বঙ্গবন্ধুর জীবনীতে নারায়ণগঞ্জ

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:৫৪ পিএম, ২৩ জুন ২০২১ বুধবার

বঙ্গবন্ধুর জীবনীতে নারায়ণগঞ্জ

বাংলাদেশের জন্মের সাথে যার নাম জড়িত তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বার বার উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জের নাম। সেখানে একাধিকবার স্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি বায়তুল আমান ও পাইকপাড়ার মিউচুয়েল ক্লাব সম্পর্কেও লেখা আছে।

রাজনীতির কারণে তিনি বেশ কয়েকবার নারায়ণগঞ্জে আসেন। সে সম্পর্কে তিনি নিজে যা বলেছেন ‘ফরিদপুর জেলে ফিরে এলাম।... তারপর আরও কিছুদিন পরে সরকার থেকে হুকুম এল আমাকে ঢাকা জেলে পাঠাতে। ফরিদপুর থেকে ট্রেনে গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ থেকে জাহাজে নারায়ণগঞ্জ আসলাম এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্যাক্সিতে করে ঢাকা জেল। জেলগেট থেকে জেল হাসপাতালে।... আমি যখন ঢাকা জেলে আসলাম তখন ১৯৫১ সালের শেষের দিক হবে।... ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে সকালবেলা আমাকে জেলগেটে নিয়ে যাওয়া হল... একটু পরেই মহিউদ্দিনকেও নিয়ে আসা হয়েছে... কর্তৃপক্ষ বললেন, আপনাদের অন্য জেলে পাঠানোর হুকুম হয়েছে।... ফরিদপুর জেলে। দুজনকেই এক জেলে পাঠানো হচ্ছে।

তখন নয়টা বেজে গেছে। এগারটায় নারায়ণগঞ্জ থেকে জাহাজ ছাড়ে, সেই জাহাজ আমাদেরকে ধরতে হবে। আমি দেরি করতে শুরু করলাম, কারণ তা না হলে কেউই জানবে না আমাদের কোথায় পাঠাচ্ছে!... দেরি করতে করতে দশটা বাজিয়ে দিলাম। রওয়ানা করতে আরও আধা ঘন্টা লাগিয়ে দিলাম।... আমরা পৌঁছে খবর পেলাম জাহাজ ছেড়ে চলে গেছে।... আমাদের নারায়ণগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হল।... আমাদের পুলিশ ব্যারাকের একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। একজন চেনা লোককে থানায় দেখলাম, তাকে বললাম শামসুজ্জোহাকে খবর দিতে। খান সাহেব ওসমান আলীর বাড়ি সকলেই চিনে। এক ঘণ্টার মধ্যে জোহা সাহেব, বজলুর রহমান, ও আরো অনেকে থানায় এসে হাজির। আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। পরে আলমাস আলীও আমাদের দেখতে এসেছিল। আমি ওদের বললাম ‘‘রাতে হোটেলে খেতে যাব। কোন হোটেলে যাব বলে যান। আপনারা পূর্বেই সেই হোটেলে বসে থাকবেন। আলাপ আছে।’’... আমি বললাম, ‘‘আটটা থেকে সাড়ে আটটায় আমরা পৌঁছাব।’’ নতুন একটা হোটেল হয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডের উপরে, হোটেলটা দোতালা।

আমি সুবেদার সাহেবকে বললাম যে, ‘‘আমাদের খাওয়া-দাওয়া দরকার, চলুন, হোটেলে খাই। সেখান থেকে জাহাজঘাটে চলে যাব।’’ সে রাজি হল।... দোতলায় একটা ঘরে বসার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে আমাদের খাবার বন্দোবস্ত করে রেখেছে। আমরা বসে পড়লাম। আট-দশজন কর্মী নিয়ে জোহা সাহেব বসে আছেন। আমরা আস্তে আস্তে খাওয়া-দাওয়া করলাম, আলাপ-আলোচনা করলাম। ভাসানী সাহেব, হক সাহেব ও অন্যান্য নেতাদের খবর দিতে বললাম। খবরের কাগজে দিতে পার চেষ্টা করবে। বললাম, সাপ্তাহিক ইত্তেফাক তো আছেই। আমরা আগামীকাল থেকে আমরণ অনশন শুরু করব, সে কথাও বললাম, যদিও তারা পূর্বেই খবর পেয়েছিল।’’

‘‘... মাওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের বিবৃতির পরে আর আমরা মুসলিম লীগের সদস্য থাকলাম না। অর্থাৎ আমাদের মুসলিমলীগ থেকে খেদিয়ে দেওয়া হল।... টাঙ্গাইলে মুসলিম লীগ কর্মীদের এক সভা ডাকা হল, কি করা যায় ভবিষ্যতে? আলোচনা হবার পর ঠিক হল আরেকটি সভা করা হবে নারায়ণগঞ্জে। সেখানে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। মাওলানা ভাসানী, আব্দুস সালাম খান, আতাউর রহমান খান, শামসুল হক সাহেব আরও অনেক মুসলিম লীগ কর্মী ও নেতা যোগদান করবেন বলে ঠিক হল।’’

‘‘সভার আয়োজন করেছিল আলমাস আলী, আবদুল আউয়াল, শামসুজ্জোহা ও আরও অনেকে। খান সাহেব ওসমান আলী এমএলএও সমর্থন দিয়েছিলেন। সভার পূর্বে ১৪৪ ধারা জারি করা হল। আমরা পাইকপাড়া ক্লাবে সভা করলাম। বিভিন্ন জেলার অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত হয়েছিলেন। এই সময় শামসুজ্জোহার উপর মুসলিম লীগের ভাড়াটিয়া গুন্ডারা আক্রমণ করেছিল। দুঃখের বিষয়, এই কর্মীরাই নারায়ণগঞ্জে মুসলিম লীগ গঠন করেছিল এবং পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। এখন যারা এদের উপর আক্রমণ করেছিল তাদের প্রায় সকলেই পাকিস্তান ও মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ছিল।... ’’ পাইকপাড়া ক্লাবটির নাম হলো ‘মিউচুয়েল ক্লাব’। যা আজও আছে।

‘‘... রাতে রওয়ানা করে এলাম। দিনেরবেলায় আসলে হাচিনা (শেখ হাসিনা) কাঁদবে। কামাল (শেখ কামাল) তো কিছু বুঝে না।... পরের দিন সকালবেলায় মুন্সীগঞ্জ পৌঁছালাম।... নারায়ণগঞ্জ দিনেরবেলায় নামলে আর ঢাকা যেতে হবে না, সোজা জেলখানায়।... আমরা মুন্সিগঞ্জে নেমে মিরকাদিম হেঁটে আসলাম। সেখানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করে সন্ধ্যার একটু পূর্বে নৌকায় নারায়ণগঞ্জ রওয়ানা করলাম। সন্ধ্যার পর নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে রিক্সা নিয়ে সোজা খান সাহেবের বাড়ি পৌঁছালাম। জোহা সাহেব খবর পায় নাই, তাঁর ছোট ভাই মোস্তফা সারোয়ার তখন স্কুলের ছাত্র। আমাকে জানত। তাড়াতাড়ি জোহা সাহেবকে খবর দিয়ে আনল। আমরা ভিতরের রুমে বসে বসে চা-নাশতা খেলাম। খান সাহেবের বাড়ি ছিল আমাদের আস্তানা। ক্লান্ত হয়ে এখানে গেলেই যে কোন কর্মীর খাবার ও থাকার ব্যবস্থা হত। ভদ্রলোকের ব্যবসা বাণিজ্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু প্রাণটা ছিল অনেক বড়। জোহা সাহেব এসেই ট্যাক্সি ভাড়া করে আনল, আমাদের তুলে দিল। শওকত মিয়ার জন্য একটু দেরিও করেছিলাম। আমরা ঢাকায় রওয়ানার কয়েক মিনিট পরে শওকত মিয়াও নারায়ণগঞ্জ এসে পৌঁছাল এবং আমাদের চলে যাবার খবর পেয়ে আবার ঢাকায় ছুটল।... ’’

(বিঃ দ্রঃ লেখাটিতে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিরোমন্থন (অসামপ্ত আত্মজীবনী) প্রকাশের সময় যে ভাষা ও বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে, তা হুবহু রাখা হয়েছে অর্থাৎ শব্দ, বাক্য ও ভাষার কোনো পরিবর্তন করা হয়নি)


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও