ধর্ষণকাণ্ডে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানকে স্বাগত

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২৩ পিএম, ১৫ অক্টোবর ২০২০ বৃহস্পতিবার

ধর্ষণকাণ্ডে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানকে স্বাগত

নারীরা জেগে উঠছে। এখন থেকে কেউ আর ঘটনা চেপে রাখবেনা। অবশ্যই তা প্রকাশ করবে। কেননা অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখেই ধর্ষণ আইনটি পাশ হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সাধারণ মানুষ। ধর্ষণ মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখায় জেগে উঠেছে গ্রামবাংলার অবলা নারীরা। দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আশায় মুখ খুলতে শুরু করেছে। শুরু হয়েছে নারীদের প্রতিবাদ।

৮ দিন আগে পালাক্রমে গণধর্ষণের শিকার আড়াইহাজার উপজেলার এক বিধবা নারী থানায় মামলা ঠুকেছেন। ঘটনা চেপে না রেখে বিচারের আশায় সাহস করে ওই বিধবা ও ২ সন্তানের জননীর মামলার বিষয়টি পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। পুলিশও তৎপর হয়ে উঠেছে। এক রাতে পর্যায়ক্রমে ৬ জনে ঐ বিধবা নারীকে গণধর্ষনের ঘটনায় আলী আকবরকে (৫০) গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে উপজেলার নৈকাহন আখরপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে আলী আকবরকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত আলী আকবর ঐ এলাকার মৃত বছির উদ্দিনের ছেলে। এ ঘটনায় গণধর্ষনের শিকার বিধবা নারী বাদী হয়ে আলী আকবরকে প্রধান আসামী করে ৬ জনের বিরুদ্ধে আড়াইহাজার থানায় ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। আড়াইহাজারে আরো একটি ধর্ষণ ঘটনা ঘটেছে। এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা ধর্ষণ করে হত্যা করে তার লাশ ফেলে গেছে গর্তে।

ঘন ঘন ধর্ষণ কান্ডে সুধীমহল ধিক্কার জানিয়ে বলেছে, ওরা সমাজের ক্লিব। কি কারণে ধর্ষণ কান্ডের জন্ম দেয় কে জানে। ওরা মানসিক রোগী। ওদের উপর পশুত্ব ভর করে। যাক আইনটা বেশ পাকাপোক্তই হয়েছে বলতে হবে। ধর্ষণ প্রমাণীত হলে ধর্ষণকারীর ভবলীলা হবে সাঙ্গ। ধর্ষণের ঘটনাগুলো অনেক সময় সাজানো ও পরিকল্পিত হয়ে থাকে। তেমনটা যেন না ঘটে সে দিকে নজর দিলে ভাল হয়। আশা করা যায়, আইনশৃংখলা বাহিনী সেদিকে কড়া নজর রাখবে।

কয়েকজন রাজনীতিবিদের সাথে আলাপকালে তারা বলেন, ধর্ষণকান্ডে শুধু একা পুরুষ দায়ী থাকেনা। কিছু ঘটনা উভয় পক্ষের সম্মতিতে হলেও নারীরা পরে গিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন। আবার অনেক নারী বার বার ঘটনার শিকার হয়েও মানসম্মান খোয়ানোর ভয়ে ঘটনা চেপে যান। অনেকে আত্মীয়স্বজনের মধ্যকার বিষয় বলে মিমাংসার পথ খোঁজেন। যাই হোক আইন যত কড়া হবে অপরাধ প্রবণতা ততই কমে আসবে। আমরা এই কামনাই করি। সরকারকে জানাই সাধুবাদ।

প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে জড়িতরা বলেন, ধর্ষণ কেনো কোন অপরাধ প্রবণতা আমরা এই সমাজে দেখতে চাইনা। আজকাল শহরের রাস্তায় হাঁটা যায়না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও একজন আরেকজনের গাঁয়ে ঘেষা লেগে যায়। অনেক সময় মেয়েরা তেলে-বেগুণে জ্বলে উঠেন। আবার উল্টো চিত্রও রয়েছে। ফুটপাতে প্রচন্ড ভিড়ের সময় দু’একজন মহিলা পেছনে কে আছে না দেখেই হঠাৎ কোন কিছুর সামনে থমকে দাঁড়ান। তখন পেছনে কোন পুরুষ বা মহিলা থাকলে ধাক্কা লাগে। যা অনাকাঙ্খিত। কিন্তু ঘটনার উৎপত্তির জন্য দায়ী কে ? ঘটনার সূত্রগুলো খেয়াল করা জরুরী।

কয়েকজন সংস্কৃতিমনা লোক জানান, আজকাল হাই সোসাইটির কালচারের সাথে কমবেশি সকলেই পরিচিত। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে মেয়েরাও সেই কালচারের সাথে পরিচিত। অনেকে সেই কালচারের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বিপদে পরে। অবাধ মেলামেশার নামে ছেলে বন্ধুদের সাথে অনেকেই রাজধানীতে বা রাজধানীর বাইরে ঘুরতে যায়। পরবর্তীতে প্রকাশ পায় একটি ন্যাক্কারজনক ধর্ষণ ঘটনা। নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয় ধর্ষণের ভিডিও। কখনো আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে সেই ঘটনার ইতি ঘটে। আবার প্রেমের নামে বিয়ের প্রলোভনে অবাধ মেলামেশা। বিয়ে না হলেই মেয়ের কান্নাকাটি। বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সবারই পরিবার আছে। মা-বোন নিয়েই বসবাস। এরা কোন পরিবার থেকে আসে যে, বিয়ের প্রলোভনে নিজেকে সপে দেয় একটি পুরুষের কাছে। ধর্ষণতো ধর্ষণই। বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষিতা হতে যাওয়ার আগে একবারও কি মেয়েটির পরিবারের মানসম্মানের কথা মাথায় আসেনা। তারতো মনে রাখা উচিৎ কোন পরিবার থেকেই একটি মেয়েকে এমন অনুমতি দেয়া হয়না-যাতে করে সে কারো সাথে বিয়ের আগেই মেলামেশা করতে পারবে। বিশেষ করে শারীরিক সম্পর্ক তৈরী করতে পারবে। দেশটাতো এখনো ফ্রি সেক্সের দেশ হয়ে যায়নি। একটি মেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েই কেনো নিজেকে কোন পুরুষের বিছানায় তুলে দিবে। তাহলে সমাজ ব্যবস্থা বলে কি থাকলো। এই দেশেতো বেহায়াপনা ও উলঙ্গ সংস্কৃতি চালু হয়নি। তাহলে এসব কেনো ?

আড়াইহাজার উপজেলার ঘটনার পর কয়েকজন পুলিশ সদস্য বলেছেন, ওষুধ আনতে যাবেন ভাল কথা। আপনাকে কেউ ডাকলো আর আপনি তার ডাকে সাড়া দিয়ে বাজারের পেছনে কোন দোকানের ভেতরে চলে যাবেন কেনো। আপনি কি বোবা? আপনি কি ল্যাংড়া। আপনি কি অন্ধ ? লোকটি কি আপনার পরিচিত। নাকি অপরিচিত। পরিচিত বা অপরিচিত যাই হোক-আপনি একজন বিধবা নারী। বয়স এখনো আছে। আপনি নিজের সম্ভ্রম কেনো রক্ষা করতে চাইলেন না। রাস্তায় কারো সাথে ধাক্কা লাগলে যেখানে মানুষ দু’টি কড়া কথা শুনিয়ে দেয়, সেখানে আপনি একজন অপরিচিত লোকের ডাকে সাড়া দিলেন। তাও বাজারের পেছনে চলে গেলেন। আপনি একজন নারী। আপনি অপরিচিত লোকের সাথে বাজারের পেছনে চলে যেতে ভয় পান না। রহস্যতো রয়েই গেল। তারপর ৮ দিনের মাথায় থানার ওসিসহ সকলেই জানতে পারলো আপনি সে দিন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এমন ঘটনাগুলি থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে। কারো ডাকে কোন মহিলা বিনাবাক্য ব্যয়ে বাজারের পেছনে চলে যাওয়ার কি এমন প্রয়োজন ছিল। নিঃশব্দে একজন বিধবার সর্বনাশ ঘটে গেল। তবে এমন অসঙ্গতিতে ভরা অপকর্মের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিৎ।

চেপে রাখা গণধর্ষণ ঘটনা

মামলার সূত্রে জানা গেছে, আড়াইহাজার উপজেলার কায়েমপুর এলাকার দুই সন্তানের জননী বিধবা নারী একই উপজেলার বিনাইরচরস্থ ভাই ভাই স্পিনিং মিলের শ্রমিক। সে গত ৭ অক্টোবর সন্ধা সাড়ে ৭ টায় দোকানে ঔষধ আনতে যায়। নৈকাহন বাজারের আনিসের মার্কেটের সামনে পৌঁছালে আলী আকবর নামে এক যুবক ঐ নারীকে ডাক দিয়ে বাজারের পেছনে মাছের দোকানে নিয়ে যায়। পরে দোকানের সার্টার বন্ধ করে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। নারী দোকান হতে বের হওয়ার পর বাইরে থাকা একই এলাকার মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মোস্তফা (৫৫), একই এলাকার আনারুল (৪০) লিটন (৩২) নারীকে জিজ্ঞেস করে আলী আকবরের সাথে কি করছত। তারপর আপোষ করে দেয়ার কথা বলে লিটনের পুকুর পাড়ে নিয়ে যায়। রাত সাড়ে ৮ টায় তিনজন পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরবর্তীতে লিটন ফোন করে শাহীন (৩২) ও তরিকুল (৩৪) ডেকে এনে তারা নারীকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যেতে চায়। এতে রাজি না হওয়ায় শাহীন ও তরিকুল নারীকে জোর করে রাত সাড়ে ১০ টায় একই এলাকার আলী হোসেনের নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে নিয়ে ধর্ষণ করে। পালাক্রমে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও বিধবা নারী লোকলজ্জায় ও ছেলে মেয়ের কথা চিন্তা করে ঘটনা গোপন করে রাখে। কিন্তু পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজনের সাথে আলোচনা করে বুধবার রাতে আড়াইহাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করে।

আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিধবা নারীকে গণধর্ষনের ঘটনায় ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলার প্রধান আসামী আলী আকবরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামীদেরকে গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

দ্বিতীয় হত্যাকান্ড

ফজরের নামাজ পড়তে উঠে বাড়ির পাশেই ওৎ পেতে থাকা দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে এক মাদ্রাসা ছাত্রী। তানজিনা আক্তার (১৪) নামের ওই কওমী মাদ্রাসার ছাত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে বাড়ির পাশে একটি গর্তে ফেলে দিয়ে গেছে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা।

পুলিশ বলছে, কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ ফেলে দিয়ে যায়। গতকাল বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদী পৌরসভার রামচন্দ্রদী এলাকা হতে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

নিহত তানজিনা আক্তার উপজেলার রামচন্দ্রদী এলাকার মাটি কাটার শ্রমিক আফতাব উদ্দিন ওরফে আকতার হোসেনের মেয়ে। সে স্থানীয় কওমী মাদ্রাসার ছাত্রী।

নিহতের বাবা আকতার হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার ফজর নামাজ পড়তে আমরা সবাই ঘুম থেকে উঠি। একই সময় তানজিনা আক্তারও নামাজ পড়তে উঠে। নামাজের পর মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে আশেপাশে খুঁজে বেড়ালেও তাকে পাওয়া যায়নি। সকালে তাদের বাড়ির পাশে একটি গর্তে তানজিনার লাশ দেখতে পায়। তানজিনাকে কে বা কারা হত্যা করে লাশটি গর্তে ফেলে দেয়।

আড়াইহাজার থানার গোপালদী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আজহার উদ্দিন পরিবারের বরাত দিয়ে জানান, তানজিনা আক্তার একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে। বৃহস্পতিবার ভোরে কে বা কারা তানজিনাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে তাদের বাড়ির পাশে একটি গর্তে লাশটি ফেলে দিয়ে যায়। ঘটনার সংবাদ পেয়ে দুপুরে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও