নারায়ণগঞ্জে শিক্ষায় করোনাঘাত!

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:৩৮ পিএম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ বৃহস্পতিবার

নারায়ণগঞ্জে শিক্ষায় করোনাঘাত!

ঘড়ির কাটায় সময় বিকাল ৩টা। চাষাঢ়া শহীদ মিনারে গণমাধ্যমকর্মীদের আড্ডা। এক বালক সিগারেট বিক্রি করছিল। গলায় ঝুলিয়ে পেটের উপর ছোট পসরা। কয়েক ধরনের সিগারেট। সাথে পানও আছে। জিজ্ঞেস করতেই নাম বললো, ‘রাব্বি মিয়া’। বয়স ১০ বছর। করোনার জন্য পড়ালেখা ছেড়েছে। বন্দরের একটি মাদ্রাসায় ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে সে। করোনার সময় সংসার চলেনা, রাব্বির বাবা-মা তাকে মাদ্রাসা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। রাব্বির পিতার নাম বাদশা মাতব্বর। সে রাজ যোগালীর কাজ করে। তার কাজ ছিলনা করোনার সময়। রাব্বি এখন দিনে ২/৩ ‘শ টাকা আয় করতে পারেছে। রাব্বিরা ভাড়া থাকে নন্দিপাড়া এলাকায়। রাব্বি আর পড়ালেখায় ফিরতে চায় না। তাকে একজন সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী ফের কোনো একটি স্কুলে ভর্তি করে ফ্রি পড়াতে চাইলেও ছোট বালক তাতে রাজি হয়নি। রাব্বি মুখের উপর না করে দেয়। বাস্তব এই ছোট্ট ঘটনা নারায়ণগঞ্জ জেলার শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্তিতি বুঝে নিতে কষ্ট হয় না।

করোনার কারণে ৫৪৪ দিন বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গত ১২ সেপ্টেম্বর খুলেছে। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়ে ঝরে গেছে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। তাদের অনেকেই বইয়ের বদলে কাধে তুলে নিয়েছে সংসারের হাল। অনেক অল্প সংখ্যক ছাত্রীর বিয়ে তারিখ ধার্য্য হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের চরনরসিংপুর প্রাথমিক থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত সব স্তরেই কমবেশি এমন শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি দেখা গেছে। এসব শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরী করতে জরিপ শিক্ষা অফিস কর্তৃপক্ষ।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে হাজিরা খাতা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তালিকায় নিয়মিত উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, অনুপস্থিত শিক্ষার্থী, ঝরে পড়া ও বিবাহিত শিক্ষার্থীর তথ্য দিতে বলা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী শিক্ষার্থীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠদানে না ফেরার কারণ অনুসন্ধান করবে শিক্ষা অফিস। তাদের কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় সে বিষয়েও কাজ করবেন তারা।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানাগেছে, নারায়ণগঞ্জে ৫৪৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৩০ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২০ টি কলেজ, ৭০টি মাদ্রাসা ও ৮০০ টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার উপজেলার শিক্ষকরা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরে সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের তথ্য শিক্ষা অফিসে দেয়া শুরু হয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কম আসা, ঝরে পড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে নবম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা বেশি। যা উদ্বেগের।

এদিকে, শহরের পশ্চিম দেওভাগ বাংলাবাজার এলাকার দেওভোগ হাজী উজির আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের নির্দেশনা মোতাবেক শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে শিক্ষা অফিসে পাঠানো হয়েছে। সপ্তাহে একদিন ক্লাস হওয়ার কারণে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী বের করা কষ্টকর। যে সকল শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসছে না, তাদের অভিভাবকদের ফোন করা হচ্ছে। এছাড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ে ফেরানোর চেষ্টা চলছে।

মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির একজন সদস্য শফিকুল হাসান বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও নারায়ণগঞ্জে বাল্য বিয়ের কোন ঘটনা নেই। শহরে এমনিতেই বাল্য বিয়ের চল নেই। তবে অনেক ছাত্র সংসারের হাল ধরতে কাজকর্ম শুরু করেছিল। রুটিন ওয়ার্কের মাধ্যমে স্ব-স্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও এলাকার সচেতন মানুষ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফেরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এতে অনেক সাড়াও পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে ফিরতে শুরু করেছে।

জেলা শিক্ষাকর্মকর্তা মোঃ শরীফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে হাজিরা খাতা অনুযায়ী উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, অনুপস্থিত শিক্ষার্থী, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগির তালিকা হাতে পাওয়া যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখি করতে কাজ করা হচ্ছে।

সরকারের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বলেছে, স্কুল খোলার পর উপস্থিতি-অনুপস্থিতি দেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না ফেরা শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাজে লাগিয়ে সরকার চাইলে অনায়াসেই এই তালিকা তৈরি করতে পারে। তারা বলছেন, স্কুল-কলেজে আপাতত বিল্ডিংয়ের দরকার নেই। কারণ পর্যাপ্ত বিল্ডিং নির্মাণ হয়েছে। বিল্ডিংয়ের টাকা দিয়ে উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ঝরে পড়া দ্রুত কমিয়ে আনাসহ সব শিক্ষার্থী যেন অষ্টম শ্রেণি শেষ করতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধের কারণেও লেখাপড়া ছেড়ে ঘোরাঘুরি-খেলাধুলা ও আড্ডায় মেতেছে অনেক শিশু-কিশোর। এই পরিস্থিতিতে মহামারি শেষে স্কুল খুললে বাংলাদেশে কতসংখ্যক শিশু লেখাপড়ার বাইরে চলে যাবে। পরিস্থিতির কারণে এখন সবাই স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছেন। কিন্তু যারা আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরবে না তাদের নিয়ে কোনো কথা হচ্ছে না। অথচ বিনামূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তিসহ সরকারের নানা উদ্যোগে সাফল্য পেলেও করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে সেই অর্জন এখন হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।


বিভাগ : শিক্ষাঙ্গন


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও