষায় আছে,/ তুমি ফিরে এসো,/ ফিরে এসো সেখান থেকে/ ফিরে এসো/ বাংলাদেশ আমার।’

এমনি এক বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম। একাত্তরের যুদ্ধটা এ জন্যই হয়েছিল। কিন্তু অর্ধ-শতাব্দী পরেও সে স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। ফুল খেলবার দিন আমাদের এল না। ক্রমাগত ধ্বংস থেকে পরিত্রাণ এল না। এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন আমাদের তারিয়ে নিচ্ছে। এ অন্ধকার থেকে পরিত্রাণের পথগুলো আজ জগদ্দল পাথরে আটকা পড়ে আছে।

ত্বকীকে হত্যার সাড়ে সাত বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু বিচার আজো শুরু হয় নি। তৈরী করে রাখা অভিযোগপত্রটিও আটকে রাখা হয়েছে।

ত্বকীর এক ঘাতক আদালতে জবানবন্দিতে জানিয়েছে, টর্চারসেলে ত্বকীকে গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞান করার পর তারা ত্বকীর বুকের উপর উঠে গলা চেপে শ^াস রোধ করে মৃত্যু নিশ্চিৎ করেছে। মাথায় তিন দিকে আঘাত করেছে, চোখ উপড়ে এনেছে, দেহের বিভিন্ন অঙ্গ থেতলে দিয়েছে। মৃতদেহ বস্তাবন্দী করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দিয়ে সে টর্চারসেলে ফিরে তারা বিরিয়ানী খেয়ে উৎসব করেছে। শহরে এইটি পরিচিত টর্চারসেল। প্রায় রাতে এখান থেকে চিৎকার-আর্তনাদ আশপাশের সবাই শুনেছে। কিন্তু সে আর্তনাদের শব্দ প্রশাসনের কানে ত্বকী হত্যার আগে পর্যন্ত পৌঁছেনি। তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব তাদের অভিযোগপত্রে বিস্তারিত উল্লেখ করে তা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে। কিন্তু আদালতের দরজা পর্যন্ত সে অভিযোগপত্র যেতে পারেনি। ভিনদেশীদের শাসনামলে বিচারের বানী নিরবে নিভৃতে একটা সময় হয়তো কাঁদতো, কিন্তু এখন তা প্রকাশ্যে চিৎকার করে কাঁদলেও প্রতিকার নেই। এ আমাদের স্বাধীন দেশ!

৬ মার্চ ২০১৩ এর বিকেলে ত্বকী স্থানীয় এক পাঠাগারে যাচ্ছিল বই আনতে। ঘাতকরা ওকে পথ থেকে তুলে নিয়ে যায়। বয়স ছিল সাড়ে সতেরো। এ-লেভেল প্রথম পর্বের পরীক্ষা শেষে বেশীর ভাগ সময়ই কাটাতো বইয়ের সাথে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে দেশ বিদেশের সাহিত্য, বিজ্ঞান, গনিত, দর্শন বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। সক্রেটিস, আইনস্টাইন, টলস্টয়, এডওয়ার্ড সাঈদ, জ্যাক দেরিদার প্রতি যেমন আগ্রহছিল; তেমনি আগ্রহছিল লালন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সুফিবাদের প্রতি। বইপড়া, লেখালেখি, আবৃত্তি, গানগাওয়া-শোনা, দাবা খেলাটাকে ভালোবেসেছিল।

মৃত্যুর পরে ওর খেরোখাতায় আমরা দেখি বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা কিছু কবিতা, ছোট ছোট পঙ্ক্তি, গল্প ও কিছু নিবন্ধ। নিখোঁজের পরদিনই এ-লেভেল প্রথম পর্বের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হল। পদার্থবিজ্ঞানে বিশে^র সর্বোচ্চ নম্বর আর রসায়নে দেশের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল। ও-লেভেল পরীক্ষাতেও ত্বকী পদার্থবিজ্ঞানে দেশের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল। যদিও স্কুলের পরীক্ষায় ভালো নম্বরে ত্বকীর তেমন আগ্রহ ছিল না। ওর উপলব্ধি ছিল, এ ফলাফলে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ মেলে না। ভালো মানুষ হতে গেলে এ ফলাফল তেমন কাজে দেয় না।

ও বলতো, আমাদের সামনের অনুকরণীয়-অনুসরণীয় যাঁরা, তাঁদের কারোরইতো পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের উদাহরণ নেই। কথা কম বলতো, মানুষের প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা, বিশ^াস। কেউ দুঃখ পাবে এমন কথা বা আচরণ ছিল ওর নীতি ও রীতি বিরুদ্ধ। মানুষের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি ছিল খুবই সচেতন। ওর কোন শত্রু ছিল না। ফল প্রকাশের দিন ত্বকীকে আমরা যখন খুঁজছিলাম তখন ওর লাশ ভাসছিল শীতলক্ষ্যা নদীতে।

নির্বাক এ শীতলক্ষ্যা অনেক কিছুর স্বাক্ষী হয়ে আছে। একাত্তরে শত শত লাশ যেমনি বহন করেছে এই নদী, স্বাধীন দেশে তার চেয়ে কম হয়নি। মুখের ভাষা ভিন্ন হলেও পাকিস্তানি ঘাতক আর স্বাধীন দেশের ঘাতকদের চরিত্রে কোনও ফারাক নেই। তখন ঘাতকরা যেমনি সরকারের প্রশ্রয়ে থেকেছে, এখনো তাই থাকে। সরকারের আনুকুল্য ছাড়া কখনো কোন দেশেই অপরাধীরা আইনের বাইরে থাকতে পারে না।

পৃথিবীর খুব কম দেশেই অপরাধীরা আইনের ঊর্ধ্বে, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারে; কিন্তু আমাদের এ দেশটাতে পারে। এখানে বিচার যা দু’চারটে হয় তা যেমনি রাজনৈতিক প্রয়োজনে; আটকে থাকেও রাজনৈতিক প্রয়োজনে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মান, অষ্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর সহ বিশে^র অনেক দেশে ত্বকী হত্যার বিচার চেয়ে আন্দোলন হয়েছে, প্রতিবাদ হয়েছে, সারা দেশে হয়েছে। দেশের শিক্ষাবিদ, শিল্পী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী অনেকেই বিচার চেয়েছেন, বহুবার বিবৃতি দিয়েছেন, লিখেছেন, কথা বলেছেন, অনেকে কবিতা লিখেছেন, গান গেয়েছেন, প্রমাণ্যচিত্র তৈরী করেছেন, অনেক শিল্পী ছবি এঁকেছেন, শিশুরা এঁকেছে। সে সবনিয়ে কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, সিডি প্রকাশিত হয়েছে।

৮ মার্চ ত্বকীর লাশ পাওয়া গিয়েছিল শীতলক্ষ্য নদীতে। হত্যার পর থেকে এই সাড়ে সাত বছর ধরে এখনো পর্যন্ত প্রতিমাসের ৮ তারিখ বিচারের দাবিতে কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। দেশে এমন নজির আর আছে বলে জানা নেই। কিন্তু বিচার হচ্ছে না। অঘোষিত এক ইন্ডেমনিটিতে তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

ইন্ডেমনিটি জারি করে বিচার বন্ধ করে রাখার নজির ভালো হয় না, সে উদাহরণ আমাদের আছে। সরকার পরিবর্তনের পর সে ইন্ডেমনিটি আর থাকে না। তা করে বিচার হয়তো সাময়িক ভাবে বিলম্বিত করা যায়, কিন্তু চিরতরে বন্ধ করে দেয়া যায় না। তবে সে বিচার যখন হয়, বিচার বন্ধকরে রাখার কারিগরদেরও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। কিন্তু তার পরিনাম খুব সুখকর হয় না। তেমনটা হোক আমরা তা চাই না।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও