সেরা ১০ পাহাড় জয়ে নারায়ণগঞ্জের যুবক

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০১:৩০ পিএম, ৪ এপ্রিল ২০২১ রবিবার

সেরা ১০ পাহাড় জয়ে নারায়ণগঞ্জের যুবক

বাংলাদেশের অন্যতম ১০টি সর্বোচ্চ পাহাড় জয় করেছেন নারায়ণগঞ্জের ছেলে রাহাত সরকার। একেকটি পাহাড়ে কখনো ৫ দিন আবার কখনো তারও বেশি সময় লেগেছে। এখন স্বপ্ন পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা।

সম্প্রতি দেশের সর্বোচ্চ ১০টি পাহাড় জয় করা সহ রাহাত সরকার নিজের ভ্রমণ অনুভূতি প্রকাশ করেছে নিউজ নারায়ণগঞ্জের এর সাথে। সে জানিয়েছে খুব শিঘ্রই মাউন্ট এভারেস্ট লক্ষ্য নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে এখনই শরীর চর্চা সহ সকল কৌশলগুলো শিখতে শুরু করবে রাহাত।

রাহাত সরকার শহরের আল্লামা ইকবাল সড়কের বাসিন্দা ও সরকারি তোলারাম কলেজের বিবিএস শেষ বর্ষের ছাত্র। বাবা মজিবুর রহমান ও মা ফরিদা বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে সে দ্বিতীয়। পড়ালেখার পাশাপাশি ছোট ব্যবসারও করছেন রাহাত।

রাহাতের জয় করা ১০টি পাহাড় হলো, সাকা হাফং, যার উচ্চতা ৩ হাজার ৪৬৮ ফুট, জোতল্যাং/ মোদক মুয়াল এর উচ্চতা ৩ হাজার ৩৩৫ ফুট, দুমলং পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ৩১৪ ফুট, জোগি হাফং পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ২৫১ ফুট, কেওক্রাডং পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ২৩৫ ফুট, মাইথাই জামা হাফং পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ১৭৪ ফুট, থিংদৌলতে তø্র্যাং পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ১৪৯ ফুট, মুখ্রা তুথাই হাফং পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ১২৯ ফুট, কপিতাল পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ৯৪ ফুট ও ক্রেইকুংতং পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ৮৩ ফুট। (উচ্চতার মাপ উকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত তাই কম বেশি হতে পারে)।

রাহাত বলেন, ‘২০১৪ সালে ১২জন বন্ধু এক সঙ্গে বগা লেক, কেওক্রাডাং ভ্রমণ দিয়ে এ পাহাড় জয়ের যাত্রা শুরু হয়। তারপর থেকেই একেক করে পাহাড়ে উঠার ইচ্ছা জাগতে শুরু করে। তাছাড়া এর মধ্যে বাংলাদেশের সকল বড় ঝরনাগুলো আমার ভ্রমণ হয়ে গেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ক্রেইকুংতং পাহাড় জয় করা হয়। আর এর মধ্যে দিয়ে আমার বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ ১০টি পাহাড় জয় করা হয়। আমি জানি না নারায়ণগঞ্জে আর কেউ অন্যতম ১০টি পাহাড় জয় করেছে কিনা। তবে আমি এটা করতে পরে বেশ আনন্দিত।’

এ পাহাড় জয়ে কেউ সঙ্গী ছিল? রাহত বলেন, ‘আলিফ হান্নান, ওয়াদ্রিব আহমেদ ও শাহেদ আহমেদ রিমন, এ তিনজন আমার সঙ্গী হয়েছিলেন। তবে এক সঙ্গে দুটি পাহাড়, আরেকজনের সঙ্গে ২টি এভাবে তিনজনের সঙ্গে ১০টি পাহাড় জয় করা।

এ পাহাড় জয়ের কিংবা ভ্রমণের স্মরণীয় কোন গল্প আছে? রাহাত বলেন, ‘আমি জিমশিয়াম সাইপার ঝরনা দেখে ফেরার পথে রাতের ট্র্যাকিংয়ের সময় বিশ্রামের জন্য জায়গা খোঁজ করছিলাম। ওইসময় একটি সবুজ সাপের উপরে আমার পা পড়ে। আমি অনুভব করলাম পায়ের নিচে কিছু একটা আছে। সেই সময় আমার জুতা ও জিন্স প্যান্ট এবং পায়ের এংলেট থাকায় তেমন কোন বিপদ হয়নি। পরে আমার যে গাইড ছিল সেটা সাপটি থেকে আমাকে উদ্ধার করে। সেখানে একটা ভয়ানক চিত্র ছিল।’

তিনি বলেন, ‘আরেকটি হলো, দুমলং পাহাড় চূড়ায় উঠতে গেলে ভারত ও বাংলাদেশ বর্ডার সীমানা ধরে নোম্যানসল্যান্ড ধরে হাঁটতে হয়েছে। এটা ছিল খুবই বিপদজনক। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাওয়া। কেন না এখানে চলাচল নিষেধ। এছাড়াও এখানে একটি জুম ঘরে আমরা রাত্রিযাপন করি। সেখানেই আমরা রাতে ভালুকের শব্দ পাই। যা আমাদের ভয় পাইয়ে দেয়। তবে ঘুম থেকে উঠে সকালে যখন হরিণ দেখি তখন মনটা ভালো হয়ে যায়।’

পাহাড়ে উঠতে গিয়ে কোথায় থেকেছেন আর কি খেয়েছেন? তিনি বলেন, ‘একজন পাহাড় ভ্রমণকারীর কাছে নুডুলস হলো পাহাড়ের সহজ খাবার। দ্রুত রান্না করা ও খাওয়া যায়। এছাড়াও প্রতি ভ্রমণের সময় ব্যাগে ২ কেজি খেজুর, বিস্কুট ও চকলেট রাখি। এছাড়াও আদিবাসীদের সঙ্গে তাদের বাসায় খাবার খাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাতে আদিবাসীদের ঘরে থাকা হয়। কিন্তু আমরা কাছে থাকতে ভালো লাগে পাহাড়ী জুম ঘরে। এছাড়ও তাবু করে থাকা হয়। এর সামনে একটি ফায়ার ক্যাম্প করা হয়। ঘুমাতে গিয়ে কোন সমস্যা হয়নি। তবে প্রচ- ঠান্ডা যা শরীর দুর্বল করে ফেলে।’

এ ভ্রমণের খরচ কিভাবে বহন করেছেন? রাহাত বলেন, ‘পরিবার থেকে সব সময় সহযোগিতা করেছে। তাছাড়া বন্ধুদের থেকে নিয়ে ও নিজের পরিশ্রমের উপার্জিত অর্থ দিয়ে এ ভ্রমন।’

এই যে বিপদজনক ভ্রমণ করেন তে পরিবার বাধা দেয়? রাহাত বলেন, ‘পরিবার আমাকে পূর্ণাঙ্গ সাপোর্ট করে। যার জন্য টাকাও দেয়। তবে ফিরে আসার পর মা আমার ভ্রমণের গল্প শুনতে চায়। এটাই আমার করছে ভ্রমণের পর আরো বেশি আনন্দ দেয়। বলতে গেলে ভ্রমণের আনন্দ দ্বিগুন হয়ে যায়।’

১০ পাহাড় তো শেষ পরবর্তী স্বপ্ন কি? রাহাত বলেন, ‘তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ পায়ে হেঁটে ভ্রমণ। একই ভাবে ৬৪ জেলা ভ্রমণ। বিদেশ ভ্রমণ : ভারত, নেপাল ইত্যাদি। তবে এখন স্বপ্ন পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা। এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। খুব শিঘ্রই এর জন্য কলাকৌশল শিখতে ও শরীর গঠন শুরু করবো।’

কেউ যদি পাহাড় ভ্রমণে যেতে চায় তার কি করা উচিত? রাহত বলেন, ‘প্রথমে ছোট ছোট পাহাড় ভ্রমন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। সাঁতার জানতে হবে। পায়ের সমস্যা থাকলে না যাওয়া ভালো। যে দিকে যাবে তার জন্য অবশ্যই লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। যাওয়ার আগেই একজন গাইড নিতে হবে। আর গাইডের সকল কথা মেনে চলতে হবে। সব থেকে বড় হলো মানসিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা।’

পাহাড়ে যাওয়ার আগে কি করতে হবে ? রাহাত বলেন, ‘প্রথমে জায়গা নির্ধারণ করতে হবে যে কোথায় যাবো। পরবর্তীতে সেখানকার পরিস্থিতি, ঝুঁকি , আবহওয়ায়, বন্য পরিবেশ ইত্যাদি খোঁজ নিতে হবে। পরে কিভাবে যাবো এর জন্য পরিকল্পনা ও গাইডের মাধ্যমে তথ্য নিয়ে নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তারপর নির্দেষ্ট তারিখে রওনা দেওয়া।’

ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে কি কি নেওয়া বাধ্যতামূলক? তিনি বলেন, ‘সাধারণ কিছু ওষুধ যেমন ঠান্ডা জ্বরের, গ্যাস্টিকের, স্যালাইন ইত্যাদি। প্রাথমিক চিকিৎসার বক্স, রশি, লাইট, চাকু, তাবু, স্লিপিং ব্যাগ, চায়ের জন্য স্টিলের কাপ বা মগ ইত্যাদি।’

আপনাদের নারায়ণগঞ্জ টুরিস্ট গ্রুপের কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না কেন? তিনি বলেন, ‘যারা একা যেতে পারে না তাদের জন্যই মূলত এ ফেসবুক গ্রুপ খোলা হয়। তবে এখন আমরা সেটা করছি না। কারণ এটা এখন ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। ফলে অনেক মানুষ যায় সেখানে গিয়ে পরিবেশ নষ্ট করে ইত্যাদি কারণে আমরা সেটা বাতিল করেছি। কারণ আমাদের একটা প্রতিপাদ্য বিষয় আছে সেটা হলো ‘ঘুরবেন অবশ্যই কিন্তু প্রকৃতিকে বিরক্ত করবেন না।’ তবে আমরা বড় ভাই, ছোট ভাই কিংবা বন্ধুরা মিলে ভ্রমন করি। ভবিষ্যতে সুন্দর পরিবেশ ধরে রাখতে পারলে আমরা এ বিষয়ে চিন্তা করবো।’

আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? রাহত বলেন,‘নারায়ণগঞ্জে যেসব টুরিস্ট স্পট আছে সেগুলো দেশ ও বিদেশে তুলে ধরার জন্য কাজ করা। এছাড়াও টুরিজম নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা। এটাই শখ থেকে পেশায় পরিনত করতে চাই।’


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও