যে সড়কে হেঁটে মসজিদে সেই পথেই কবরস্থানে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:১৯ পিএম, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ রবিবার

যে সড়কে হেঁটে মসজিদে সেই পথেই কবরস্থানে

প্রতিদিন যে সড়ক দিয়ে হেঁটে মুসল্লিরা যেতেন মসজিদে, সেই সড়ক ধরেই কফিনবন্দী হয়ে যাবেন কবরস্থানে। এ যে নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস! পশ্চিম তল্লার আকাশ বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ। ঘরে ঘরে শোকের মাতম। কারো স্নেহশীল পিতা। কারো আদারের বুকের ধন। কারো ভাই। কারো প্রাণের স্বামী। প্রাণ হারিয়েছে মসজিদ ট্রাজেডিতে। স্বজনহারাদের কান্নায় প্রতিবেশিদের চোখেও অশ্রুধারা নেমে এসেছে।

জীবন সংগ্রামে জয়ী এক মা হারিয়েছেন তার পুত্রকে। স্বামী ছেড়ে গিয়েছিল ওই সংগ্রামী নারীকে। মহিয়সী নারী ও স্নেময়ী সেই মা বাড়ি বাড়ি আরবী ও বাংলা পড়িয়ে ছেলে মেয়ে মানুষ করেছেন। ছেলে এবার এসএসসি পাশ করেছে। নিয়মিত সে মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করে। শুক্রবারও এশার নামাজ আদায় করতে এসেছিল। গ্যাস লিকেজের কারণে অগ্নিকান্ডের খবর শুনেই তার মা ছুটে আসে মসজিদের কাছে। ছেলেকে ততক্ষণে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ছেলের খোঁজে মা শেখ হাসিনা বার্ণ হাসপাতালেও ছুটে যান। সেখানে জানতে পারেন ছেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সারারাত ওয়েটিং রুমেই অন্যান্যদের সাথে ছিলেন। সকালে জানতে পারেন তার ছেলে মারা গেছে। তার বুকফাটা আর্তনাদে অন্যান্য রোগীর স্বজনরাও কেঁদেছেন। কেঁদে নিজের সংগ্রামী জীবনের কথা জানান।স্বামীর সাথে চ্যালেঞ্জ করে জিতে গিয়েছিলেন। ছেলে বড় করেছেন মানুষও করেছেন কিন্তু আল্লাহ তাকে কেড়ে নিল। ছেলের জন্য সারারাত দোয়া করেছিলেন দুখিনী মা। কিন্তু ছেলেকে ফিরে পেলেন না। অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন সেই মা।

মৃৃত্যু অমোঘ। তাই বলে অপঘাতে মৃৃত্যু কারো কাম্য নয়। পবিত্র মহররম মাসের মাঝামাঝি সময়ে তল্লায় ঘটে গেল আরেক ট্রাজেডি। শোকের দিক দিয়ে এযেন আরেক কারবালা। মা হারিয়েছেন আদরের বুকের ধন। যাকে একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন, চলতে শিখিয়েছেন পড়াশোনা করিয়েছেন। সেই আদরের ধন এক ধামাকায় লাশ হয়ে গেল চোখের সামনে।

দু:খিনী মায়ের চোখের জল একদিন ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু তার বুকে পুত্রশোকের আগুন জ্বলবে চিরকাল। মসজিদের মোয়াজ্জিনের ছোট শিশুটিও দগ্ধ হয়েছিল। এই শিশুটিই সবার আগে মারা গেছে। এরপর মারা গেছে মোয়াজ্জিন সাহেবও।

রাতভর স্বজনেরা হাসপাতালের করিডোরে বুকফাটা আর্তনাদ করেছেন। তবুও ক্ষিন আশা ছিল-হয়তো উন্নত চিকিৎসায় ওরা সেরে উঠবে। কিন্তু না গ্যাসের আগুন ওদের প্রাণ কেড়ে নিল। সকলেই প্রাণ হারিয়ে লাশে পরিণত হলেন। জীবিত অবস্থায় যে মুসল্লিরা আযান হলেই তল্লার রাস্তা হেঁটে মসজিদে যেত-আজ তাঁরাই লাশ হয়ে কফিনবন্দী হয়ে যাবেন কবরস্থানে। মসজিদের সামনে দিয়েই। এরচেয়ে বড় ট্রাজেডি আর কি হতে পারে একজন মানুষের জীবনে। অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শি ঘটনায় আহাজারি করছে পুরো নারায়ণগঞ্জবাসী। টিভির পর্দায় শোকাহত স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ দেখে অঝোরে কাঁদছেন মহিলারা। অনেকে ব্যথায় মনে মনে কুকড়ে যাচ্ছেন। কাঁদতে পারছেন না। সবাইকে কাঁদিয়েছে তল্লার মসজিদ ট্রাজেডি। এ কান্নার শেষ নেই। তল্লা ও আশপাশ এলাকার মানুষ শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। কফিনবন্দী হয়ে তল্লার এই সড়ক ধরে এটাই ওদের শেষ যাত্রা। ওরা আর ফিরবেনা এই পথে। ওদের গন্তব্য পরপারে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার পৌনে ৯টায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই মসজিদের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময়ে মসজিদে থাকা মুসল্লীদের গায়ে আগুনের ফুলকি গিয়ে পড়লে একে একে দগ্ধ হতে থাকে। মসজিদের ভেতর থেকে আসতে থাকে মুসল্লীদের আত্মচিৎকার। পরে আশেপাশের লোকজন দিয়ে তাদের উদ্ধার করে। তাদের অনেকের শরীরের কাপড় ছিল না। রাতেই দগ্ধ ৩৭ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এর পরেই রাত হতেই একে একে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

মসজিদ থেকে বিদায়ের নামাজ
কে জানতো এটাই হবে জীবনের শেষ নামাজ ! এরপর নামাজ হবে শেষ বিদায়ের নামাজ। নামাজে জানাযা। শিশু জুুয়েল মাকে বলে গিয়েছিল নামাজ শেষ করেই সে ফিরবে। এরপর পছন্দের খাবার খাবে। জুয়েল ফিরেছে, তবে লাশ হয়ে। সে আর কোনদিন মায়ের কাছে আবদার করবেনা। খাবার খাবেনা। জুনায়েদ কি জানতো এটাই হবে জীবনের শেষ নামাজ। এরপর তার নামাজে জানাযা পড়ানো হবে। সে চলে যাবে কবরে। এমনটা কেউ ভাবেনি। গোটা চল্লিশেক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে গিয়ে মৃত্যুমুখে ঢলে পরবেন-কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। জীবনের শেষ নামাজ জামাতের সাথে আদায় করতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সকলে। কে জানতো মৃত্যুদূত ছিল কাছেই। গ্যাসের লিকেজটি দুপুরে, আছরে ও মাগরিবের সময়েও মুসল্লিরা টের পেয়েছিলেন। ইমাম সাহেবকে বিষয়টি অনেকে জানিয়ে ছিল। বলেছিল ইমাম সাব গ্যাসের গন্ধটা বেশি লাগছে। ইমাম সাহেব বিষয়টা মামুলি মনে করেই আমলে নেননি। কেননা গ্যাসের গন্ধটা গত একবছর ধরেই পাওয়া যাচ্ছিল।

শুক্রবারের এশার জামাত যে তাদের জীবনের শেষ জামাত হতে যাচ্ছে- তা কেউ বুঝতে পারেনি। হঠাৎ ধামাকা। একটা অগ্নিগোলক ছড়িয়ে পড়লো মসজিদের ভেতরে (রুমটি ছিল এয়ারটাইট এসি রুম)। নামাজ চলা অবস্থায় কয়েক সেকেন্ডেই পুড়ে গেলেন ৪০ জন মুসল্লি। বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশ মানুষ ছুটে এসেও মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে যান। এলাকা অন্ধকার। বিদ্যুৎ চলে গেছে। আশপাশের মানুষ বুঝতে পারছিলেন না ভেতরে কি হয়েছে। হঠাৎ করেই দু’একজন মুসল্লি বেরিয়ে এসে মসজিদের সামনে জমে থাকা পানিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন আর চিৎকার করছিলেন। এরপর মুসল্লিরা এগিয়ে গিয়ে এসি রুমের এয়ারটাইট দরজাগুলো ভেঙ্গে মুসল্লিদের উদ্ধার করেন। ভেতরে দেখতে পান মসজিদের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

সবাইকে অনেক কষ্টে উদ্ধার করে ঢাকায় নেয়া হল। সেখানে বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শুক্রবার রাতের মধ্যেই ঝরে পড়লো ১১ টি তরতাজা প্রাণ। বেলা গড়াতেই বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা। শণিবার রাতে মৃতের সংখ্যা ১৮ পর্যন্ত চলছিল। তল্লা এলাকার প্রাণবন্ত যুবক রাসেলের এক আত্মীয়া জানান, জীবনের অনেক আশাই অপূর্ণ থেকে গেল। আল্লাহর ঘরে ইবাদত করতে গিয়ে মরলো। ওতো শাহাদাতের মর্যাদা পাবে। এশার নামাজ পড়তে গিয়ে আজ তার জীবনের শেষ নামাজ পড়তে হল। আল্লাহই ভাল জানেন। তিনি কি করবেন। রাসেলের মাকে শান্তনা দিবে কে ? মোয়াজ্জিন সাহেবের স্ত্রীর কি হবে। শুক্রবারের এশার নামাজটা ৪০ জন মুসল্লিদের জন্য ছিল শেষ নামাজ। আল্লাহ পাক সকলকে বেহেস্ত নসীব করুন।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও