মহামারীতেও অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩৪ পিএম, ৬ জুলাই ২০২১ মঙ্গলবার

মহামারীতেও অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য

নারায়ণগঞ্জে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। চিকিৎসক, সেবিকা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সেবার সাথে জড়িত সকলেই নমনীয় হয়ে করোনা মোকাবেলায় কাজ করে চলেছেন। দেশজুড়ে আইসিইউ সেবা বৃদ্ধি করে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের। তবুও মৃত্যুর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীদের নিয়ে ঢাকার বড় বড় হাসপাতালের দিকে রওনা হওয়া অ্যাম্বুলেন্সগুলো ছুটছে দিনরাত। কিন্তু এর মাঝেও নিজেদের অনৈতিক বাণিজ্য থেকে থেমে নেই চালকেরা। রোগীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে বাড়তি টাকা হাঁকছেন চালকেরা।

রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, করোনা আক্রান্ত রোগীর কথা শুনলে স্বাভাবিকের তুলনায় অধিক ভাড়া হাঁকছেন অ্যাম্বুলেন্স চালকরা। রোগীদের অবস্থা বিবেচনা করে কেউই এসব নিয়ে তর্ক বিতর্ক করার চিন্তাও করেননা। অথচ একই রাস্তায় একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করে নিয়ে গেলে আরও কম টাকা লাগে। অ্যাম্বুলেন্স যেখানে সেবা দেয়ার জন্য নামানো হয়েছে সেখানে তারা অধিক ভাড়া চাচ্ছেন। এসব বিষয়ে কোন নজরদারী না থাকায় রোগী ও তার পরিবারের স্বজনরা এক প্রকার জিম্মি।

শহরের উত্তর চাষাঢ়া এলাকার বাসিন্দা মাকসুদ তার বাবাকে নিয়ে ঢাকার একটি আইসিইউতে ভর্তি করাতে নিয়ে যান। খানপুর হাসপাতাল এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স খোজ করতেই দাম শুনে অবাক হন তিনি। কারণ প্রায়ই প্রাইভেটকার ভাড়া নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে দূর দূরান্তে যাওয়া হয় তার। এত কাছের হাসপাতালে যাতায়াতের ভাড়া বেশী চাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। পিতার অসুস্থতার কথা চিন্তা করে বাড়তি ভাড়াতেই হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি।

মাকসুদ জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত নিয়ে যেতে তার গুনতে হয়েছে ২২০০ টাকা। অথচ তিনি জানতেন নয়শত থেকে এক হাজার টাকা নিতে পারে অ্যাম্বুলেন্সগুলো। বাড়তি সুবিধা ও দ্রুত ঢাকায় যাওয়া যাবে এই চিন্তা করে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে যান। কিন্তু এত বেশী ভাড়া দেখে অনেকটা জিম্মি হয়েই বিল পরিশোধ করেন তিনি।

সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জের খানপুর ও ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে সরকারি ও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া জানতে খোঁজ নেয়া হয়। সরকারি একটি অ্যাম্বুলেন্সের চালকের কাছে খানপুর থেকে করোনা রোগী নিয়ে ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত যাওয়ার কথা বললে তিনি বলেন, খানপুর থেকে যেতে চাইলে সরকারি হিসেবে ২০৮৫ টাকা ভাড়া লাগবে। আর বেসরকারি ভাড়া লাগবে ২২০০ টাকা। তবে একই গাড়িতে সোহরাওয়ার্দী এবং কুর্মিটোলা হাসপাতালে যেতে কত লাগবে তা জানতে চাইলে জানান, সোহরাওয়ার্দী পর্যন্ত একই ভাড়া কিন্তু কুর্মিটোলা গেলে ২৫০০ দেয়া লাগবে।

এবার বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকের কাছে জানতে চাওয়া হয় ভাড়ার পরিমাণ। অ্যাম্বুলেন্স চালক লুৎফর বলেন, ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত বেসরকারি অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া ২ হাজার টাকা। একই সাথে সোহরাওয়ার্দী পর্যন্ত ২৫০০ এবং কুর্মিটোলা হাসপাতালে গেলে ৩ হাজার টাকা দিতে হবে। তবে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্স সেবা কিভাবে পেতে হবে তা জানতে চাইলে বলেন, সরকারি ভাড়া তো অনেক কম। ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত ভাড়া ১৫০০ টাকা। কিন্তু ওরা ঠিকমত ট্রিপ মারে না।

অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিস নামক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শাহজাহান বলেন, অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়ার কোন নীতিমালা নাই। যে যেভাবে পারে ভাড়া নেয়। ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুল্যান্স হাসপাতালের আশেপাশে থাকেনা। এই খানপুরেই একটা অ্যাম্বুল্যান্স বইসা আছে। ঐটার ড্রাইভার ভেতরে ঘুমায়। যদি হাসপাতাল থিকা ফোন দেয় তাইলে বলবো ঢাকায় আছে। এমনে চলে সরকারি সার্ভিস।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী অ্যাম্বুল্যান্সে প্রথম ১০ কিলোমিটারের ভাড়া ৩০০ টাকা। পরের প্রতি মিটারে ভাড়া বাড়বে ২০টাকা করে। সেই হিসেবে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিকেলে পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটারে ভাড়া আসে ৪৮০ টাকা। আসা যাওয়ায় মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল খরচ সহ টাকার অংক দাঁড়ায় ৬৫০ টাকায়। বছর দুয়েক পূর্বেও নারায়ণগঞ্জ থেকে ৯০০ টাকায় ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত এম্বুল্যান্স যাতায়াত করতো। কিন্তু মহামারী করোনাকে পুঁজি করে ২ হাজার টাকার মত ভাড়া হাঁকছে চালকেরা।

একই ভাবে নারায়ণগঞ্জ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে কুর্মিটোলা হাসপাতালে যেতে ভাড়া আসে ৬০০ টাকা। আসা যাওয়ায় মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল খরচ সহ টাকার অংক দাঁড়ায় ৭৭০ টাকায়। কিন্তু এই হিসেব কোনভাবেই মানতে রাজি নন এম্বুল্যান্স চালকরা। অতিরিক্ত ভাড়া দেয়া না হলে কোনভাবেই নিজ অবস্থান থেকে নড়বেন না তারা।

ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল সূত্র জানা যায়, হাসপাতালে বর্তমানে ২টি সরকারি অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে। দুটোই বর্তমানে সচল আছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে হাসপাতালের আরএমও আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের দুটি অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে। এগুলো কোন হাসপাতালে নির্ধারিত ভাড়ায় চলে না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চলাফেরা করে। সেই নিয়মে অ্যাম্বুল্যন্সের ভাড়া প্রথম ১০ কিলোমিটারের ফি ৩০০ টাকা। এরপর প্রতি কিলোমিটারের ফি ২০ টাকা। এরসাথে যুক্ত হয় ফ্লাইওভারের টোল ফি।

একই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়, খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল বাশার বলেন, আমাদের বর্তমানে অনুদান সহ মোট ৫টি অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে। এগুলো সরকার নির্ধারিত ভাড়াতেই চলাচল করে থাকে। কিন্তু কেউ যদি অধিক ভাড়া চায় তাহলে সরাসরি আমাদের কাছে প্রমাল সহ অভিযোগ দিলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও