হারিয়ে যাচ্ছে মিঠা পানির মাছ, নিঃস্ব হচ্ছে জেলে সম্প্রদায়

রণজিৎ মোদক || শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট ০৭:৫২ পিএম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার

হারিয়ে যাচ্ছে মিঠা পানির মাছ, নিঃস্ব হচ্ছে জেলে সম্প্রদায়

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ তার ‘সেকালের কথা’ প্রবন্ধে বলেছেন, গোলাভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ। এই ছিল সেকালের গৃহস্থের গৌরব। কথায় বলে মাছে ভাতে বাঙালি। বাঙালি মূলত ভোজন রসিক জাতি। বাংলাদেশ মানুষকে এবং খাইয়ে আত্মতৃপ্তি বা আনন্দ উপভোগ করেন। বারো মাসে তেরো পার্বণ এর নানান পদের মধ্যে মাছ চাই-ই। চাষের মাছ আর লোনাপানি সাগরের হচ্ছে ভরসা। কিন্তু দিন দিন দেশীয় মিঠা পানির মাছ নানান কারণে হারিয়ে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের হাওর বিল নদী-নালার নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে। পুকুর খাল ডোবাগুলো ভরে যাচ্ছে। চর এলাকায় গড়ে উঠেছে জনবসতি। বিশেষ শহর ও শহরতলীর এলাকা ঘিঞ্জি এলাকায় রূপ নিচ্ছে। গড়ে উঠছে বড় বড় শিল্প কারখানা। শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। নদীতে মাছ বা জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ মরে যাচ্ছে শুধু তাই নয় মিঠাপানির ৫৬ পদের মাছ আজ বিলুপ্তির পথে।

তন্মধ্যে পুটি, টেংরা, মলা, শিং, পাবদা, মেনি, মাগুর, শোল মাছ, চিতল, বোয়াল ও কৈ মাছ। এক সময় এসব মাছ গ্রাম বাংলার নদী-নালা, পুকুরে প্রচুর জন্মাতো। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রচুর বৃষ্টি হলে বৃষ্টির সাথে মেঘের গর্জন হলে ডোবা নালা পুকুর থেকে ডিমভরা কৈ, পুটি, মাগুর, শিং মাছ উঠে আসতো। বৃষ্টিতে ভিজে অনেকেই তা ধরে নিতো। এ দৃশ্য গ্রাম বাংলার অনেকেরই চেনা। তাছাড়া জমিদার আমলে রাজা জমিদার বাহাদুরগণ ভোজন রসিক ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ এদেশীয় মিঠাপানির নানা জাতীয় মাছ পরিবেশন করতেন। প্রতিযোগিতা হতো কে বেশি খেতে পারে, থাকতো পুরস্কার।

আজ সেগুলো ইতিহাস। তবে বর্তমানের নিতা নিমন্ত্রণ অন্য রূপ নিয়েছে। খাদ্য খানারও রূপ প্রকারভেদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মিঠাপানির মাছের স্থান দখল করে নিচ্ছে লোনা পানির মাছ। মিঠা পানির মাছ বিলুপ্ত হওয়ার আরো কারণ সমূহের মধ্যে রয়েছে। ফসলের ক্ষেতে ও ফলদ বৃক্ষের কীটনাশক রাসায়নিক অতিরিক্ত সার ব্যবহার। বর্তমানে মাছ ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম ভাবে মাছ চাষ করছে। চাষের মাছের স্বাদ তেমন মুখোরোচক নয়। ভোজন রসিকদের মতে এসব তথ্য জানা যাচ্ছে। তার কারণগুলো হচ্ছে ট্যানারি ও হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করায় স্বাস্থ্যহানির শিকার হচ্ছে অনেকেই। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে চাষের মাছের লিভার স্ট্রমাক এর ক্ষতির সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।

তবে হতাশার মধ্যেও আশার কথা হচ্ছে মিঠা পানির মাছ বিলুপ্ত হলেও লোনাপানির বিরাট মৎস্য সম্পদ আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দ্বার খোলা রয়েছে। এইতো কয়েকদিন হল জাতীয় মৎস্য দিবসে বিজ্ঞ মহলের বাণী ও তথ্য থেকে জানতে পারি বঙ্গোপসাগরে অফুরন্ত ভান্ডার রয়েছে। সাগরে রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় সম্পদ। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে জানা গেছে ২০১৯/২০ অর্থবছরে দেশে মৎস্য আহরিত হয় ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টন। এর মধ্যে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন ইলিশ।

বাংলাদেশের এই লোনা পানির মাছ বিশ্বের ৫৬টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। সর্বাধিক মৎস্য রপ্তানি দেশ হচ্ছে- রাশিয়া, জাপান, ফ্রান্স, আমেরিকা, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও সৌদিতে। দেশের যে পরিমাণ মৎস্য সম্পদ রয়েছে তার ১৬ ভাগের জোগান দিচ্ছে বঙ্গোপসাগর। দেশের মিঠাপানিতে রয়েছে মাত্র ২৫০ প্রজাতির মাছ। শুধু চিংড়ি রয়েছে ১৬ প্রজাতির। আরে সব মাছের চাহিদাও রয়েছে প্রচুর। তবে যেভাবে নদী-নালা ও পুকুর-ডোবা ভরা হচ্ছে এভাবে আগামীতে মিঠা পানির বিভিন্ন পদের মাছ অবশ্য ধারাবাহিকভাবে বিলুপ্তি ঘটবে। সবাইকে চাষের মাছ আর সাগরের মাছের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও