সরকারি সংস্থার গাফিলতি, ভবন মালিকের অনিয়ম সহ তদন্ত প্রতিবেদন

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:১৬ পিএম, ৯ আগস্ট ২০২১ সোমবার

সরকারি সংস্থার গাফিলতি, ভবন মালিকের অনিয়ম সহ তদন্ত প্রতিবেদন

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় অগ্নিকান্ডে ৫১ জন নিহতের ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। ৪৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সরকারি সংস্থার গাফিলতি, শিশুশ্রম, ভবন নির্মাণের অনুমতি না থাকা সহ কারখানার মালিকের অনিয়ম এবং ভবিষ্যতে এসব দূর্ঘটনা রোধ করণীয় ২০টি সুপারিশ করা হয়েছে।

সোমবার দুপুরে এসব কথা বলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ।

ডিসি মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট রাতে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শামীম বেপারী ৪৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তারা ওই অগ্নিকান্ড থেকে জীবিত ফিরে আসা ২১জনের জবানবন্দি নিয়েছেন। ভবন মালিকের অনিয়ম সহ ভবিষ্যতে অগ্নি দূর্ঘটনা রোধে করণীয় ২০টি সুপারিশও দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘অগ্নিকান্ডের কারণ হিসেবে বলেছেন ভবনটির নিচতলায় সেন্ট্রাল কমপ্রেশার সেন্টারের পাশে বৈদ্যুতিক শট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে এবং প্রচুর পরিমাণ প্রতি ফ্লোরে দাহ্য পদার্থ থাকায় দ্রুত আগুনটি ছড়িয়ে গেছে। এছাড়াও ভবন মালিক সরকারের বিভিন্ন সংস্থার যে নিয়ম কানুন আইন বিধি বিধান আছে সেগুলো প্রতিপালন করেননি। যার ফলে এ দূর্ঘটনাটি সংগঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে ২০টি সুপারিশে বলা হয়েছে,‘এখানে যারা মারা গেছে তাদেরকে শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৫১ ধারা অনুসারে ২ লাখ টাকা ও যারা আহত হয়েছে তাদেরকে আড়াই লাখ টাকা করে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়াও যারা মারা গেছে ওই পরিবারের কেউ কর্মক্ষম থাকে তাহলে এ কোম্পানির অন্য কোন গ্রুপে তার যোগ্যতা অনুসারে চাকরি দেওয়ার জন্য বলেছেন। কালকারখানা সহ সরকারের অন্যান্য দপ্তরগুলোতে জনবল বাড়িয়ে বেশি মনিটরিং করার জন্য তারা বলেছে। শিশুশ্রম বন্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যেন আরো উদ্যোগ গ্রহণ করে। কোন ভাবেই শিশুশ্রম যেন অনুমতি না দেয়া হয় এবং এরজন্য মনিটরিং বাড়ানোর হোক। বিল্ডিং কোড মানা, অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র আরও বেশি রাখা এবং প্রশিক্ষিত অগ্নিনির্বাপণ দল কারখানায় রাখা ও শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকারি কোন সংস্থার গাফিলতি ছিল? জবাবে ডিসি বলেন, ‘এ বিষয়টি পরিদর্শন করে কালকারখানা অধিদপ্তর। তাদের আরো জনবল বৃদ্ধি করে মনিটরিং বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে। এখানে তাদের মনিটরিং কম ছিল। এ বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানাবো তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে।’

তিনি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনটি আমরা কেবিনেট, শিল্পমন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, সুরক্ষা সেবা অধিদপ্তর সহ সব জায়গায় পাঠাবো। পরবর্তীতে তারা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।’

তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জের উপমহাপরিদর্শক সৌমেন বড়ুয়া বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর, রাউজক কিংবা উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ভবন নির্মাণ সহ কোন কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেনি। তদন্তে এসব অনিয়মসহ আরো কিছু বিষয়ে কারখানার মালিকের অনিয়ম পাওয়া গেছে।’

প্রসঙ্গত গত ৮ জুলাই বিকেলে উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানার ১৪ নম্বর গুদামের ৬ তলা ভবনে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তাৎক্ষনিক ভবন থেকে লাফিয়ে পরে ৩জন মারা যায় এবং ১০জন আহত হয়। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরদিন শুক্রবার বিকেলে আগুন নিভিয়ে ফেলার পর ৪৮ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানাধীন ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন বাদী হয়ে কারখানার মালিক আবুল হাসেম সহ ৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো কয়েকজনকে আসামি করে নিরাপত্তা না থাকা সহ বিভিন্ন অবহেলার অভিযোগ এনে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখিত আসামি কারখানার মালিক মো. আবুল হাসেম সহ তাঁর চার ছেলে ও ডিজিএম, এজিএম ও ইঞ্জিনিয়ার সহ ৮জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের ৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে হাজির করে। পরে আদালত থেকে কারখানার মালিক আবুল হাসেম, তাঁর ৪ ছেলে জামিনে বের হয়ে আসেন আর ডিজিএম, এজিএম ও ইঞ্জিনিয়ার ৩ জন বর্তমানে কারাগারে আছেন। পরবর্তীতে এ মামলাটি তদন্তভার সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।

তাৎক্ষনিক এ ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসনের ৫ সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন ৭ কার্যদিবস, ফায়ার সার্ভিসের ৫ সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন ৭ কার্যদিবস ও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ৫ সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন ৫ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।

এদিকে গত ৪ আগস্ট থেকে ৩ দিনে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ৪৮ জনের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার পর ৪৫জনের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনও ৩জনের মরদেহ ডিএনএ পরীক্ষার জন্য বাকির রয়েছে।’


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও