বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিতে নারায়ণগঞ্জের বেদনা

এস এম শহিদুল্লাহ (লেখক ও গবেষক) || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:৩৮ পিএম, ৪ এপ্রিল ২০২১ রবিবার

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জেল মুক্তির পর মিছিলে আতাউর রহমান খান ও আলমাস আলীর (ডানে) সাথে বঙ্গবন্ধু, ১৯৬২ খ্রি.।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জেল মুক্তির পর মিছিলে আতাউর রহমান খান ও আলমাস আলীর (ডানে) সাথে বঙ্গবন্ধু, ১৯৬২ খ্রি.।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৩ সালের দিকে কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের প্রথম জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। তখন তাঁকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। সে যাত্রা তিনি অতিক্রম করেন নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। সে কথা তিনি তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে’ উল্লেখ করেছেন। সেখান থেকে উদ্ধৃত করা হলো:

১৯৫৩ সালের প্রথম দিক থেকে রাজনৈতিক ও ছাত্রকর্মীরা মুক্তি পেতে শুরু করল।...এই সুযোগ আমি ও আমার সহযোগীরা পুরাপুরি গ্রহণ করলাম এবং দেশের প্রায় শতকরা সত্তরটা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হলাম। যুবক কর্মীরা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ল। কারণ আমিও তখন যুবক ছিলাম। ভাসানী সাহেব ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা অনেকেই মুক্তি পেলেন। আমি মওলানা ভাসানী সাহেব ও আতাউর রহমান খানের সাথে কাউন্সিল সভা সম্পর্কে পরামর্শ করলাম। কাউন্সিল সভা তাড়াতাড়ি করা প্রয়োজন একথা তারাও স্বীকার করলেন। প্রথম কাউন্সিল সভা ডাকা হল ঢাকায়। হল পাওয়া খুবই কষ্টকর। ইয়ার মোহাম্মদ খানের সাহায্যে মুকুল সিনেমা হল পেতে কষ্ট হল না। কাউন্সিল সদস্যদের থাকার জন্য কোন জায়গা না পেয়ে বড় বড় নৌকা ভাড়া করলাম সদরঘাটে। ঠিক হল সোহরাওয়ার্দী সাহেব কাউন্সিলে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিাত থাকবেন।

কাউন্সিল অধিবেশন যতই ঘনিয়ে আসছিল আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রবীণ নেতা এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন, যাতে আমাকে জেনারেল সেক্রেটারি না করা হয়। আমি এ সম্বন্ধে খোঁজখবর রাখতাম না, কারণ প্রতিষ্ঠানের কাজ, টাকা যোগাড়, কাউন্সিলারদের থাকার বন্দোবস্তসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হত। আবদুস সালাম খান, ময়মনসিংহের হাসিমউদ্দিন আহমদ, রংপুরের খয়রাত হোসেন, নারায়ণগঞ্জের আলমাস আলী ও আবদুল আউয়াল এবং আরও কয়েকজন এই ষড়যন্ত্রের নায়ক ছিলেন। প্রতিষ্ঠানের জন্য টাকা পয়সা এরা দিতেন না, বা জোগাড় করতেন না। প্রতিষ্ঠানের কাজও ভালভাবে করতেন না। তবে আমি যাতে জেনারেল সেক্রেটারি না হতে পারি তার জন্য অর্থ ব্যয়ও করতেন। সালাম সাহেবের অসন্তুষ্ট হবার প্রধান কারণ ছিল আমি না কি তাঁকে ইম্পর্টেন্স না দিয়ে আতাউর রহমান খান সাহেবকে দেই। আমি এ সমস্ত পছন্দ করতাম না, তাই আতাউর রহমান সাহেবকে কাউন্সিল সভার প্রায় পনের দিন পূর্বে একাকী বললাম, “আপনি জেনারেল সেক্রেটারি হতে রাজি হন; আমার পদের দরকার নাই। কাজ তো আমি করছি এবং করব, আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।” আতাউর রহমান সাহেব বললেন, “আমি এত সময় কোথায় পাব? সকল কিছু ছেড়ে দিয়ে কাজ করার উপায় আমার নাই। এখন যে জেনারেল সেক্রেটারি হবে তাকে সর্বক্ষণের জন্য পার্টির কাজ করতে হবে। আপনি ছাড়া কেউ এ কাজ পারবে না, আপনাকেই হতে হবে।” আমি বললাম, “কয়েকজন নেতা তলে তলে ষড়যন্ত্র করছে। তারা বলে বেড়ান একজন বয়েসী লোকের জেনারেল সেক্রেটারি হওয়া দরকার। দুঃখের বিষয় এই ভদ্রলোকদের এতটুকু কৃতজ্ঞতা বোধ নাই যে, আমি জেল থেকে বের হয়ে রাতদিন পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠানের একটা রূপ দিয়েছি।” আতাউর রহমান সাহেব বললেন, “ছেড়ে দেন ওদের কথা, কাজ করবে না শুধু বড় বড় কথা বলতে পারে সভায় এসে।” আমি বললাম, “চিন্তা করে দেখেন; একবার যদি আমি ঘোষণা করে দেই যে, আমি প্রার্থী তখন কিন্তু আর কারও কথা শুনব না।” তিনি বললেন, “আপনাকেই হতে হবে।” আতাউর রহমান সাহেব জানতেন, তাঁর জন্যই সালাম সাহেব আমার উপর ক্ষেপে গেছেন। মওলানা সাহেব আমাকে জেনারেল সেক্রেটারি করার পক্ষপাতী।...

কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশন হওয়ার পরে মওলানা ভাষানী ঘোষণা করলেন, আমাদের চারজনের নামÑসর্বজনাব আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, আবুল মনসুর আহমদ ও আমি।...আলোচনা সভা বেশি সময় চলল না, কারণ অন্য কোনো নাম তাঁরা প্রস্তাব করতে পারলেন না। আমি কাউন্সিল সভায় উপস্থিাত হয়ে জানিয়ে দিলাম, নির্বাচন হবে। একমত হতে পারা গেল না। আতাউর রহমান সাহেব আমাকে সমর্থন করলেন। আমরা মেনুফেস্টো ও গঠনতন্ত্র নিয়ে সমস্ত রাত আলোচনা করলাম সাবজেক্ট কমিটিতে। কাউন্সিল সভায় মেনুফেস্টো ও গঠনতন্ত্র গ্রহণ করা হল এবং নির্বাচনও সর্বসম্মতিক্রমে হয়ে গেল। মওলানা ভাসানী সভাপতি, আতাউর রহমান সাহেব সহ-সভাপতি, আমি সাধারণ সম্পাদক।...

উপরোল্লিখিত বর্ণনামতে যদিও শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগের প্রথম জেনারেল সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত হতে নারায়ণগঞ্জের আলমাস আলী ও আবদুল আউয়াল বাধার সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু এখানে একটি বিষয় প্রণিদানযোগ্য যে, সে সময় নারায়ণগঞ্জের নেতৃবৃন্দ আওয়ামী লীগের কেন্দ্র পরিচালনার নিয়ামক শক্তি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর এখন?

উপরোল্লিখিত বর্ণনামতে যদিও শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগের প্রথম জেনারেল সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত হতে নারায়ণগঞ্জের আলমাস আলী ও আবদুল আউয়াল বাধার সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু এখানে একটি বিষয় প্রণিদানযোগ্য যে, সে সময় নারায়ণগঞ্জের নেতৃবৃন্দ আওয়ামী লীগের কেন্দ্র পরিচালনার নিয়ামক শক্তি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর এখন? (‘নারায়ণগঞ্জের স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু গ্রন্থ’ থেকে সংকলিত)।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও