‘সামসুজ্জোহার উপর গুন্ডাদের আক্রমণ’

এস এম শহিদুল্লাহ (লেখক ও গবেষক) : || ১১:১৫ পিএম, ২৪ জুন ২০২১ বৃহস্পতিবার

‘সামসুজ্জোহার উপর গুন্ডাদের আক্রমণ’

১৯৪৭ সালে সদ্য দেশভাগের পর মুসলিম লীগ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থকদের এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করে। আওয়ামী মুসলিম লীগ দল গঠনের পূর্বে মুসলিম লীগ কাউন্সিলরদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মিউচুয়েল ক্লাবে। সে সভা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন: মওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের বিবৃতির পর আর আমরা মুসলিম লীগের সদস্য থাকলাম না। অর্থাৎ আমাদের মুসলিম লীগ থেকে খেদিয়ে দেওয়া হল। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, মুসলিম লীগকে একটা প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।...

আমাদের ভাষা আন্দোলনের সময় মওলানা সাহেব সমর্থন করেছিলেন। টাঙ্গাইলে মুসলিম লীগ কর্মীদের এক সভা ডাকা হল, কি করা যায় ভবিষ্যতে! আলোচনা হবার পরে ঠিক হল, আরেকটা সভা করা হবে নারায়ণগঞ্জে। সেখানে ভবিষ্যত কর্মপন্থা ঠিক করা হবে। মওলানা ভাসানী, আবদুস সালাম খান, আতাউর রহমান খান, শামসুল হক সাহেব ও আরও অনেক মুসলিম লীগ কর্মী ও নেতা যোগদান করবেন বলে ঠিক হল। সভার আয়োজন করেছিল আলমাস আলী, আবদুল আউয়াল, শামসুজ্জোহা ও আরও অনেকে। খান সাহেব ওসমান আলী এমএলএও সমর্থন দিয়েছিলেন। সভার পূর্বে ১৪৪ ধারা জারি করা হল। আমরা পাইকপাড়া ক্লাবে সভা করলাম। বিভিন্ন জেলার অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত হয়েছিলেন। এই সময় শামসুজ্জোহার উপর মুসলিম লীগের ভাড়াটিয়া গুন্ডারা আক্রমণ করেছিল। দুঃখের বিষয়, এই কর্মীরাই নারায়ণগঞ্জে মুসলিম লীগ গঠন করেছিল এবং পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। এখন যারা এদের উপর আক্রমণ করেছিল তাদের প্রায় সকলেই পাকিস্তান ও মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ছিল। প্রত্যেক জেলা ও মহকুমায় মুসলিম লীগ ভেঙে দিয়ে এডহক কমিটি গঠন করেছিল। প্রায় সমস্ত জায়গায় মুসলিম লীগ কমিটিতে শহীদ সাহেবের সমর্থক বেশি ছিল বলে অনেক লীগ পাকিস্তান বিরোধী লোকদের এডহক কমিটিতে নিতে হয়েছিল। কিন্তু জনসাধারণ মুসলিম লীগ বলতে শুধু পুরানা লীগ কর্মীদেরই বুঝত।

মওলানা ভাসানী সাহেবের সভাপতিত্বে এই সভা হল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, প্রথমে দুইজন প্রতিনিধি করাচিতে জনাব খালিকুজ্জামান সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং আমাদের দাবি পেশ করবেন। আমাদের দাবি ছিল, পুরানা মুসলিম লীগকে কাজ করতে দেওয়া হোক। যদি না শোনেন, তবে আমাদের রসিদ বই দেওয়া হোক এবং যাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় তার বন্দোবস্ত করা হোক। দেখা যাবে, জনসাধারণ কাদের চায়? তখনকার দিনে করাচি যাওয়া এত সোজা ছিল না। কলকাতা-দিল্লি হয়ে করাচি যেতে হত। ঠিক হল, জনাব আতাউর রহমান খান এবং বেগম আনোয়ারা খাতুন এমএলএ যাবেন করাচিতে। তাঁরা করাচিতে গেলেন এবং চৌধুরী খালেকুজ্জামানের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং আমাদের দাবিদাওয়া পেশ করলেন। খালিকুজ্জামান সাহেব বলে দিলেন, “পুরানা কথা ভুলে যান, যারা খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেবকে সমর্থন করবেন, তারাই মুসলিম লীগের সদস্য থাকবেন।” রসিদ বইয়ের কথায় বললেন, “কাগজ পাওয়া যায় না, তাই রসিদ বই পাওয়া কষ্টকর। আকরাম খাঁ সাহেব ও পূর্ব পাকিস্তান এডহক কমিটিকে বলবেন, তারা যদি ভাল মনে করেন তবে পাবেন।” দুইজনই ফিরে এলেন এবং আমাদের কাছে বললেন, মিছামিছি কতগুলি টাকা খরচ করা হল, কোনো কাজ হল না। খালিকুজ্জামান সাহেব ভাল করে কথা বলতেও চান নাই।...

সেই সভায় উপস্থিতি সম্পর্কে ‘নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে: পাইকপাড়ায় মিউচুয়েল ক্লাবের সভায় নারায়ণগঞ্জের কর্মীদের মধ্যে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন আলমাস আলী, আবদুল আউয়াল, ওসমান আলী, শামসুজ্জোহা, বশির উদ্দিন সর্দার, মুজাফ্ফর আলী, টি হোসেন, গফুর চৌধুরী, আক্কাছ মিয়া, আইউব আলী, আফতাবুদ্দিন, মফিজউদ্দিন, নূরুদ্দিন, হাবিবুর রহমান টুকু, কাজী কাশেম প্রমুখ ব্যক্তি।

সেই সভা সম্পর্কে সরকারের গোয়েন্দা নথিতে যে তথ্য লিপিবদ্ধ আছে: ১৬-০৫-১৯৪৮ তারিখে নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় মিউচুয়েল ক্লাবে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাবেক কাউন্সিলরদের একটি রুদ্ধদ্বার সভা অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এই সভায় সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা রাখেন। বৈঠকে ময়মনসিংহের মাওলানা হামিদ খান (ভাসানী) বক্তৃতা শুরু করেন। সভায় আলেচনার বিষয়টি জানা সম্ভব হয়নি কারণ এটি একেবারে একটি গোপন বৈঠক ছিল এবং সাধারণ কারো প্রবেশের অনুমতি ছিল না।

১৯৪৯ সালে মিউচুয়েল ক্লাবে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কাউন্সিলরদের সে সভাটিকে বলা যেতে পারেÑআওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ) গঠনের একটি ‘প্রস্তুতিমূলক সভা‘। যার মধ্য দিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁদের সমর্থকগণ উজ্জিবীত হয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ) গঠনের পথ রচনা করেছিলেন।)

(‘নারায়ণগঞ্জের স্মৃতি বিস্মৃতি’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত)


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও