ধনী জেলায় পোড়া কান্না কতদিন

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩৮ পিএম, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার

ধনী জেলায় পোড়া কান্না কতদিন

প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জ জেলায় পোড়া রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। শহরে বড় দু’টি হাসপাতাল। দু’টিতেই বার্ণ ইউনিট আছে। নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে ২ টি সিট এবং নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে আছে ৩টি সিট। ৩০০ শয্যা এখন করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল। এখানে করোনা ছাড়া অন্য চিকিৎসা হয়না। জেনারেল হাসপাতাল রোগীর চাপ সামলাতে পারছেনা। যার দরুণ পোড়া রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ এখানে সীমিত। পোড়া রোগী আসলেই ঢাকায় রেফার্ড করা হয়।

৪ সেপ্টেম্বর রাতে তল্লায় মসজিদ ট্রাজেডির ঘটনায় দগ্ধ রোগীদের নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হলেও সেখান থেকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়। নারায়ণগঞ্জ ধনীদের জেলা হিসেবে সারাদেশে পরিচিত। সেই জেলার লোকজন অগ্নিদুর্ঘটনায় পুড়ে গেলে জেলাতে চিকিৎসা পায়না। চিকিৎসকরা অযুহাত দেখান অল্প পুড়লে চিকিৎসা দেয়া যায়। শরীর ৩০ শতাংসের বেশি পুড়ে গেলে নারায়ণগঞ্জে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়। কেননা পরিপূর্ণ বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসা দেয়ার যে সাপোর্ট থাকে এখানে তার কিছুই নেই। আছে ২ টি সিট। আর গতানুগতিক গজ ব্যান্ডেজ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ নেই। অতিরিক্ত পোড়া রোগীকে চিকিৎসা দিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

অনুসন্ধান করে জানাগেছে, নারায়ণগঞ্জে সরকারি হাসপাতালে ৫টি বেড চালু করা হলেও এখানে উন্নত চিকিৎসা নেই। অল্প পোড়া রোগী এলে বার্ণল বা অয়েনমেন্ট মাখিয়ে দেয়া হয়। ক্ষেত্র বিশেষে ব্যান্ডেজ করা হয়। বড় ধরনের পোড়া রোগীকে হাসপাতালে রাখা হয়না। দ্রুত ঢামেক হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। এবারো তল্লায় মসজিদ ট্রাজেডিতে তাই করা হয়েছে। শরীরের অধিকাংশ স্থান পুড়ে যাওয়া রোগীকে ছুঁয়েও দেখেনি নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের চিকিকৎসকরা। একের পর এক রোগীকে তারা ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। সোজা বলে দেয় এখানে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা নেই। বাঁচার জন্য আকুল লোকজন কাতরাতে থাকেন এ্যাম্বুলেন্সে। পুরোনো ঢাকার যানজট পেরিয়ে মেডিক্যাল অবধি যেতে যেতেই একেকজন পোড়া রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটেছে। এ বিষয়টি সকলের নজর এড়িয়ে গেলেও এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন গণস্বাস্থ্যের ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আমার কষ্ট লেগেছে এখান থেকে ঢাকা যেতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লেগেছে। এই যে কষ্টটা, অকল্পনীয়। আগুনে পোড়ার যে ব্যাথাটা, আপনারা উপলব্ধী করতে পারবেন না। এখানে যে চিকিৎসা হওয়ার কথা ছিল, সেটা হয় নাই। নারায়ণগঞ্জ এত বড় একটা জেলা শহর উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে ইনজেকশন দেয়া। তাহলে ব্যাথা থাকত না। এখন ওষুধ বেরিয়েছে অথচ পর্যাপ্ত ওষুধ নেই। যদিও এর দাম খুব বেশি না।

পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় সরকার সতর্ক হলে মৃত্যুর ঘটনা আরো কমতে পারতো মন্তব্য করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বিস্ফোরণের ঘটনায় ২৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। হাসপাতালে এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৯ জন। রোববার দুপুরে তল্লা মসজিদ পরিদর্শন কালে জাফরুল্লাহ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের সরকার আরেকটু সতর্ক হলে আরেকটু ব্যবস্থা নিলে মসজিদে বিস্ফোরণে ২৪ জনের জায়গায় অর্ধেক লোক কম মারা যেত। সরকার এটা ঘটায়নি, কিন্তু তাদের ব্যর্থতা। তারা প্রত্যেক সময় অর্ধেক কাজ করে রেখে দেয়। দোষীদের দ্রুত বিচার দাবি করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘তিতাসের গ্যাস সম্পর্কে খালি আলোচনা হবে, পরীক্ষা হবে। এসব আজগুবি কথা না বলে যেভাবে মেজর সিনহার ঘটনায় সাত দিনের মধ্যে বিচার শুরু হয়েছে, এটারও সাত দিনের মধ্যে বিচার হওয়া উচিত।’ মসজিদ বিস্ফোরণে যারা মারা গেছেন, তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবিও জানান তিনি।

এদিকে, নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা হাসপাতালের জরুরী বিভাগের ডাক্তার নাজমুল হোসেন জানান, রাত ৯টা হতে একের পর এক রোগী আসছিল। তাদের সকলের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়নি। যেসব রোগী এসেছে তাদের ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। তাদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা পাঠানো হয়েছে।

ঘটনার পর এদিকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের এখানে যতজন রোগী এসেছিল সবাইকে আমরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকায় রেফার্ড করেছি। একজন আমরা রেখেছি। একজন মহিলা রোগীকে রাখা সম্ভব হয়েছে। আর বাকিদের আমরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ণ ইউনিটে রেফার্ড করেছি কারণ তাদের অবস্থা আশংকাজনক। তাদেরকে এখানে চিকিৎসা সেবা দেয়ার অবস্থা নেই। বেশীরভাগের ৬০ ভাগের উপরে পুড়ে গেছে। কারো কারো ৯২ ভাগ বার্ণও রয়েছে। এ কারণে বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রেরণ করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে ২০১৫ সালে নারায়ণগঞ্জে দুটি সরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য বার্ন ইউনিট চালু করা হয়। খানপুরে ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে দুটি এবং নগরের ম-লপাড়ায় অবস্থিত ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের তৃতীয় তলায় দুটি বিছানায় বার্ন ইউনিট চালু হয়েছে। আগুনে পোড়া রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য দুটি হাসপাতালে ওই চারটি বিছানা সংরক্ষণ করা হয়েছে। হাসপাতাল দুটিতে আগুনে পোড়া রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হবে। যাদের অবস্থা বেশি খারাপ, তাদের অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে। অগ্নিদগ্ধ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিতে বার্ন ইউনিটগুলোতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হবে।

নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দুজন সার্জিক্যাল চিকিৎসক ও দুজন সেবিকার দায়িত্বে এই ইউনিটের কার্যক্রম পরিচালনা হওয়ার কথা। সরকারিভাবে অগ্নিদগ্ধদের জন্য দুটি বিছানা রাখার নিদের্শ থাকলেও তিনটি বিছানা রাখা হয়েছে। হাসপাতালের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে পুরুষের জন্য দুটি ও নারী ওয়ার্ডে একটি বিছানা রাখা আছে। কিন্তু বড় ধরনের ঘটনায় অগ্নিদগ্ধরা তেমন চিকিৎসা পায়না।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, নারায়ণগঞ্জ ধনী জেলা হিসেবে স্বীকৃত। এখানে অনেক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বসবাস। সমাজের অনেক দানশীল ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাঁরা ইচ্ছে করলেই নারায়ণগঞ্জে একটি আধুনিক বার্ণ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে লিঁয়াজো করে সরকারি হাসপাতালের যে কোন একটিতে আধুনিক বার্ণ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা কঠিন কোন কাজ নয়। ইচ্ছেটাই যথেষ্ঠ। এটা করলে গরীব রোগীরা উপকৃত হবে। যানজটে আটকা পরে কারো অবস্থা খারাপ হবেনা। ধনী জেলার পোড়া রোগীরা আর কাতরাবে না। কোন পিতার কাধে উঠবেনা দুই ছেলের লাশ। কোন মা হারাবেনা আদরের ধন। কোন নাবালক ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হবেনা।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও