সাংবাদিক বিয়োগে অসহায় পরিবারের কান্না

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২৮ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০২১ শনিবার

সাংবাদিক বিয়োগে অসহায় পরিবারের কান্না

ব্যক্তিগত জীবনকে জলাঞ্জলি দিয়ে পেশাগত কাজকে গুরুত্ব দিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলার নাম সাংবাদিকতা। অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছ পা হননা সাংবাদিকরা। কখনো গুলির আগে কখনো তলোয়ারের সামনে থেকেও ছবি তথ্য সংগ্রহ করতে ভীতসন্ত্রস্থ হননা। জনগণ থেকে শুরু করে রাজনীতিক মহলের যে কোন ঘটনায় সবার আগে ছুটে যায় সাংবাদিকরা। প্রয়োজনের সময় এই সাংবাদিকদের কোলে তুলে নিতেও বিলম্ব করেনা আবার কাজ ফুরিয়ে গেলে ভুলে যেতেও সময় লাগেনা। বিশেষ করে কোন সাংবাদিক মৃত্যুবরণ করলে সহায়তা তো দূরের কথা খোঁজ খবরও রাখেনা। এতে করে চোখের পানিতে পরিবার স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও বাস্তবতা বড়ই নির্মম।

জীবনের ঝুকি নিয়ে পেশাগত কাজ করতে গিয়ে অনেকে খুন হয়েছে এরুপ সাংবাদিকের সংখ্যাও কম নয়। খুন হওয়ার পরে কিছুদিন পরিবার স্বজনদের স্বান্তনা দিতে অনেকে ছুটে যান। তবে সময়ে ব্যবধানে কেউ আর তাদের মনে রাখেনা। এরুপ অবস্থায় আর্থিক সংকট সহ নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে কোন রকমে সাংবাদিকের পরিবার জীবন অতিবাহিত করে। এমনকি বর্তমানে করোনাকালীন সময়ে বেশীরভাগ সাংবাদিক অর্থকষ্টে ভুগলেও তাদের খোঁজ নেননা কেউ। অথচ এই দু:সময়েও অসহায় মানুষের কথাও চিন্তা করেন গণমাধ্যমকর্মীরা।

বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর রনি গত ১২ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। প্রথমে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হচ্ছিল। পরে আবারো হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান।

সাংবাদিক রনির ছোট ভাই ইসমাইল বলেন, রনি ভাইয়ের পরিবারে তিনি একমাত্র উপার্জনকারী সদস্য। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তার স্ত্রী সহ ভাড়া বাড়িতে ভাড়া থাকতো। ছেলে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আর মেয়ে ৭ মাস বয়সী। সাংবাদিকতা ছাড়া তার অন্য কোন উপার্জনের উৎস ছিলনা। উল্টো করোনা পরিস্থিতিতে কাজ না থাকায় দেনা হয়ে গেছে। এছাড়া বাড়ি ভাড়া বকেয়া আছে।

তিনি আরো বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোন সহায়তা পাইনি। কেউ কোন রকম আশ্বাস দেয়নি। তবে আগামীকাল ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাংবাদিকরা আসবে।

গত বছরে ১১ অক্টোবর রাতে বাসায় যাওয়ার পথে উপজেলার আদমপুর এলাকায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা সাংবাদিক ইলিয়াসকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। ওই রাতে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত তুষারকে আটক করে পুলিশ। পরে ভোরে জিওধরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিন্নাত আলী ও মিসির আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সে স্থানীয় দৈনিক বিজয় পত্রিকার বন্দর সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতো। এ ঘটনায় নিহত ইলিয়াসের স্ত্রী ৮জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেন। তবে আসামীপক্ষের লোকজন উল্টো ইলিয়াসের পরিবার স্বজনদের উল্টো হুমকি দিয়ে আসছে। এতে সাংবাদিক মহল তাদের পাশে দাড়ালেও কোন জনপ্রতিনিধি বা নেতারা পাশে দাড়ায়নি। এমনকি আর্থিক সহয়োগিতায়ও দু-একজন ছাড়া কেউ এগিয়ে আসেনি। আবার অনেকে বিগত সময়ে যোগাযোগ করলেও সময়ের ব্যবধানে ভুলে গেছে সবাই। এতে করে পুরো পরিবারটি অসহায় অবস্থায় কোন রকমে দিনাতিপাত করছে।

নিহত ইলিয়াসের স্ত্রী জুলেখা বেগম বলেন, আমরা খুব শিঘ্রই নারাজি দিব। চার্জশীট থেকে প্রকৃত খুনিদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। একারণে কোর্ট খুললে খুব শিঘ্রই আমরা না রাজ দিব। তবে না রাজি দিয়ে কোন কাজ হবেনা মনে হচ্ছে। কারণ আসামী পক্ষের লোকজনের সাথে ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতাদের হাত আছে। এখন আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছি। আমার স্বামী সাংবাদিক ইলিয়াস হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে পুরো পরিবার আজ পথে বসে গেছে। তিনি একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন।

তিনি আরো বলেন, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আপাতত স্বামী ইলিয়াসের ভাইয়ের একটি জায়গায় ঘর তুলে বসবাস করছি। এই ঘর তোলার টাকাও ছিলনা। এলাকাবাসী সহ আশেপাশের লোকজন টাকা জুগিয়ে দিয়েছে। এছাড়া বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান এম এ রশিদ ১০ হাজার টাকা দিয়েছে। আর বন্দর উপজেলার ইউএনও মেডাম আমার বাবার বাড়িতে ঘর তুলে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। বলেছে সরকারীভাবে ঘর তুলে দেয়ার বরাদ্দ আসলে দিবে। এছাড়া কলাগাছিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেলোয়ার বিজিএফ কার্ড করে দিয়েছে যার মাধ্যমে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে মোটা চাল দেয় তা দিয়ে সংসার চলে। এছাড়া আশেপাশের লোকজনের সহায়তায় কোন রকমে সংসার চলছে।

জুলেখা বেগম বলেন, আমি নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। একারণে কোন কাজও করতে পারিনা। সংসারের কাজও করতে পারছিনা। এই অবস্থায় একেবারে অসহায়ভাবে দিনাতিপাত করছি।

ফটো সাংবাদিক নাদিম গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর তল্লায় মসজিদ বিষ্ফোরণের ঘটনা অগ্নিদগ্ধ হয়ে পরের দিন চিকিৎসারত অবস্থায় মৃতুবরণ করেন। সাংবাদিক নাদিমের স্ত্রী লিমা জানান, ‘সাংবাদিক নাদিম অন্য কোন পেশায় জড়িত ছিলনা। যেকারণ সাংবাদিকতা ছাড়া অন্য কোন উৎস থেকে উপার্জন নেই। তার মৃত্যুর পরে সরকারীভাবে ৫ লাখ টাকা পেয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন লোকজনের মাধ্যমে আরো ২ লাখ পেয়েছি। এই ৭ লাখ টাকা ডিপোজিট করে রেখেছি। এর থেকে প্রতি মাসে যে টাকা আসে তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চালাই। আর এই ঘটনার পর ৫ বছরের জন্য বাড়ি ভাড়া মওকুফ করে দিয়েছে বাড়িওয়ালা। এজন্য বাড়ি ভাড়া নিয়ে আপাতত চিন্তা নেই।

তিনি আরো জানান, ‘ছেলেকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়ি যখন আমার ভাসুরের পরিবারের লোকজনের সাথে বিরোধ তৈরি হয়। এখন আত্মীয় স্বজন বলতে কেউ মুরব্বি নেই। তবে বাড়ির বাড়িওয়ালা, কাউন্সিলর শকু ভাই সহ বেশ কয়েকজন আমাদের পাশে রয়েছে। এতে অনেকটা ভরসা পাচ্ছি।

ফটো সাংবাদিক মেহেদী হাসান নয়ন ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ভারত সহ দেশের বিভিন্ন হসপিটালে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করেও শেষ রক্ষা হয়নি।

সাংবাদিক নয়নের স্ত্রী তিসা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,‘ এখন আর কেউ খোজ খবর নেয়না। কেউ ফোনও দেয়না। আমার স্বামী মারা যাওয়ার পরে কয়েকজন ফোন দিলেও পরে আর কেউ ফোন দেয়না। আমার স্বামী শুধুমাত্র সাংবাদিকতা করতো। তার মৃত্যুর পরে আমি আমার মামার বাড়ির লোকজনদের সাথে এখন বসবাস করছি। আমার মা ও ছেলেকে নিয়ে এখন ভাড়াবাড়িতে বসবাস করছি। ধার দেনা করে কোন রকমে সংসার চলছে।

তিনি আরো বলেন, আমার স্বামীর মৃত্যুর পরে অনেকে টাকা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু তারা দেয়নি। এক জায়গা থেকে তিন লাখ দেয়ার কথা ছিল। এছাড়া মাসিক হারেও টাকা দেয়ার কথা ছিল। কেউ দেয়নি।

গত ৭ জুলাই দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিন ও দৈনিক সকাল প্রতিদিন ডট কম এর সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি মোঃ খায়রুল হাসান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে এবং আত্মীয়-স্বজনসহ বহু গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। মরহুম খায়রুল হাসান আদমজী হাই স্কুলের ১৯৯৭’ব্যাচের ছাত্র ছিল। মরহুম খায়রুল হাসান পরিবার নিয়ে নাসিক ১নং ওয়ার্ড পাইনাদী সুলতানের মোড় এলাকায় ভাড়ায় বসবাস করতো। বাদ জোহর মরহুমের নামাজে জানাজা শেষে আদমজী কবরস্থান কমপ্লেক্স দাফন সম্পন্ন হয়।

২৪ মে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য ও সিনিয়র সাংবাদিক ফজলুর রহমানের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মাসদাইর কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে সকাল ১০টায় নগরীর ডিআইটি মসজিদের সামনে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার লাশ নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে আনা হয়। এখানে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সদস্যরা ফুল দিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

এসময় বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি খন্দকার শাহ্ আলম বলেন, ফজলুর রহমান বহুবছর সাংবাদিকতা করেছেন। নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের বহুতল ভবন নির্মাণে তার অবদান আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরন করি।

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আরিফ আলম দীপু ও রুমন রেজা বলেন, ফজলুর রহমান অসংকোচে সত্য কথা বলতেন। এটি ছিলো তার চরিত্রের গুরুত্বপূর্ন দিক।

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ বলেন, তিনি যে বাড়িতে থাকেন এ বাড়ি নিয়ে তার ভাইয়ের স্ত্রী তাকে বেশ হয়রানী করেছেন আজীবন। এখন তার মৃত্যুর পর তার পরিবারের পাশে সাংবাদিকদের দাড়িয়ে এ সমস্যা সমাধান করতে হবে।

৭ মে দৈনিক আমাদের অর্থনীতি পত্রিকার নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি ও ভারতের ত্রিপুরার দৈনিক আজকের ফরিয়াদ পত্রিকার ঢাকা প্রতিনিধি মনজুর আহমেদ অনিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহী ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৩৬ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র সন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মঞ্জুর আহমেদ অনিক সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলি দক্ষিণ আইলপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

অনিকের পরিবার জানায়, রাতে হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হলে তাকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া বালুরমাঠস্থ ইসলাম হার্ট সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

৮ মে বেলা ১১ টায় সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলিস্থ ভোকেশনাল ইন্সটিটিউট স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে তার নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় তার সহকর্মীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেয়। পরে পাঠানটুলি কবরস্থানে সাংবাদিক অনিকের মরদেহ দাফন করা হয়।

মনজুর আহমেদ অনিক ‘ইন্ডিয়ান মিডিয়া করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ’ (ইমক্যাব) এর নির্বাহী কমিটির নব-নির্বাচিত সদস্য এবং ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট ফোরামের অর্থ সচিব ছিলেন।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও