বঙ্গবন্ধুর বাদশা মিয়া নারায়ণগঞ্জের শ্বশুর

এস এম শহিদুল্লাহ (লেখক ও গবেষক) || ১০:১১ পিএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২১ শুক্রবার

বঙ্গবন্ধুর বাদশা মিয়া নারায়ণগঞ্জের শ্বশুর

১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ দল গঠন হওয়ার পর পর ঢাকায় কোনো জনসভা করতে পারত না। সেই দুরবস্থা থেকে উত্তরণ সম্পর্কে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন : “আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন হওয়ার কয়েকদিন পরেই...একটা জনসভা আওয়ামী লীগ আরমানিটোলা ময়দানে ডেকেছিল। মওলানা ভাসানী সেই প্রথম ঢাকায় বক্তৃতা করবেন। শামসুল হক সাহেবকে ঢাকার জনগণ জানত। তিনি বক্তৃতাও ভাল করতেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ যাতে জনসভা না করতে পারে সে জন্য মুসলিম লীগ গু-ামির আশ্রয় গ্রহণ করে। যথেষ্ট জনসমাগম হয়েছিল, সভা যখন আরম্ভ হবে ঠিক সেই মুহূর্তে একদল ভাড়াটিয়া লোক মাইক্রোফোন নষ্ট করে দিয়েছিল এবং প্যান্ডেল ভেঙে ফেলেছিল। অনেক কর্মীকে মারপিটও করেছিল। ঢাকার ভীষণ প্রকৃতির লোক বড় বাদশা বাবুবাজারে (বাদামতলী ঘাট) থাকে। বড় বাদশার লোকবল ছিল, তার নামে দোহাই দিয়ে ফিরত এই সমস্ত এলাকায়। তাকে বোঝান হয়েছিল, আওয়ামীলীগ যারা করেছে এবং আওয়ামীলীগের সভা করছে তারা সবাই ‘পাকিস্তান ধ্বংস করতে চায়’Ñএদের সভা করতে দেওয়া চলবে না। বাদশা মিয়াকে লোকজন জোগাড় করে সভা ভাঙবার জন্য পাঁচশত টাকা দেওয়া হয়েছিল।

বাদশা মিয়া খুব ভাল বংশের থেকে এসেছে, কিন্তু‘ দলে পড়ে এবং ঢাকার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় শরিক হয়ে খারাপ রাস্তায় চলে গিয়েছিল। দাঙ্গা করে অনেক মামলার আসামিও হয়েছিল। সভায় গোলমাল করে চলে গেলে ঐ মহল্লার বাসিন্দা জনাব আরিফুর রহমান চৌধুরী তার কাছে গিয়ে বললেন, “বাদশা মিয়া, আমাদের সভা একবার ভেঙে দিয়েছেন। আমরা আবার সব কিছু ঠিক করে সভা আরম্ভ করছি। আপনি আমাদের কথা প্রথমে শুনুন, যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বলি বা দেশের বিরুদ্ধে বলি তারপরে সভা ভাঙতে পারবেন।” চৌধুরী সাহেবের ব্যবহার ছিল অমায়িক। খেলাফত আন্দোলন থেকে রাজনীতি করছেন। দেশের রাজনীতি করতে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বরিশালের উলানিয়ার জমিদারি বংশে। বাদশা মিয়া দলবল নিয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সভার বক্তৃতা শুনতে লাগল। কয়েকজন বক্তৃতা করার পরে বাদমা মিয়া প্লাটফর্মের কাছে এসে বলল, “আমার কথা আছে, আমাকে বলতে দিতে হবে।” কে তাকে বাধা দেয়, বলতে গেলে আরমানিটোলা ময়দান তার রাজত্বের মধ্যে। বাদশা মিয়া মাইকের কাছে যেয়ে বলল, “আমাকে মুসলিম লীগ নেতারা ভুল বুঝিয়েছিল আপনাদের বিরুদ্ধে। আপনাদের সভা ভাঙতে আমাকে পাঁচশত টাকা দিয়েছিল, এ টাকা আপনাদের সামনে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি।” এ কথা বলে টাকাগুলি (পাঁচ টাকার নোট) ছুঁড়ে দিল। সভার মধ্যে টাকাগুলি উড়তে লাগল। অনেকে কুড়িয়ে নিল এবং অনেকে ছুঁড়ে ফেলল। বাদশা মিয়া আরও বলল, “আজ থেকে আমি আওয়ামীলীগের সভ্য হলাম, দেখি আরমানিটোলায় কে আপনাদের সভা ভাঙতে পারে?” জনসাধারণ ফুলের মালা বাদশা মিয়ার গলায় পড়িয়ে দিল। জনগণের মধ্যে এক নতুন আলোড়নের সৃষ্টি হল। মুসলিম লীগ গু-ামির প্রশ্রয় নিয়েছিল একথা ফাঁস হয়ে পড়ল। আওয়ামীলীগের সভা ভাঙতে টাকাও দিয়েছিল একথাও জনগণ জানতে পারল। যদিও এতে তাদের লজ্জা হয় নাই। এই গু-ামির পথ অনেক দিন তারা অনুসরণ করেছে যে পর্যন্ত না আমরা বাধ্য করতে পেরেছি তাদের তা বন্ধ করতে। তারা ঠিক করেছিল, বিরুদ্ধ দল গঠন করতে দেওয়া হবে না। তারা যে জনসমর্থন হারাচ্ছে, কেন তার সংশোধন না করে তারা বিরুদ্ধ দলের উপর নির্যাতন শুরু করল এবং গু-ামির আশ্রয় নিল?”

এর কিছু দিন পর আওয়ামী লীগের আরেকটি জনসভার কথা বলতে গিয়ে বাদশা মিয়া সম্পর্কে শেখ মুজিব বলেছেন : “আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম এবং আরমানিটোলা ময়দানে এক জনসভা ডাকলাম। কারণ তখন খাদ্য পরিস্থিতি খুবই খারাপ। লোকের দুরবস্থার সীমা নাই। মওলানা সাহেব সভাপতিত্ব করলেন। আতাউর রহমান খান, শামসুল হক সাহেব ও আমি বক্তৃতা করলাম। মুসলিম লীগ চেষ্টা করেছিল গোলমাল সৃষ্টি করতে। বাদশা মিয়া আমাদের দলে চলে আসায় এবং জনগণের সমর্থন থাকায় তারা সাহস পেল না।”

সেই বাদশা মিয়া হলেন নারায়ণগঞ্জের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের নলুয়া রোড মহল্লার কাজী নজরুল ইসলাম মিন্টুর শ্বশুর। জনাব মিন্টু হলেন দলিল লেখক মরহুম কাজী আবদুল হালিম সাহেবের জেষ্ঠ্য পুত্র। বাদশা মিয়া ২ ছেলে ও ২ মেয়ের জনক ছিলেন। তন্মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ে সাহেরা বেগম ভুইয়ার স্বামী হলেন নজরুল ইসলাম মিন্টু। বাদশা মিয়া বসবাস করতেন বাবুবাজারের জিয়াউদ্দিন রোডের নিজ বাড়িতে। তিনি পেশায় ছিলেন একজন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী।

১৯৭১ সালের ২০মে পাক সেনাদের অত্যাচারে হাসপাতালে অন্তরীণ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বাদশা মিয়া। তাঁর জামাতা নজরুল ইসলাম মিন্টু দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আমার শ্বশুর পুরান ঢাকার বাদশা মিয়া, যাকে আইয়ুব সরকার ‘গু-া’ উপাধি দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠালগ্নে আওয়ামীলীগে যোগদান করে তিনি দলকে উজ্জীবিত করেছিলেন যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী ’ গ্রন্থে’ উল্লেখ করেছেন। অথচ তাঁর মৃত্যুর পর আওয়ামীলীগের কেউ তাঁর স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের একটি বারের জন্যও খোঁজ খবর নিতে আসেননি।”


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও