বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী বায়স্কোপ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৪৬ পিএম, ৩১ মার্চ ২০২১ বুধবার

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী বায়স্কোপ

একসময় গ্রাম বাংলার বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল ঐতিহ্যবাহী বায়স্কোপ। গ্রাম বাংলার প্রচলিত জনপ্রিয় কাহিনী বিভিন্ন কাল্পনিক চিত্র, জনপ্রিয় স্থান, নায়ক নাইকা কিংবা চিত্র কর্মের ছবি দেখানো হতো বায়স্কোপে। কাঠ কিংবা টিন দিয়ে বানানো বাক্সে ছোট ছোট কাঁচের জানালায় মানুষ চোখ রাখতো। প্যাডেল ঘুরিয়ে একটার পর একটা ছবি দেখানো হতো। সেই সাথে যাত্রাবালার মতো সুশ্রী কণ্ঠে প্রতিটি ছবির বর্ণনায় তা জীবন্ত হয়ে উঠতো। শিশুরা হারিয়ে যেত কল্পনার এক অন্য পৃথিবীতে।

কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে এখন ঘরে ঘরে চলে এসেছে সিডি, টিভি, ভিসিআর, মোবাইল ফোন, কম্পিউটারসহ অসংখ্য বিনোদন মাধ্যম। আধুনিকতার ভারে হারিয়ে যেতে বসেছে বায়স্কোপ নামের ঐতিহ্যবাহী বিনোদন মাধ্যমটি। একসময় গ্রামেগঞ্জে খুব প্রচলিত থাকলেও এখন আর দেখা মেলে না। বংশাগতভাবে যারা এই পেশা পেয়েছেন তাঁরাও এখন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। পরবর্তি প্রজন্মকেও শেখাচ্ছেন অন্য পেশা। কারণ এই পেশায় এখন সাংসার চালানো অসম্ভব।

সারা বাংলাদেশে খুঁজলে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত যে কয়জন মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে তাঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন আ. জলিল মন্ডল। তিনি রাজশাহীতে থাকেন। দেশের যে প্রান্তে মেলা হয় মেলার আয়োজকরা আমন্ত্রণ জানালে তিনি সেখানেই ছুটে যান। আবার কখনো কখনো নিজ উদ্যোগেই সেখানে উপস্থিত হন ঐতিহ্যবাহী বায়স্কোপ নিয়ে। তবে বায়স্কোপ প্রদর্শণের অর্থ দিয়ে এখন আর সংসার চলে না বিধায় তিনি কৃষি কাজ করেন।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১ থেকে মার্চ পর্যন্ত সোনারগাঁ জাদুঘরে মাসব্যাপী আয়োজিত লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে জলিল মন্ডল এসেছেন বায়স্কোপ নিয়ে। সেই মেলাতেই নিউজ নারায়ণগঞ্জের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় জলিল মন্ডলের। বায়স্কোপ নিয়ে তাঁর আশা, প্রত্যাশা ও হতাশা ভাগাভাগি করেন আমাদের সাথে।

আ. জলিল মন্ডল নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বায়স্কোপ। আগে খুব চলতো। এখন আর চলে না। এখন সিডি, টিভি, মোবাইল হওয়াতে বায়স্কোপ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর চলে না। মেলা-খেলাতে যাই ছেলেপেলেদের আনন্দ দেওয়ার জন্য। ছেলে পেলে দুই চারপা যাই হয় দেখে। এই ঐতিহ্য আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। এই ঐতিহ্যের মূল্য আর মানুষ দেয় না। এই বায়স্কোপের উপর আর সংসার চলে না। এখন কৃষি কাজ করে চলি। বায়স্কোপ মানুষ আর দেখে না।’

জলিল মন্ডল বাপ-দাদার কাছ থেকে বংশানুক্রমে বায়স্কেপাটি পেয়েছিলেন। এখন তাঁর ঘরে দুই মেয়ে। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন আরেক মেয়ে আখনো ছোট। জলিল মন্ডলের পর তাঁর বংশের আর কেউ বায়স্কোপ চালানোর মতো কেউ নেই বিধায় খুব আক্ষেপ করেন। তিনি চলে যাওয়ার পর বাংলার ঐতিহ্যবাহী বায়স্কোপ বিলুপ্ত হয়ে যাবে, পরবর্তি প্রজন্ম শুধু বই পুস্তকে পড়েই বায়স্কোপ সম্পর্কে জানতে পারবে ভেবে মানুষের মাঝে আনন্দ ফেরি করা হাস্যজ্জল মানুষটির মুখ মলিন হয়ে যায়।

আক্ষেপ করে নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জলিল মন্ডল বলেন, ‘আমার বাপ চাচারা করতো। তাঁদের থেকেই আমি পাইছি। ৪৫ বছর ধরে আমি বায়স্কোপ চালাই। আমার পরে বায়স্কোপ চালানোর মতো আমার পরিবারে আর কেউ নাই। আমি চলে যাওয়ার পরে এই ঐতিহ্য ধরে রাখার মতো আর কেউ থাকবে না।’

ঐতিহ্য ধরে রাখার আর্জি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি মেলায় যেন বায়স্কোপ রাখা হয়। একটি নির্দিষ্ট স্থান করে দেওয়া হয়। বায়স্কোপ দিয়ে এখন আর সংসার চলে না। আমাদের যদি একটু সাহায্য সহযোগীতা করা হতো তাহলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বায়স্কোপ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।’


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও