শহীদুলদের অপেক্ষা ফুরায় না

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:১২ পিএম, ২০ এপ্রিল ২০২১ মঙ্গলবার

শহীদুলদের অপেক্ষা ফুরায় না

‘‘কাক ডাকা ভোরে বেরিয়েছেন রিকশা চালক মো. শহিদুল ইসলাম। দুপুর তিনটা পর্যন্ত তিনি কামিয়েছেন মাত্র ১৮৫ টাকা। এর মধ্যে জমা দিতে হবে ১২০ টাকা। প্রায় দুই ঘন্টা ধরে চাষাঢ়ায় ওত পেতে বসে আছেন যাত্রীর জন্য। লকডাউনের স্থবিরতার কারণে কোনো যাত্রী আসে না। তাঁর অপেক্ষা শেষ হয় না। রিকশার চাকাও ঘুরে না। তাঁর ভাগ্যও বদলায় না।’’

২০ এপ্রিল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়ায় শহিদুল ইসলাম ছাড়াও কথা হয় মো. হৃদয়, মাসুদ, শফিক, রেজাউল, হাসান, কমলের সঙ্গে। চাষাঢ়ায় নাম না জানা আরও অসংখ্য রিকশা চালক ছিলেন। এদের সবার গল্পই এক। ক্লান্ত শরীর নিয়ে সবাই অপেক্ষা করছিলেন কখন যাত্রী আসবে, রিকশার চাকা ঘুরবে, তাঁদের ভাগ্যের চাকাও ঘুরবে। সামনে দিয়ে যে-ই হেঁটে যাচ্ছিলেন। তাঁকেই জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘কোথায় যাবেন?’ অধিকাংশ পথচারী শহিদুল ইসলামদের চোখের দিকেই তাকাচ্ছিলেন না। হয়তো শহিদুল ইসলাম, মো. হৃদয়, মাসুদ, শফিক, রেজউল, হাসান, কমলদের চোখের দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছিল না তাঁদের।

গত ১৪ এপ্রিল থেকে নারায়ণগঞ্জসহ দেশব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউনে মার্কেট বিপনী বিতানসহ অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে গণপরিবহন চলাচলের উপরেও। যে কারণে শহরে মানুষের চলাচল সীমিত। লকডাউনে কর্মব্যস্ত শহরটি থমকে গেছে। থমকে গেছে শহিদুল ইসলামের মতো দিনানিপাত মানুষগুলোর ভাগ্যও। না রিকশার চাঁকা ঘুরে, না তাঁদের ভাগ্যের চাঁকা। রোজার মধ্যে পরিবারের জন্য ভালোমন্দ খাবার জোগাড় করা তো দুরের কথা মন্দটুকু জোগাড় করতেই দিশেহারা হচ্ছেন শহিদুলেরা।

শহিদুল ইসলাম, মো. হৃদয়, মাসুদ, শফিকদের চোখে যে অসহায়ত্ব, যে আকুতি, এক বেলার আহারের জন্য যে দিশেহারা দশা, সেই দশা হয়তো পথচারীরাও সহ্য করতে না পারার ভয় পাচ্ছিলেন। যে কারণে নিচের দিকে তাকিয়েই অনেকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, অনেকে কোনো কথাই বলছেন না। কোনো একজন যখন শহিদুলদের দিকে ফিরে তাকান, এগিয়ে আসেন। তখন এক বেলার আহারের নিশ্চয়তার দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় তাঁদের চোখে মুখে অন্যরকম একটি রূপ চলে আসে। যাত্রী রিকশায় চড়ার পর সেই রূপ আনন্দে পাল্টে যায়, এক বেলার আহার নিশ্চিৎ হওয়ার আনন্দ তাঁদের চোখে চিকচিক করে।

শহিদুল ইসলাম নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘বাবারে দুপুরের আজানের সময় চাষাঢ়ায় আইছি। এখনও বইসা আছি। কোনো খ্যাপ নাই। কি করুম, কি খামু নানান চিন্তা ভাবনা। সরকারকি এই অবস্থা দেখে না? দুই ঘন্টা ধইরা চাষাঢ়ায় ঘুরতাছি একটা খ্যাপ পাই না।’

তিনি বলেন, ‘সরকার তো কত কিছুই দেয় কিন্তু আমরা কিছুই পাই না। ঘরে বইরা খাওনের মতো টাকাও নাই। আমরা কাম কাইজ চাই। আমরা খাইট্টা খাইতে টাই, মাথার ঘাম পায়ে ফালাইয়া খাইতে চাই।’

নারায়ণগঞ্জে এত করোনার ভয়াবহতা আবার লকডাউনের মধ্যেই বের হয়েছেন ভয় করে না? এমন প্রশ্নে রেজাউল বলেন, ‘করোনা ধরতেও পারে আবার নাও ধরতে পারে। যদি ধরে তাইলে মইরা যামু। কিন্তু পেটে খাওন না পড়লে তো এমনেই মইরা যামু। আপনেই বলেন কোনডা ভালা?’

তিনি আরও বলেন, ‘লকডাউন দিছে কিন্তু কিস্তি তো বন্ধ করে নাই। আমরা গরিব মানুষ। কিস্তি নিয়া খাইছি এখন দেওয়াই তো লাগবো। সরকার যা করে আমার জন্য তো ভালো না। গরিব মানুষের জন্য তো সম্ভব না। ধনী মানুষের টাকা আছে বাসায় বইসা খাইতে পারে। আমরা তো পারি না।

চাষাঢ়ায় কয়েকটি দোকানের সামনে বাহারি সব ইফতার আইটেম সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু শহিদুল, রেজাউলদের নজর একবারও সেই দিকে যায় না। ইফতারের জন্য কোন আইটেম কিনবেন সেই ধন্দেও পড়তে হয় না তাঁদের। কারণ রিকশার জমা দেওয়ার পর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে দিন চলবে কি না সেই হিসাব কষতেই ইফতারের সময় চলে যায়।

হাসান মিয়া নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘বাসায় মাইয়া আছে। ইফতারির জন্য অপেক্ষা করে। আমি থাকলে তো বেশি লাগবো। তাই রোজার শুরু থেইকাই বাসায় ইফতার করি না। অল্প কিছু কিইন্না দিয়ে বাইর হইয়া আসি। ওইটা দিয়া বউ আর মাইয়াটা ইফতার করে।’

একথা বলার সময় চোখের পানি আটকে রাখতে পারছিলেন না তিনি। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছিলেন আর গামছা দিয়ে চোখ মুছছিলেন হাসান মিয়া। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক তাকিয়ে আবারও বলা শুরু করলেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘মাইয়াডা প্রতিদিন কয় বাসায় থাকতে। আমারও ইচ্ছা হয় মাইয়ারে নিয়া ইফতার করি। কিন্তু সাহস করতে পারি না। যেই সময় মাইয়ার সাথে ইফতার করুম। সেই সময়ে যদি আরও কিছু ভাড়া মারতে পারি তাইলে মাইয়াডা ভালো কিছু দিয়া ভাত খাইতে পারবো এই আশায় আর বাসায় যাই না।’

চলমান লকডাউন আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই খবর পৌঁছে গেছে রিকশা চালকদের কাছেও। এতদিন টানাটানি করে চলছিলেন। প্রতিদিনের টাকায় না চলছে জমানো সঞ্চয় দিয়ে চলে যেতেন। কিন্তু এই অবস্থা চলতে থাকলে সামনের দিনগুলো কিভাবে কাটাবেন সেই চিন্তাও ভর করেছে তাঁদের।

মো হৃদয় নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘করোনারে আমরাও ডরাই। আমাগোও বউ বাচ্চা আছে। আমরাও ঘরে থাকতে চাই। কিন্তু লকডাউন খালি বাড়ে আর আমাগো কামাই কমে। আমাগো দিকে কেউ তাকায় না। কারও সময়ই নাই। আমরা কেমনে চলতাছি, সামনে কেমনে চলুম এইটা যদি কেউ ভাবতো তাইলে আমরাও করোনার মইধ্যে বাইর হইতাম না।’

শহিদুল ইসলাম, মো. হৃদয়, মাসুদ, শফিক, রেজউল, হাসান, কমলেরা প্রতিদিন নিজের, পরিবারের মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে এক বেলার আহারের জন্য বাইরে বের হয়। করোনার ভয় তাঁদের ক্ষুধার যন্ত্রণার কাছে ফিকে হয়ে যায়। যাত্রী না থাকলেও আশা ফুরায় না। কপালের উপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তাঁদের কাছে। আর এভাবেই অনিশ্চয়তয় দিন কাটছে শহিদুল ইসলাম, রেজাউলের মত শত শত রিকশা চালকদের।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও