মুকুটহীন সম্রাট

ইমতিয়াজ আহমেদ , স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:১৮ পিএম, ১০ জুন ২০২১ বৃহস্পতিবার

মুকুটহীন সম্রাট

নব্বই দশকের শেষের কথা। নারী ও শিশুপাচার বিষয়ে রিপোর্ট লিখে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন প্রতিবাদি সাংবাদিক আবু সাউদ মাসুদ। বাংলাদেশের প্রথম ট্যাবলয়েড দৈনিক পত্রিকা ‘মানবজমিন’ এ শহীদনগরের নারী ও শিশুপাচারের উপর অনুসন্ধানী রিপোর্ট লিখে মাসুদ ‘ড. কুদরত ই খুদা স্বর্ণপদক’ ও নগদ ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার লাভ করেন।

সাংবাদিক সমাজে প্রতিবাদিকন্ঠ হিসেবে সুপরিচিত আবু সাউদ মাসুদ জীবনের সোনালী অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘নব্বই দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে নতুন ইতিহাস রচনা করে পাঠকের হাতে আসে ট্যাবলয়েড দৈনিক ‘মানবজমিন’। এই পত্রিকায় শুরুতে কাজ করেছে আবু আল মোরছালীন বাবলা। বাবলা ঢাকায় চলে যাওয়ার পর দৈনিক রূপালী ছেড়ে আমি মানবজমিন পত্রিকায় যোগ দেই। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি ও সন্ত্রাস নিয়ে অনেক রিপোর্ট করেছি। এরমধ্যে ছদ্মনামে ‘মুকুটহীন সম্রাট’ শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টটি ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। মানবজমিনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি। কারো রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা করিনি। একাধারে ৪ বছর আমি মানবজমিনের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক নির্বাচিত হয়েছি।’

মানবজমিন পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে চাকরি করাকালীন সময়ে আবু সাউদ মাসুদ একটু আত্মপীড়া উপলব্ধি করেন। আত্মপীড়ার কারণটা এমন যে, ঢাকার জাতীয় পত্রিকাগুলো বড় বড় নিউজ ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়। কিছু ছোট নিউজকে গুরুত্ব দিয়ে ছাপায় না। অথচ নিউজটা স্থানীয়ভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই অন্তর্দহন থেকে মুক্তি পেতে ২০০৩ সালে দৈনিক সোজাসাপটা পত্রিকার ডিক্লারেশন নেন। শুরু হয় একজন জাঁদরেল সম্পাদকের পথচলা। তবে মানবজমিন কর্তৃপক্ষ সম্ভবত নারায়ণগঞ্জের কোন একটি পক্ষের কানকথায় আবু সাউদ মাসুদের উপর রুষ্ঠ হন। সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী পত্রিকা প্রকাশ নিয়ে আপত্তি তোলেন। তিনি শর্তজুড়ে দেন যে কোন একটি কাজকে বেছে নিতে হবে। হয় সোজাসাপটা’র সম্পাদনা করতে হবে নইলে মানবজমিনের চাকরি করতে হবে। একসাথে দুইটা চলবে না। আবু সাউদ মাসুদ সোজা সাপটা ছাড়তে রাজি হলেন। তিনি ৩ মাস সময় নিলেন। ঢাকা থেকে আবার বাবলাকে (মোরছালীন বাবলা) নারায়ণগঞ্জে পাঠানো হল। সম্পাদক বলেছিলেন, দু’জনে মিলেই কাজ করেন। মাসুদ নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে সম্পাদক সাহেবের সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। ২ থেকে আড়াই মাস মোরছালীন বাবলা রিপোর্ট করে। পশ্চিম দেওভোগ নাগবাড়ির চাঞ্চল্যকর গৃহবধূ মাম্মি হত্যা মামলার রায়ের আগের দিন রাতে সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ফোন করে আবু সাউদ মাসুদকে কাজ করতে বলেন। বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। পরদিন লীড বাইনেমে আইটেম প্রকাশিত হয়। বেতনের অংকটা কাঙ্খিত পর্যায়ে বাড়ানো হয়নি। তিন মাস পর ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকা বের হল। ঢাকার সিনিয়র সাংবাদিক জাহেদুল ইসলাম ডেকে নিয়ে আবু সাউদ মাসুদকে আমার দেশ পত্রিকায় যোগ দিতে বলেন। তিনি ওয়েজবোর্ডে স্টাফ রিপোর্টার পদে যোগ দিলেন।

প্রতিবাদি সাংবাদিক আবু সাউদ মাসুদ যথেষ্ঠ স্বাধীনতা নিয়েই দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। এখানে বিধি-নিষেধের অদৃশ্য ঘেরটোপটা ছিলনা বলে হাত খুলে লিখেছেন। তাঁর প্রেরিত রিপোর্ট অফিস কোন দিন অবহেলা করে ছাপেনি। যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ঘটনাবলী প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি। দেখতে দেখতে পত্রিকাটির সার্কুলেশন বাড়তে বাড়তে থাকে। জাতীয়বাদী ভাবধারার কাগজ হলেও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পেরেছিল পত্রিকাটি। ২০১১ সালে পেলেন প্রথম নাসিক নির্বাচন। আবু সাউদ মাসুদ সিটি কর্পোরেশন এলাকা চষে বেরিয়েছেন। নির্বাচনের মাঠের পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট করলেন। নির্বাচনে আইভীর পজিশন, শামীম ওসমানের পজিশন ও তৈমূর আলম খন্দকারের পজিশন নিয়ে রিপোর্ট করতে হলো একাধিকবার। শেষ মুহূর্তে রিপোর্ট করলেন ‘আইভীর গণজোয়ার উঠে গেছে।’ রিপোর্টে বলা হলো একলাখ ভোটের ব্যবধানে আইভী জিতবেন। আবু সাউদ মাসুদের মাঠ পর্যবেক্ষণ ফলাফলের সাথে মিলে গেলে অফিস থেকে তাঁকে এ্যাপ্রিসিয়েট করা হয়েছিল। সেই স্মৃতি আজো ভোলেননি।

ষাটের দশকের নারায়ণগঞ্জের স্বনামধন্য কমার্সিয়াল চিত্রকর মরহুম নূর মোহাম্মদ এর বড় ছেলে আবু সাউদ মাসুদ। মাতা সুফিয়া সুলতানা। বর্তমানে শহরের ৮৫/৩ দক্ষিণ জামতলায় তাঁর বসবাস। ২ ভাই ২ বোনের মধ্যে তিনি বড়। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ২নং ঢাকেশ্বরী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বার একাডেমী ও নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন তোলারাম কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও দারুল এহসান ইউনিভার্সিটি। তিনি এলএলবি’তে অনার্স করেছেন।

মূলত: ক্রীড়া ফটোসাংবাদিকতা দিয়ে সাংবাদিকতা জগতে পা রাখেন আবু সাউদ মাসুদ। সাংবাদিকতার নেশায় বুঁদ হয়ে কাধে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে মাসুদ বলেন, ‘ক্রীড়া ফটোগ্রাফি দিয়েই শুরু। আমি এমএ বেগ ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা করেছি। ৮৮ সালের কথা। জীবনে প্রথম ‘পাক্ষিক খেলা’ পত্রিকার জন্য ক্যামেরা ধরি। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের বিভিন্ন ইভেন্ট কভার করতাম। সারাদিন শুধু ছবি তুলতাম। কিছুদিন ‘চিত্রবাংলা’য় কাজ করেছি। ছবি তোলার ফাঁকে ফাঁকে কিছু রিপোর্ট করতে হত। ক্যাপসন লিখতে গিয়ে হাতে সময় থাকলে অনেক সময় পুরো রিপোর্ট করে ফেলতাম। অফিস থেকে বলতো, বাহ্ আপনিতো হার্ড রিপোর্ট করতে পারেন। আপনি আরো লিখেন। এভাবে উৎসাহ পেয়ে ট্রাই করতে থাকি। এক সময় হাত পাকা হয়।’

পেশাগত জীবনে অনেক চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট করেছেন প্রতিবাদি সাংবাদিক আবু সাউদ মাসুদ। তিনি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের কার্য্যকরী পরিষদ সদস্য, সেক্রেটারী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন। ৮৯ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিন ‘আনন্দপত্র বাংলা সংবাদ (আবাস)’ নিউজ ও ফটো এজেন্সীতে। সম্পাদক মোস্তফা জব্বার। সম্মানী ২১০০ টাকা। এই প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা করাকালীন সময়ে বেশ কিছু এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট করেন তিনি।

মাসুদের ভাষ্য, ‘শহীদনগরের নারী ও শিশুপাচার, গোদনাইলের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এর উপর রিপোর্ট করলাম। জাপানী অনুদানে নির্মিত পানি শোধনাগারটি ছিল শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে। আমি অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম শীতলক্ষ্যার পানিতে যে সকল ক্যামিকেল ভেসে বেড়ায় সেই ক্যামিকেল সংশোধন করার ক্ষমতা এই শোধনাগারের নাই। আমার এই রিপোর্টটি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আমার নামেই আবাস সূত্রে রিপোর্টটি দৈনিক রূপালীতে ছাপা হয়। এই এক রিপোর্টেই আবাস থেকে আমার চাকরি হয় দৈনিক রূপালীতে। আমাকে নারায়ণগঞ্জ ব্যুরো অফিসের দায়িত্ব দেয়া হল। অফিসের খরচসহ সম্মানী ধরা হল ৩৫০০ টাকা।’

প্রাচ্যেরডান্ডি নারায়ণগঞ্জে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘দৈনিক সোজা সাপটা’ সম্পর্কে সাহসী ও আজীবন প্রতিবাদি সম্পাদক আবু সাউদ মাসুদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করতে গিয়ে প্রায়শ কিছু ছোটখাটো রিপোর্ট নিয়ে মনে ক্ষোভ জন্মাতো। অনুরোধ করার পর হয়তো রিপোর্টটি পত্রিকায় ছাপা হত। কিন্তু গুরুত্ব দেয়া হতোনা। এ নিয়ে দিনে দিনে একটা আত্মপীড়ায় ভুগতে থাকলাম। এর থেকে নিস্তার চাইছিলাম। ক্ষুদ্র পরিসরে জাতীয় পত্রিকায় রিপোর্ট ছেপে লাভ হয় না। এতে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করা যায় না। ভাবলাম নিজের একটা পত্রিকা থাকলে কিছু করা যায়। কিছু অন্যায়ের সরাসরি প্রতিবাদ করা যাবে। সেই চিন্তা থেকেই সোজাসাপটার জন্ম। একদল দক্ষ সংবাদকর্মী ও আমার দু’একজন সহকর্মী নিয়ে দৈনিক সোজাসাপটা শুরু করেছিলাম। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। আজকের মাসুদ হয়েছি তাদের জন্য। দৈনিক সোজাসাপটা ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পায়। প্রতিবাদের বাতিঘরটি বুকে আগলে রেখেছি। আজীবন মানুষের সেবা করে যেতে চাই। অন্যায় দেখলেই গর্জে উঠবে আমার মসি। কারণ অসির চেয়ে মসি বড়।’


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও