‘টানবাজারে শবমেহেরের ফাঁদ’

ইমতিয়াজ আহমেদ , স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৫৩ পিএম, ৬ জুন ২০২১ রবিবার

‘টানবাজারে শবমেহেরের ফাঁদ’

১৯৮৫ সালের কথা। সে দিন ইত্তেফাক অফিসে গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা হাবিবুর রহমান বাদল। তিনি অফিসে বসেছিলেন। এমন সময় শবমেহের নামে নারায়ণগঞ্জের এক আহত কিশোরীর ছবি তুলে আনেন ফটোসাংবাদিক রশীদ তালুকদার। কিশোরীটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আছে। অবস্থা ভাল নয়। শুনেই অফিসের বেবিট্যাক্সী নিয়ে হাবিবুর রহমান বাদল ছুটে যান ঢামেক হাসপাতালে। সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে হাবিবুর রহমান বাদল বলেন, ‘মেডিক্যালে গিয়ে শবমেহেরকে খুঁজে বের করলাম। আমি তার সাথে কথা বলি। শবমেহের আমাকে বলে, সে নরসিংদীতে মঈন খানের (বিএনপি নেতা থেকে পরে মন্ত্রী হয়েছিলেন) বাসায় কাজ করতো। সেই বাসা থেকে কে বা কারা তাকে ভালো কাজ দেয়ার কথা বলে ফুসলিয়ে নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে এনে বিক্রি করে দেয়। শবমেহের যৌনকাজে রাজি না হওয়ায় তার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। মৃত ভেবে টানবাজারের লোকজন শবমেহেরকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে একটি বগিতে ফেলে রাখে। ট্রেনটি কমলাপুর গেলে সেখানে পুলিশ শবমেহেরকে উদ্ধার করে মেডিক্যালে পাঠায়। আমি ২/৩ স্লিপ রিপোর্ট লিখলাম। পরদিন ইত্তেফাক এর প্রথম পাতায় সিঙ্গেল কলামে বক্স করে রিপোটটি ছাপা হয়। শিরোনাম ছিল ‘শবমেহেরের কান্না’। সারাদেশে হৈ চৈ পড়ে যায়। পরদিন বোসকেবিনে সকালে নাস্তা সেরে থানায় গেলাম। হারাধন দারোগাকে বললাম, ঘটনা জানেন। ততক্ষণে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় ওয়্যারলেস ম্যাসেজ এসেছে। উপর থেকে শবমেহের এর ডেথ স্টেটমেন্ট (মৃত্যুর আগে জবানবন্দি) নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। টানবাজার ফাঁড়ির টিআসআই রইসউদ্দিনকে নিয়ে আমি পতিতাপল্লীর ভেতরে যাই। দ্বিতীয় দিন ইত্তেফাকে আমার রিপোর্ট ছাপা হল ‘টানবাজারে শবমেহের এর ফাঁদ।’ তৃতীয় দিন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় টানবাজার থেকে ১৩৮ জন কিশোরী উদ্ধার করেছিল।’

নারায়ণগঞ্জের একজন সাহসী ও আপাদমস্তক পেশাদার সাংবাদিক হাবিবুর রহমান বাদল। নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রথম প্রকাশিত দৈনিক শীতলক্ষা’র সম্পাদকও তিনি। কিভাবে দৈনিক শীতলক্ষা প্রকাশ করেছেন সে প্রসঙ্গে বাদলের ভাষ্য, ‘৯৬ সালের কথা। বিখ্যাত লেখক আব্দুল গাফফার চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাব এর সভাপতি হাসান শাহরিয়ার এবং বিএফইউজে এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাজী জহিরুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে আমরা সংবর্ধনা দিলাম। নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে খাওয়া-দাওয়ার পর জনাব গাফফার চৌধুরী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বাদল নারায়ণগঞ্জ থেকে কয়টা দৈনিক পত্রিকা বের হয়। আমার উত্তর, একটাও না। আমি বললাম, নারায়ণগঞ্জে বিত্ত আছে, চিত্ত নাই। ছাপাখানা নাই। তাছাড়া ঢাকার কাগজ আগে চলে আসে। তিনি (আগাচৌ:) লন্ডনে গিয়েও আমাকে ২/৩ বার ফোন করেছেন। গাফফার চৌধুরীর কথায় আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম। ভাবলাম দেখিনা কি হয়। ৯৬ সালেই দৈনিক শীতলক্ষা’র ডিক্লারেশন পেলাম। সম্ভবত মে/জুন মাসের দিকে। আমি তখন প্রকাশক কি বুঝতাম না। কাদেরীকে (আবু সাঈদ কাদেরী) সাংবাদিক বানালাম। অনেকেই আমার সাথে কাজ করেছেন। একদিন পত্রিকা অফিসে গিয়ে দেখি পত্রিকার গাট্টি। খুলে দেখলাম একই দিনে দুই ধরনের পত্রিকা ছাপা হয়েছে। রাজনৈতিক নিপীড়ণে শহরের অমুক নেতা বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থী। সে সময়টায় অনেকেই পত্রিকার সংবাদের কাটিং নিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ে বিদেশ যেত। এ নিয়ে প্রকাশকের সাথে আমার মনোমালিন্য হয়েছিল। যাইহোক ২০০২ সালে দৈনিক ডান্ডিাবার্তা’র ডিক্লারেশন নেই। এখানে নাফিজ আশরাফ, প্লাবন রাজু ও রাজু আহমেদ কাজ করেছে।’

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব এর ২ বারের সভাপতি ও ২ বারের সেক্রেটারী বাদল বর্তমান সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে বলেন, ‘স্বচ্ছল হওয়ার প্রতিযোগীতা থেকে সরে আসতে হবে। তবেই সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য ফিরে আসবে। সাংবাদিকদের মধ্যে সেক্রিফাইস থাকতে হবে। সেক্রিফাইসের মনোভাব না থাকলে সমাজ ভেঙ্গে যাবে। সমাজে ধ্বস নামবে। আজকে অনেক পেশাদার সাংবাদিক প্রেসক্লাব এর বাইরে আছে। সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাদারিত্বের ঐক্য গড়ে উঠলে বর্তমান অবক্ষয় দূর হবে। সে সময় বাকি নেই। কেননা, বর্তমান পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্খা কম। আমার সাংবাদিকতা জীবনে সত্যের পথে চলেছি। বিপদ এসেছে মহান আল্লাহপাকের অশেষ রহমতে তা কাটিয়েও উঠেছি। বিএনপি আমলে ২০০১ সালে ২৬টি মামলা খেয়েছি। এগুলোর মধ্যে ধর্ষণ মামলাও ছিল। বিএনপি’র সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের চক্রান্তে অনেকগুলো মামলা হয়েছে। এইতো আওয়ামীলীগের সময়েও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ কয়েকটি মামলা হয়েছে। শ্রমিক নেতা পলাশ, মীর সোহেল আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। জীবনে কয়েকবারই আমার উপর হামলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় হামলা হয়েছে ৯৫ সালে। সেবার গুলি ও বোমা হামলা হয়েছিল আমার উপর। সেই ঘটনায় আমার পেশার লোকেরাই আমার বিরোধীতা করেছিলেন। এখন সে সব নাম বলতে চাই না। সবকিছু ভুলে যেতে চাই। যে পেশায় এসেছি পদে পদে ঝুঁকিতো থাকবেই।’

ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির অভ্যাস ছিল। তাঁর সমসাময়িক অনেকেই কবিতা লিখতেন। ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হাবিবুর রহমান বাদল লিখতেন গদ্য। কখনো ছোট গল্প। কখনো প্রবন্ধ টাইপ কিছু। কখনো পত্রিকার পাতায় সম্পাদক সমীপে চিঠিপত্রের আদলে প্রতিবেদন। দৈনিক ইত্তেফাকেও তাঁর চিঠিপত্র ছাপা হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল (বর্তমানে জেনারেল হাসপাতাল) নিয়ে বিরাট চিঠি ছাপা হয়েছিল ইত্তেফাকে। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ঢাকা কলেজ এর সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। মেট্রিক পাস করার পরপরই পত্রিকায় লিখতেন। জিয়ার আমলে দৈনিক দেশবাংলা’য় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতেন। কলেজ ছাত্র বিধায় দৈনিক পেমেন্ট নগদ ৫ টাকা ও ৩টা পরোটা। সাপ্তাহিক জয়যাত্রা পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। জিয়ার মৃত্যুর পর সাপ্তাহিক জয়যাত্রা পত্রিকায় কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন।

সে প্রসঙ্গে হাবিবুর রহমান বাদল বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি একটি স্টেটমেন্ট দেয়। ইত্তেফাক সিঙ্গেল কলামে ছাপে। সাপ্তাহিক জয়যাত্রা’র অফিস তখন মগবাজার। আমার আপত্তি থাকার পরও সম্পাদক জয়যাত্রা’য় স্টেটমেন্ট ছাপেন। পরদিন রমনা থানার ওসি হাজির। আমাকে বললেন, কি করেছেন? আমি বললাম, আমি না করেছি। এরপর আর্মি অফিসেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে সময় মেজর জাহিদ (বর্তমানে পীর) এরশাদের চীফ সিকিউরিটি অফিসার। নবম পদাতিক ডিভিশন এর জিওসি মীর শওকত আলীর সাথে আমার ভগ্নিপতি’র সম্পর্ক ছিল। ২ দিন পর মীর শওকত আলী আমাকে বললেন, এসব কি লেখেন। বের হয়ে দেখলাম মেজর জাহিদ। সে নিয়ে গেল আর্মি অফিসার্স ক্লাবে। সেখানেই থাকতাম। এ সময়কালে এরশাদ ও মঞ্জুর মধ্যে সমঝোতা হয়। মেজর জাহিদ একদিন জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সাথে ইত্তেফাকে সাংবাদিকতা বিষয়ে বলেন। আমার বন্ধু আছে সে ইত্তেফাকে কাজ করতে চায়। ঢাকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যো দিলাম। সম্মানী ২৫০০ টাকা। একবছর ইত্তেফাকে ঢাকায় কাজ করেছি। সর্বপ্রথম কভার করি লঞ্চ দূর্ঘটনা। ঢাকায় কাজ করার সময় দুপুরে খেতাম না। একটা পেয়ারা বা অন্যকিছু খেতাম। অফিসিয়াল একটা ঝামেলায় নারায়ণগঞ্জে চলে এলাম।’

হাবিবুর রহমান বাদল বিশেষভাবে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আসার পর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পেলাম সংবাদ এর বংশী সাহা’কে। আরো ছিলেন, শংকর কুমার দে, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, তমিজউদ্দিন আহমেদ। ততদিনে কাসেম ভাই, (আবুল কাসেম হুমায়ুন) নুর মোহাম্মদ ভাই ও আজিজ ভাই (আজিজুল হক) ঢাকায় স্টাফ রিপোর্টার হয়ে ঢাকা অফিসে বসেন। ৮০ এর দশকে স্থানীয় সাংবাদিকদের চীফ গেস্টের মত সম্মান দেয়া হত। প্রেসক্লাব পলিটিক্স ছিল। তবে তা কল্যাণের স্বার্থে। জিয়াউর রহমানের সময় টাউন ডেভলপমেন্ট ফান্ড থেকে ১ লাখ টাকা পাই। ৯২ সালে ১ লাখ টাকা পাই জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে। একতলা ভবন ভেঙ্গে ফেলি। ডিসি হাবিবুর রহমান সাহেব ও এসপি মুজিবুর রহমান অনেক ফান্ড দিয়েছেন। ৯২ সালে বেগম খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জে আসেন। নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ৫ লাখ টাকা দেন। সাংবাদিক ফজলুর রহমান (সদ্য প্রয়াত), হাফিজুর রহমান মিন্টুসহ অনেকেই মাথায় ইট পর্যন্ত বহন করেছেন। প্রেসক্লাব ভবন ৭ তলা ফাউন্ডেশন দেয়া হয়েছে। তবে ১০ তলা করা যাবে।’

হাবিবুর রহমান বাদল শহরের ১৭৯/৪ পশ্চিম দেওভোগ আলী আহাম্মদ চুনকা সড়ক এলাকার মরহুম ফকির চাঁন মিয়া ও মরহুমা সাহারা খাতুন এর ছেলে। তিনি গলাচিপা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। ছাত্রছাত্রী সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। বাদল বলেন, ‘৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পর প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলাম। ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষের দিকে ১২ দিন জেল খেটেছি জিয়ার স্বাস্থ্য উপদেস্টাকে কলেজে ঢুকতে দেইনি বলে। সাংবাদিকতা জীবনে অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনার রিপোর্ট করেছি। ২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাড়া আওয়ামীলীগ অফিসে বোমা হামলার ঘটনা মনে হলে গা শিউরে উঠে। তখন প্রেসক্লাব এর সভাপতি। সে দিন সাইদুল হাসান বাপ্পি নিতাইগঞ্জের লোড-আনলোড সমস্যা নিয়ে প্রেসক্লাবে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। রাত সাড়ে ৮টা কি পৌণে ৯টা হবে। বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। আমি প্রান্তিক পেট্রোল পাম্পে গেলাম। প্রান্তিকের মালিক জামান বললো, গাড়ির চাকা ব্লাস্ট হতে পারে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। আওয়ামীলীগ অফিসের কাছাকাছি যেতেই মানুষের গোঙ্গানীর শব্দ কানে এল। দেখলাম কিছু লোক কাতরাচ্ছে। বেইলি টাওয়ারের কাছাকাছি যেতেই দেখি নাসিম ভাই (নাসিম ওসমান) সেন্ডো গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরে হাঁটছিলেন। খানপুর হাসপাতালে গেলাম। রক্তের জন্য অনেকে মারা গেছে। বাপ্পি, মশু ও বাচ্চু মারা গেছে। অফিসে ফোন করে খবর দিলাম। বার্তা সম্পাদক বললেন, ‘মোবাইলে যা পাইবা দিয়া দিবা। তোমার নিউজ লেখার দরকার নাই।’ বোমা হামলার ঘটনায় ইত্তেফাকের ১৪টি সংস্করণ বেরিয়ে ছিল। প্রথম খবরটি সিঙ্গেল কলামে বক্স হয়। এরপর আপডেট চলতে থাকে রাতভর। তাপসও সেদিন অনেক কষ্ট করে ছবি নিয়ে ঢাকা গেছে। ’


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও