‘পাঠাও’ চালকেরা অন্ধকারে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩০ পিএম, ২ এপ্রিল ২০২১ শুক্রবার

‘পাঠাও’ চালকেরা অন্ধকারে

সাদেকুর রহমান। বয়স ৩৫ বছর। নারায়ণগঞ্জে তিনি রাইড শেয়ার করেন। যাকে সার্বজনিনভাবে ‘পাঠাও’ বললেই সবাই বুঝতে পারেন। সাদেকুর তিন বছর ধরে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করেন। পাঁচ সদস্যের সংসার। তার রোজগার ভালই হয়। দৈনিক তেল খরচ বাদ দিয়ে ৮০০ টাকা হলেই তিনি বাসায় চলে যান। এর বেশি তার টার্গেট নেই। কারণ বেশি টার্গেট হলে পরিশ্রমটা বেশি হয়ে যায়। তাছাড়া রিস্ক বেড়ে যায়। চেনাজানা গন্ডির মধ্যেই তার চলাচল সীমিত। করোনাকালে খুব সমস্যায় ছিলেন। বুধবার বিআরটিএ রাইড শেয়ার ঘোষনা করাতে বেকার হয়ে পড়বে সাদেকুর রহমানের মত মোটরসাইকেল চালকেরা।

লিংকরোডের সাইনবোর্ডে মহানগর পেট্রোল পাম্পেই মোটরসাইকেল এর উপর বসেছিলেন সাদেকুর। ১০/১২টি মোটর সাইকেল সারিবদ্ধভাবে রাখা। সকলেই পথের দিকে চেয়ে আছে। কাউকে দেখলেই জিজ্ঞাসা করছে, ভাই কোথায় যাবেন?

সাদেকুরের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মুক্তাদির আহমেদ। সে এই পেশায় নতুন। এক মাসের একটু বেশি সময় ধরে মোটর সাইকেল কিনেছেন। রানার কোম্পানীর মোটর সাইকেল কিনেছেন কিস্তিতে। নতুন এই যুবকের টার্গেট ৫০০ টাকা। তেল খরচ বাদে ৫০০ টাকা আয় হলেই তিনি খুশি। একশ পঞ্চাশ সিসি’র একটি সেকেন্ড হ্যান্ড মোটর সাইকেল কিনেছেন রানার এর কাঁচপুর শোরুম থেকে। একটি কিস্তি মাত্র দিয়েছেন। এরই মধ্যে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধিতে সরকার ২ সপ্তাহের জন্য রাইড শেয়ার অর্থাৎ মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।

নতুন মোটর সাইকেলটির দিকে চেয়ে মলিন মুখে মুক্তাদির আহমেদ বললেন, মাত্র মোটর সাইকেলটা কিনলাম। একটি কিস্তি দিয়েছি। দুই সপ্তাহ বেকার বসে থাকতে হবে। এরপর যদি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরো বাড়ানো হয় তখন আমরা কি করবো। আমাদেরতো কেউ সাহায্য করেনা। কিস্তি দেবো কিভাবে। সংসারের কি অবস্থা হবে। বার বার বিপদে পড়ছি। বেকারত্ব ঘোচাতে কিস্তিতে মোটর সাইকেল কিনলাম। ভালই আয় হচ্ছিল। এক মাস ভালই কাটলো। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট ভাল করে চিনে উঠতে পারিনি। আবারো নিষেধাজ্ঞায় পড়লাম। বেকারদের কপালই মন্দ। একটা বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়ার আগেই আরেকটা এসে পড়ছে ঘাড়ের উপর।

নারায়ণগঞ্জের অনেক ছাত্র, যুবক ও পেশাজীবী লোকজন করোনাকালীন সময়ে রাইড শেয়ারিং করতেন। অনেকে এর সাথে খাপ খেয়ে গেছেন। অনেক শিক্ষিত তরুণ বেকারত্ব ঘোচানোর পথ খুঁজে পেয়েছে রাইড শেয়ারিং এর মধ্যে দিয়ে। মাথায় হেলমেট পরে মোটরসাইকেলের সামনে বসে থাকেন। সচরাচর কেউ যেতে কোথাও যাওয়ার কথা না বললে তারা কাউকে ডাকেন না।

বন্দরের মধ্য বয়েসী মোসাদ্দেকুর রহমান তেমনি একজন। তিনি রাইড শেয়ারিং করেন তবে তার গ্রাহক আলাদা। গ্রাহকরাই তাকে ফোন করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করেন। মোসাদ্দেকুর রহমান টাকা পয়সা নিয়ে কড়াকড়ি নন। সারাদিনে তেল খরচ বাদ দিয়ে ৫/৬ ‘শ টাকা আয় হলেই তিনি সন্তুষ্ট। কোন কোন দিন এক থেকে দেড় হাজার টাকাও আয় হয়। তিনি যাত্রী ধরার জন্য বসে থাকেন না। সেই মোসাদ্দেকুর রহমানও কষ্ট পেলেন রাইড শেয়ারিং বন্ধের ঘোষণা শুনে। সংসার খরচ, নিজের একটা খরচ। হিসেবটা মিলে না। সামনে রমজান। কি যে হবে ? চোখে মুখে অন্ধকার দেখছেন।

প্রসঙ্গত, মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বুধবার বিআরটিএ’র এক অফিস আদেশে বিষয়টি জানানো হয়েছে। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে দুই সপ্তাহের জন্য রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের মাধ্যমে এই সেবা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

অফিস আদেশে বলা হয়, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত (আপাতত দুই সপ্তাহ) রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও, গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের নির্দেশনাও দিয়েছে বিআরটিএ।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও