খিচুড়ি নিয়ে ‘জগাখিচুড়ি’ !

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৩৫ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ শুক্রবার

খিচুড়ি নিয়ে ‘জগাখিচুড়ি’ !

খিচুড়ি। বাঙালির মজাদার খাবার। এই জনপদের মানুষ শত বছরের বেশি সময় ধরে খিচুড়ি রান্নায় অভ্যস্ত। এবং খিচুড়ি পরিবেশনেও সিদ্ধহস্ত। খিচুড়ি রান্না নতুন করে শেখার কিছু নেই। সেই খিচুড়ি নিয়ে ঘটে গেল ‘জগাখিচুড়ি’ জাতীয় ঘটনা। প্রচন্ড সমালোচনা চলছে। শেষ পর্যন্ত সরকার এই প্রকল্প বাতিল করে খিচুড়ি প্রকল্পের কর্তাদের মান বাঁচালেন। মাঝখানে লোক হাসাহাসি হল। খিচুড়ি নিয়ে চর্চা চলছে সর্বত্র। রাস্তাঘাটেও একজন আরেকজনকে টিপ্পনী কাটছেন।

কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন ভাই কোথায় যান? উত্তরে বলে খিচুড়ি রান্না শিখতে যাই। খিচুড়ি এই বাংলাদেশ থেকে ইংল্যান্ডে গিয়েও আধিপত্য গেড়েছে। ইতিহাসের পাতা থেকে জানাযায়, ভিক্টোরীয় যুগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ অফিসারদের হাত ধরে খিচুড়ি ইংল্যান্ডে পৌঁছে বিলাতি উচ্চারণে ‘কেজেরি’ হয়ে গেছে। ডিভ্যালুয়েশনের কারণে সেই খিচুড়ি রান্না শিখতে এখন আমাদের বিদেশে যাওয়ার কথা মনে পড়েছে। এ যে যুগের চাহিদা বলে কথা। আহা হা মুরুব্বীদের কাছে বিদ্যা অর্জনে সুদূর চীনে যাওয়ার কথা আমরা আগেই শুনেছি। খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশ যেতে দোষ কোথায় ! কোন কিছু শেখা মানেইতো বিদ্যা অর্জন করা।

কাগজে বেরিয়েছে, সরকার প্রাথমিক শিশুদের দুপুরে খাওয়ানোর কর্মসূচি নিয়েছে। সে অনুযায়ী শিশুদের খিচুড়ি ও বিস্কুট দেওয়া হবে। সেই খিচুড়ি রান্নার দায়িত্ব যাতে জগা-মগার হাতে পড়ে জগাখিচুড়ি না হয়, সে জন্য কর্মকর্তারা মারাত্মক গবেষণা করেছেন। কীভাবে খিচুড়ি রান্না করতে হবে, কীভাবে সেই খিচুড়িতে ডাবর (কাঠের বড় চামচ বিশেষ) ডুবিয়ে প্রথমে গামলায় এবং গামলা থেকে তা অতি সন্তর্পণে থালায় ঢালতে হবে-এসব শিখতে ৫০০ কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠানোর একটি সানুনয় প্রস্তাব করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। ব্যস চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেছে। কি অপচয়, কি অপচয়। খিচুড়ি রান্না করতে বিদেশ যাওয়ার কি আছে। চারদিকে এ নিয়ে সমালোচনা চলছে। এই সমালোচনার ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে প্রাচ্যেরডান্ডি নারায়ণগঞ্জ শহরে। সর্বত্র খিচুড়ি বিষয়ক আলোচনা।

শহরে বুদ্ধিজীবীদের আড্ডাস্থল খ্যাত বোস কেবিনেও খিচুড়ি বিষয়ক আলোচনা শোনাগেছে। খিচুড়ি মুখে মুখে ফিরছিল। বাবুরাইলের একজন রাজনীতিবিদ বললেন, খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশ যাওয়ার কি দরকার ! আমাগো বাবুরাইল এলাকায় আইলেও অয়। আমাগো এলাকার বাবুর্চীরা খিচুড়ি রান্নায় বিখ্যাত। চার/পাঁচ পদের খিচুড়ি রান্না করতে জানে ওরা। পাতলা খিচুড়ি, লেটকা খিচুড়ি, সবজি খিছুড়ি ও ভুনা খিচুড়ি। পাতলা খিচুড়ির জন্য আলাদা বাবুর্চি। আবার লেটকা খিচুড়ির জন্য আলাদা আরেকজন। আরে মিয়া বাবুরাইলের বাবুর্চীগো রান্না করা খিচুড়ি এত মজা-খিচুড়ি শেষ অইলে আঙুল চাইট্টা-পুইট্টা খাইবেন। পাশ থেকে আরেকজন বললেন, আরে ভাই বাবুরাইলে বাবুর্চী আছে জানি। খিচুড়ি রান্না করতে বাবুর্চী লাগেনা। আমাগো ঘরের লোকজনই ভাল খিচুড়ি রান্না করে। খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশ যায় কোন গাধায় ! দেওভোগ এলাকার কয়েকজন বলে উঠলেন, আরে খিচুড়িতো উছিলা মাত্র। ওরা আসলে বিদেশ যেতে চায়। ভাগ্য ভাল খিচুড়ি রান্না শেখার কথা বলেছে। যদি থালা-বাসন মাজা শেখার কথা বলতো, তখন কেমন হতো। একজন পন্ডিত ব্যক্তি নিজের জ্ঞান ঝেরে দিলেন এভাবে-খিচুড়ি একটি ভাত জাতীয় খাবার যা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। প্রধানত চাল এবং মসুর ডাল দিয়ে সাধারণ খিচুড়ি ভাত রান্না করা হলে বজরা, মুগডাল সহ অন্যান্য ডালের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। অঞ্চলভেদে খিচুড়ির বিভিন্ন আঞ্চলিকরূপ পরিলক্ষিত হয়। যেমন নরম খিচুড়ি, ভুনা খিচুড়ি, মাংস খিচুড়ি, নিরামিষ খিচুড়ি ইত্যাদি। খিচুড়ি একটি সহজপাচ্য খাবার তাই শিশুকে প্রথম কঠিন খাবার হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় খিচুড়ি খাওয়ানো হয়। হিন্দুদের মধ্যে যারা উপবাসকালে কোনপ্রকার শস্যাদি গ্রহণ করতে চান না তারা এসময়ে সাবুদানা খিচুড়ি খেয়ে থাকেন। ওই পন্ডিত ব্যক্তির পান্ডিত্ব শুনে বাকীরা একটু থামলেন।

কয়েকজন বামনেতা ও সংস্কৃতিমনা লোক বিদ্রুপ করছিলেন। এদের একজন কাগজের সম্পাদকীয় পড়ে শোনালেন। তিনি পড়ছিলেন, বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেশবাসীর ট্যাক্সের টাকার শ্রাদ্ধ এবং কর্তাব্যক্তিদের বিনোদন ছাড়া আর কোনো কল্যাণ হয় কিনা তা একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। প্রশিক্ষণের জন্য এমন সব যুক্তি খাড়া করা হয় তাকে সোজা কথায় রামছাগলের কিচ্ছা বলাই বিধেয়। আমাদের প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের একাংশের মানসিক সুস্থতা সম্পর্কেও সংশয় সৃষ্টি করছে প্রশিক্ষণ বিষয়ক তথ্যাবলি। পুকুর-খাল-কূপ খনন, গরুর প্রজনন, আলু ও ধান চাষ শেখা, লিফট দেখা ইত্যাদি কারণেও দেশবাসীর ট্যাক্সের টাকার অপচয় করাকে তারা কর্তব্য বলে ভাবেন। জনগণের টাকা অপচয় করে তারা যে বিদেশ সফর করেন তা কোন কাজে লাগে- দেশবাসী দূরের কথা, সব গায়েবি বিষয়ের মালিক মহান স্রষ্টা ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়। বারবার এ ধরনের অপচয় ও যথেচ্ছতার বিরুদ্ধে গণমাধ্যম কলম ধরলেও তা সরকারের নীতিনির্ধারকদের চোখে পড়ে কিনা সন্দেহ। তা না হলে কেন চলছে একই ধরনের তামাশার পুনরাবৃত্তি।

বামনেতার পড়া শেষ হয়নি। তিনি পড়ে সকলকে শোনালেন, করোনাকালে যখন দেশের অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটের মুখে, যখন কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা প্রশ্নবিদ্ধ তখন আমাদের কর্তাব্যক্তিরা তাদের প্রতি সহানুভূতির বদলে তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে বিদেশ সফরের এমন এক প্রকল্প হাতে নিয়েছেন-যা কোটি কোটি টাকারই শুধু অপচয় নিশ্চিত করবে। অহেতুক বিদেশ সফর না করার জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দফতর ও অধিদফতর তা যেন ভুলেই গেছে। তার প্রমাণ হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য খিচুড়ি রান্না ও বিতরণ পদ্ধতি জানতে ১ হাজার কর্মকর্তাকে পর্যায়ক্রমে বিদেশ সফর করানোর একটি প্রস্তাব।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের এ হাস্যকর প্রস্তাব নিয়ে সর্বত্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অধিদফতরের ওই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর পর বিষয়টি জানাজানি হয় এবং ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। খিচুড়ি রান্না ও বিতরণের প্রস্তাব শেখার জন্য যারা ১ হাজার কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের প্রস্তাব দেন তারা কীভাবে সরকারি কর্মকর্তা হলেন সে প্রশ্ন করার অধিকার দেশবাসীর রয়েছে। প্রস্তাবটি শুধু প্রত্যাখ্যানই নয়, এর সঙ্গে যুক্তদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পাবনার হেমায়েতপুর অথবা বিদেশের কোনো মনোচিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানোই হবে যথার্থ কাজ। এ ধরনের তামাশার পুনরাবৃত্তি রোধে বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকরা ভেবে দেখতে পারেন।

কাগজের সম্পাদকীয় শুনে অনেকেই বললেন, যথার্থই লিখেছে কাগজখানা। দেশে এসব হচ্ছেটা কি। যার যা মন চায় সে তাই করে। সরকারি দলের সমর্থক একজন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন, ভাই আপনারা অনেক আলোচনা করলেন। শুনলাম। খিচুড়ি নিয়ে আমাদের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের লোকজন সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে এখানে আসছে। তাদের কোনো জ্ঞান-গরিমা নেই। হুট করে একটা কিছু লিখে দিলেই মনে হয় হয়ে গেল। সরকারের ভাবমূর্তি কোথায় গেল না গেল এরা তা দেখে না। সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। আসলে কিছু সাংবাদিক এই ভ্রান্তিমূলক রিপোর্ট করেছে। তবে লেটেস্ট খবর হলো ব্যাপক সমালোচনার মুখে অবশেষে খিচুড়ি রান্না শিখতে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের বিষয়টি বাতিল করতে বলেছে পরিকল্পনা কমিশন। বলা হয়েছে, করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি মাথায় রেখে কোনো প্রকল্পেই বিদেশ ভ্রমণ খাত রাখা হচ্ছে না। প্রাইমারি স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় একটি প্রকল্পে বিদেশে গিয়ে ডিম-খিচুড়ি, সবজিসহ অন্যান্য খাবার রান্না ও প্রসেসিং শিখতে পাঁচ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া দেশে একই বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য আরও চাওয়া হয়েছিল ১০ কোটি টাকা। কমিশন পুরো বিষয়টিই বাতিল করতে বলেছে।

দু’জন প্রবীণ সাংবাদিক বললেন, গণমাধ্যম ভ্রান্ত রিপোর্ট করেনি। যেহেতু সরকার এই প্রকল্প বাতিল করেছে তাতে বোঝা যায় গণমাধ্যম সঠিক সময়ে সঠিক রিপোর্ট করেছে। নইলে খিচুড়ি রান্না শেখা প্রকল্পের উছিলায় সরকারের টাকা অপচয় হত। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ায় সেই টাকা অপচয় থেকে রক্ষা পেয়েছে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও