রিকশা চালক নুরুল ইসলামের মানবেতর দিনযাপন

রূপগঞ্জ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৯ পিএম, ১ মে ২০২১ শনিবার

রিকশা চালক নুরুল ইসলামের মানবেতর দিনযাপন

নুরুল ইসলাম পেশায় এখন রিক্সা চালক। তবে গুন তাঁর বহু। পারেন ছবি আঁকতে। যে কারো মুখের অবয়ব হুবহু। ছবি দেখে ছবিও আঁকতে পারেন। সুরেলা কন্ঠে গানও গাইতে পারেন। মঞ্চে গানও করেন। শৈশবে ছিলেন তাঁতী। হাতে বোনা তাঁত কারিগর ছিলেন। সেখান থেকেই ঘরোয়াভাবে গানের অনুশীলন। শুধু তাই নয়, ছিলেন রেডিও ও টিভি মেকার। ঘড়িও মেরামত করতেন। কালের বিবর্তে আধুনিকতার কাছে তার সেইসব প্রতিভা খাপ খাওয়াতে না পেরে শুধু ছবি আঁকা আর রিক্সা চালিয়ে জীবন সংসার চালাচ্ছেন তিনি। তবে করোনা মহামারীর থাবায় সব আয় কমে গিয়ে মানবেতর জীবন যাপন তার। বলছি, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভোলাবো ইউনিয়নের বাসুন্দা গ্রামের দরিদ্র রিক্সা চালকের কথা।

নাম তার নুরুল ইসলাম। বয়স ৫০ পেরিয়ে। দরিদ্র ঘরের সন্তান হওয়ায় বেশি লেখাপড়া না করতে পারলেও বহু প্রতিভার অধিকারী তিনি। মাত্র ৬ষ্ট শ্রেণি পর্যন্ত লেখা পড়া তার। জীবিকার তাগিদে শিশুকালেই হাতে বোনা তাঁত চালাতেন। লুঙ্গি, গামছা, মশারী তৈরী করে সপ্তাহের একদিন গোলাকান্দাইল হাটে বিক্রি করতেন। মাঝে মাঝে বাবুর হাট, গাউছিয়ায় পাইকারী দিতেন। এভাবেই শৈশব পার করেছেন কাজের মধ্যেই অভাব গোছাতে।

সে সময় তাঁত চালানোর কারিগরদের মুখে তাঁতের তালে তালে করা গান শুনতেন। পরে সেই গানগুলো নিজেই গাইতে গাইতে তাঁত চালাতেন। বর্তমানে তিনি মঞ্চের গায়ক। পাড়া মহল্লার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে বাউল গান, আধৃুনিক গান পরিবেশন করেন তিনি। মুগ্ধ হয়ে দর্শক তাকে পুরস্কৃতও করেন। করোনাকালে অনুষ্ঠান কমে যাওয়া নেই তার সেই গানের আসরও।

আবার সেই তাঁতের কাজের ফাঁকে বাজারের রেডিও, টিভি মেকারদের দোকানে দাড়িয়ে থাকতেন। দেখতেন মেকাররা কি কিভাবে কি ধরনের রেডিও মেরামত করে। সাদাকালো যুগের টিভি, ঘড়িও মেরামত করা দেখতে দেখতে শিখে ফেলেন তা। এক সময় তাঁতের কাজ ফেলে বাড়ির পাশেই আতলাপুর বাজারে রেডিও ও টিভি মেকারের দোকান দিয়ে বসেন। মেকারী কাজ করতে করতে দক্ষতা চলে আসে তার। ভালোই আয় করছিলেন। কালের বিবর্তে যখণ রঙ্গীন, এর পর এলইডি টিভি চলে আসে। হেরে যান তিনি। কারন, ওইসব কাজের অভিজ্ঞতা নাই তার। আবার হাতে হাতে মোবাইল চলে আসায় পুরাতন মডেলের কাটা ঘড়ির কদরও কমতে থাকে। ফলে মেকারী কাজ ছেড়ে দিয়ে রিক্সা চালাতে শুরু করেন।

এরইমাঝে বিয়ে করে সংসারী হন তিনি। ৩ মেয়ে ১ ছেলের জনকও তিনি। বয়সভারে রিক্সা চালানো শরীরে আয় মানাচ্ছিলো না। অবসরে রপ্ত করেন ছবি আঁকার কাজ। প্রথমে নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের ছবি আঁকেন। তা গ্রামবাসিকে দেখালে প্রকাশ পায় তার শৈল্পিক কাজের। যে কাউকে সামনে রেখে হুবহু তার ছবি আঁকায় রয়েছে অসাধারন প্রতিভা। আর ছবি দেখে হুহহু ছবিকে নকল করতে পারেন তিনি। এভাবে জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচন এলে প্রার্থীদের মুখের অবয়ব হুবহু এঁেক দিয়ে শুরু হয় আয়। পরিচিতি বেড়ে যাওয়া গত ৬ বছর ধরে এ কাজে তিনি ভালো অর্ডারও পাচ্ছেন। তবে সারা বছর তো আর নির্বাচন থাকে না। তাই বাকিটা সময় রিক্সা চালিয়েই সংসার চালান তিনি।

এদিকে বয়স ভারের কারনে কিংবা আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রিক্সায় বেটারী লাগিয়ে অটো হলে তার চলতো। কিন্তু টাকার অভাবে বেটারী কিনতে না পারলেও নিজের পূর্ব মেকারী অভিজ্ঞতায় পুরাতন বেটারীতে বিশেষ কায়দায় নিজে নিজেই তৈরী করেন একটি রিক্সা। এরমাঝে গত বছর থেকে করোনা মহামারী চলে আসায় নানা বিধি নিষেধে রিক্সা চালাতেও পড়েন বাঁধার মুখে। ফলে আয় যা হয় তাতে সংসার চলে কোনমতে।

কথা হয় এই গুণি বহুপ্রতিভাধারী ব্যক্তি নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, কাজ দেখতে দেখতে শিখেছি। কেউ আমাকে শেখায়নি। তবে দরিদ্রতা দূর করতে পারিনি। কারন, সারা বছর ছবি আঁকার কাজ থাকে না। তাঁতকাজ জানতাম হাতে বোনার। তা শেষ হলো । এখন পাওয়ার লোম চলে। মেকারী জানলাম। তাও আধুনিকতার কাছে হেরে গেলাম। কারন প্রশিক্ষন নাই। এখন রিক্সা চালাই তাতেও অটো পদ্ধতি। আর এতে টাকা লাগে বহু। ঋণ করার অভ্যাস নাই। হাত পাততেও পারি না। সংসারের অভাব অনটন মেটাতে যেয়ে ভালো ঘরও করতে পারিনি। নিজের সন্তানদের লেখা পড়া করাতে পারিনি।নিজেও শৈশবে পিতার অভাবের কারনে কাজে নেমে গিয়েছিলাম। তাছাড়া বৃদ্ধও হয়নি যে সরকার আমাকে বয়স্ক ভাতা দিবে। সব মিলিয়ে আমি অসহায়। কাজের স্বীকৃতি পেলে হয়তো বাকি জীবনটা ভালো চলতো।
কাঞ্চন পৌর বাজারের ব্যবসায়ী সোহেল মাহমুদ বলেন, নুরুল ইসলামকে দেখি প্রতিদিন রিক্সা নিয়ে কাঞ্চন বাজারে যাত্রী নিয়ে আসেন। মাঝে মাঝে রিক্সা চালকদের নিয়ে গানের আসর বসান । তার কন্ঠ এতোই মধূর যে, সুযোগ পেলে ভালো কিছু করতে পারতেন। পরে জানলাম,তিনি মঞ্চেও গান করেন। জনপ্রতিনিধিদের ছবিগুলোও তাঁর আঁকা। লোকটির প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো। সরকারের উচিত এমন গুনিদের জন্য স্থায়ী কিছু করার।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ নুসরাত জাহান বলেন,লোকটির বহুমাত্রিক প্রতিভার কথা জানলাম। স্থানীয় পর্যায় এ ধরনের মানুষগুলো উপজেলা প্রশাসনে যোগাযোগ করলে তাদের পাশে দাড়াবো। সরকার ইতোমধ্যে করোনাকালীন ত্রাণ ও ঈদ উপহারও দিচ্ছেন। সমাজসেবার কার্যালয় থেকেও তাদের জন্য সাহায্য সহযোগীতার ব্যবস্থা রয়েছে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও