মরণদশায় কাশীপুর খাল

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৭:৪৫ পিএম, ২ আগস্ট ২০২১ সোমবার

মরণদশায় কাশীপুর খাল

আশির দশকের শুরুতে এক বর্ষায় জেলেরা ইলিশ ধরেছিল কাশীপুর খালে। ভোলাইল গেদ্দারবাজার ছাড়িয়ে আরো উত্তর-পশ্চিমে নবীনগরের কাছে ইলিশ ধরা পড়েছিল। জেলেরা বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলেন এ ঘটনায়। তখন বর্ষায় কাশীপুর খালটি পানিতে ফুলে ফেপে ছোট নদীতে পরিণত হত। জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ায় অত্র অঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল যে, এই খালটি এক সময় নদীতে রূপ নিবে। দুই পাড়ের গ্রাম ভাঙ্গন ধরবে। সেই আতঙ্ক বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কাশীপুর খালের আর নদী হয়ে ওঠা হয়নি। এখনতো খালের মরণ দশা চলছে।

জানাগেছে, দখল দূষণে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে কাশীপুর ইউনিয়ন পরিষদ খাল। দু’পাড়েই দখল হচ্ছে। প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও ভূমিদস্যুদের থাবায় খাল অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নব্বইয়ের দশকেও গেদ্দারবাজারে গুদারা ঘাট ছিল। কদমআলী স্কুলের পাশের খেয়াঘাট, কাশীপুর ইউনিয়ন পরিষদের পেছনে গুদারা ঘাট ও হাটখোলা এলাকায় গুদারা ঘাট ছিল। এখন কদমআলী স্কুল ঘাট ছাড়া আর কোন খেয়াঘাট নেই। ইউনিয়ন পরিষদের খেয়াঘাট না থাকার মতন আছে। ইউনিয়ন পরিষদের পরেই খালের উপর বাঁশের ব্রীজের ন্যায় সাঁকো তৈরী করা হয়েছে। এই সাঁকোর জন্য কাশীপুর খালে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

গেদ্দারবাজার খেয়াঘাটে অনেক আগেই বাঁশের ব্রীজ তৈরী করা হয়েছিল। নবীনগরের দিকে যেতে দু’পাড় দখলের চিত্র চোখে পড়ে। চর নরসিংপুর এলাকাজুড়ে দখলের মচ্ছব। অনেকে মিল কারখানাও গড়ে তুলেছে। অনেকে খালের পাড়ে বাড়ি বানাতে গিয়ে পাড় দখল করে নিয়েছে। খালের উপর ভবন তৈরী করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দেখেও না দেখার ভান করে। কেননা, দখলদারদের সাথে একটা নিবিড় যোগাযোগ থাকে জনপ্রতিনিধিদের। সবাই মিলেই সরকারী সম্পত্তি লুটেপুটে খায়।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, কাশীপুর খালের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। সেই ব্রিটিশ আমলে থেকেই খালটি প্রবাহিত হচ্ছে। ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গার শাখা খালটি সৈয়দপুর হয়ে সোজা কাশীপুরের ভেতর দিয়ে নবীনগর হয়ে ফের বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিলতো। পাকিস্তান আমলেও এই খাল নবীনগর হয়ে বুড়িগঙ্গায় যেত। এটা নৌপথও ছিল। বুড়িগঙ্গা থেকে নৌকা কমলাঘাটে এই সংক্ষিপ্ত পথে যেত। তাছাড়া কাশীপুর খালটি হাজীপাড়া হয়ে সোজা কালিয়ানীর বিল ও ডানে পূর্ব দিকে জেলেপাড়ার পাশ দিয়ে একেবেকে বাংলাবাজার হয়ে বাবুরাইল ছাড়িয়ে একেবারে শীতলক্ষা নদীতে গিয়ে মিশতো। বাংলাবাজার স্কুলের পেছন দিয়ে একবেকে শাখা খালটি মাসদাইর বারৈভোগ ও লিচুবাগ হয়ে বোয়ালিয়া খালের সাথে মিশেছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও কাশীপুর খালের পানি স্বচ্ছ ছিল। প্রচুর মাছ পাওয়া যেত।

ফতুল্লার কাশিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে ৪ বর্গমাইল আয়তনের ফতুল্লার কাশিপুর ইউনিয়নের মধ্যে সরকারী খালের পরিমাণ ৬.৩৮ একর। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠরা জানান, যখন প্রাচ্যের ডান্ডি ছিল নারায়ণগঞ্জ তখন দেশের বিভিন্ন স্থান হতে শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের শহরের টানবাজার, মন্ডলপাড়া, বাবুরাইল খাল দিয়ে কাশীপুরের বাংলাবাজার হয়ে মালবাহী বৃহৎ নৌযানের যাতায়াত ছিল।

অপরদিকে সৈয়দপুর এলাকা থেকে শীতলক্ষ্যা-ধলেশ্বরী নদীর সংযোগ শাখা খাল কাশিপুর হাটখোলা থেকে দেওয়ান বাড়ি, ভোলাইল হয়ে বিসিক শিল্পনগরী পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে, কাশিপুরের দেওয়ানবাড়ি খালের মাছ খুবই সুস্বাদু ছিল। এখানে এতই মাছ পাওয়া যেত যার ফলে আস্তে আস্তে এখানে মৎস্যজীবীদের বাসস্থান জেলেপাড়া গড়ে ওঠে। বর্তমানে কাশিপুরে জেলেপাড়া থাকলেও শিল্পবর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়ায় দুই দশকের বেশী সময় ধরে খালে মাছ নেই। পেশা বদলাচ্ছেন ওই এলাকার জেলেপাড়ার জেলেরাও।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার কাশিপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরেই খাল দখলের মহোৎসবে মেতে উঠেছে প্রভাবশালীরা। দীর্ঘদিন ধরেই সরকারী খাল দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারী খাল দখল করে শিল্পকারখানা, ভবন, দোকানপাট, গাড়ির গ্যারেজ সহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। খালটি দখলের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীরা যেন প্রতিযোগিতা করছেন।

দখলদাররা যেন তাল মিলিয়ে খাল দখল করেছেন। অবৈধ দখল টিকিয়ে রাখতে কেউ কেউ আবার আদালতে মামলাও করেছেন। কোন কোন স্থানে খালগুলো পরিণত হয়েছে সরু নালায়। দখলদারদের সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় ভূমি কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে দীর্ঘদিনেও এসকল অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কোন পদক্ষেপ।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও