স্মৃতি ধরে রাখতেই না.গঞ্জে বঙ্গবন্ধু সড়ক

এস এম শহিদুল্লাহ (লেখক ও গবেষক) : || ১১:৫২ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০২১ শনিবার

স্মৃতি ধরে রাখতেই না.গঞ্জে বঙ্গবন্ধু সড়ক

বর্তমান ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের চাষাঢ়া মোড় হতে দক্ষিণে নিতাইগঞ্জ মোড় পর্যন্ত সড়কটির নাম বঙ্গবন্ধু সড়ক। এটি নারায়ণগঞ্জের প্রাণকেন্দ্রও বটে।

(ক) ১৯২২ সালের দিকে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ইংরেজ মি. জে এ ডেলিসলির নামে চাষাঢ়া মোড় হতে দক্ষিণে দুই নম্বর গেট পর্যন্ত রোডটির নাম ছিল ‘ডেলিসলি রোড’।

(খ) ১৯২৮-৩৮ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী আর্মেনিয়ান মি. এইচ এম সিরকোর নামে দুই নম্বর গেট হতে দক্ষিণে মন্ডলপাড়া পুল পর্যন্ত রোডটির নাম ছিল `সিরকোর রোড`।

(গ) মন্ডলপাড়া পুল হতে দক্ষিণে নিতাইগঞ্জ মোড় পর্যন্ত রোডটির নাম ছিল ‘ওয়েস্টার্ন রোড’।

উপরোক্ত তিনটি রোডকে একত্রিত করে ১৯৫৯ সালের ২৭ অক্টোবর কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উপাধি নাম দিয়ে নামকরণ কর হয় ‘কায়েদে আজম রোড’।

উল্লেখ্য যে, ১৯৫৯ সালের ২৭ অক্টোবর ছিল সৈরশাসক আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের প্রথম বার্ষিকী। সে দিনটিকে নারায়ণগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষ ‘বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকী’ আখ্যা দিয়ে পৌর এলাকার প্রায় ২৬টি রোডের নাম পরিবর্তন করে। কায়দে আজম রোডটি হলো তাদের মধ্যে একটি।

বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতির কারণে সবচেয়ে দীর্ঘদিন যে কারাবাস ভোগ করেছিলেন। সেটি ছিল ১৯৫১ সালের কারাজীবন। সে সময় গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে তিনি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে লাহোর গিয়ে রাজনৈতিক সাক্ষাত শেষে নিজ বাড়ি ফরিদপুরে কিছুদিন অবস্থান করে মুন্সীগঞ্জ ভায়া নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা গিয়ে গ্রেফতার হন। সেবারের নারায়ণগঞ্জ ভ্রমণ সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন ‘সন্ধ্যার পরে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছে রিকশা নিয়ে সোজা খান সাহেবের বাড়িতে পৌঁছলাম। জোহা সাহেব খবর পায় নাই, তার ছোট ভাই মোস্তফা সারোয়ার তখন স্কুলের ছাত্র। আমাকে জানত। তাড়াতাড়ি জোহা সাহেবকে খবর দিয়ে আনল। আমরা ভিতরের রুমে বসে চা-নাশতা খেলাম। খান সাহেবের বাড়ি ছিল আমাদের আস্তানা। ক্লান্ত হয়ে এখানে গেলেই যে কোনো কর্মীর খাবার ও থাকার ব্যবস্থা হত।’

অতঃপর সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকায় গ্রেফতার করে অন্য একটি মামলার কারণে ফরিদপুর জেলে পাঠিয়ে দেয়। আবার পুনরায় নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা এবং ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ জেলে যান শেখ মুজিব। সে সম্পর্কে তিনি যা উল্লেখ করেছেন, "ফরিদপুর জেলে ফিরে এলাম।...তারপর আরও কিছুদিন পরে সরকার থেকে হুকুম এল আমাকে ঢাকা জেলে পাঠাতে। ফরিদপুর থেকে ট্রেনে গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ থেকে জাহাজে নারায়ণগঞ্জ আসলাম এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্যাক্সিতে করে ঢাকা জেল। জেলগেট থেকে জেল হাসপাতালে।...আমি যখন ঢাকা জেলে আসলাম তখন ১৯৫১ সালের শেষের দিক হবে।...১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে সকালবেলা আমাকে জেলগেটে নিয়ে যাওয়া হল...একটু পরেই মহিউদ্দিনকেও নিয়ে আসা হয়েছে...কর্তৃপক্ষ বললেন, আপনাদের অন্য জেলে পাঠানোর হুকুম হয়েছে।...ফরিদপুর জেলে। দুজনকেই এক জেলে পাঠানো হচ্ছে। তখন নয়টা বেজে গেছে। এগারটায় নারায়ণগঞ্জ থেকে জাহাজ ছাড়ে, সেই জাহাজ আমাদেরকে ধরতে হবে। আমি দেরি করতে শুরু করলাম, কারণ তা না হলে কেউই জানবে না আমাদের কোথায় পাঠাচ্ছে!...দেরি করতে করতে দশটা বাজিয়ে দিলাম। রওয়ানা করতে আরও আধা ঘন্টা লাগিয়ে দিলাম।...আমরা পৌঁছে খবর পেলাম জাহাজ ছেড়ে চলে গেছে।...আমাদের নারায়ণগঞ্জ থানায় নিয়ে যাওয়া হল।...আমাদের পুলিশ ব্যারাকের একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। একজন চেনা লোককে থানায় দেখলাম, তাকে বললাম শামসুজ্জোহাকে খবর দিতে। খান সাহেব ওসমান আলীর বাড়ি সকলেই চিনে। এক ঘন্টার মধ্যে জোহা সাহেব, বজলুর রহমান, ও আরো অনেকে থানায় এসে হাজির। আমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। পরে আলমাস আলীও আমাদের দেখতে এসেছিল। আমি ওদের বললাম "রাতে হোটেলে খেতে যাব। কোন হোটেলে যাব বলে যান। আপনারা পূর্বেই সেই হোটেলে বসে থাকবেন। আলাপ আছে।"...আমি বললাম, "আটটা থেকে সাড়ে আটটায় আমরা পৌঁছাব।" নতুন একটা হোটেল হয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডের উপরে, হোটেলটা দোতালা।

আমি সুবেদার সাহেবকে বললাম যে, "আমাদের খাওয়া-দাওয়া দরকার, চলুন, হোটেলে খাই। সেখান থেকে জাহাজঘাটে চলে যাব।" সে রাজি হল।...দোতলায় একটা ঘরে বসার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে আমাদের খাবার বন্দোবস্ত করে রেখেছে। আমরা বসে পড়লাম। আট-দশজন কর্মী নিয়ে জোহা সাহেব বসে আছেন। আমরা আস্তে আস্তে খাওয়া-দাওয়া করলাম, আলাপ-আলোচনা করলাম। ভাসানী সাহেব, হক সাহেব ও অন্যান্য নেতাদের খবর দিতে বললাম। খবরের কাগজে দিতে পার চেষ্টা করবে। বললাম, সাপ্তাহিক ইত্তেফাক তো আছেই। আমরা আগামীকাল থেকে আমরণ অনশন শুরু করব, সে কথাও বললাম, যদিও তারা পূর্বেই খবর পেয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ কর্মীদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার কথা কোনো কর্মী ভুলতে পারে না। তারা আমাকে বলল, "২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে নারায়ণগঞ্জে পূর্ণ হরতাল হবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি তো আছেই, আপনার মুক্তির দাবিও আমরা করব।...রাত এগারটায় আমরা স্টেশনে আসলাম। জাহাজ ঘাটেই ছিল, আমরা উঠে পড়লাম। জাহাজ না ছাড়া পর্যন্ত সহকর্মীরা অপেক্ষা করল। রাত একটার সময় সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।..." (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)

বঙ্গবন্ধুর এমন অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে নারায়ণগঞ্জকে ঘিরে। তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য কায়দে আজম রোডটিকে স্বাধীনতার পর নতুন নামকরণ করা হয় `বঙ্গবন্ধু সড়ক`।

এদিকে নগরবাসীর বেশ কয়েকজন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জানান, চাষাঢ়া হতে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত যে সড়কটি তার কোথাও বঙ্গবন্ধুর কোন ধরনের নিদর্শন নাই। অথচ এ সড়কের নাম বঙ্গবন্ধু সড়ক।

তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থী আবদুর রহমান জানান, এ জেলা থেকেই আওয়ামী লীগের জন্ম। অনেক আন্দোলনের সুতিকাঘার এ নারায়ণগঞ্জ। ভাষা আন্দোলনের পর মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে অনেকবার বঙ্গবন্ধু নারায়ণগঞ্জ এসেছিলেন। কিন্তু তাঁকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে মনে রাখার জন্য শহরে নেই কোন নিদর্শন।

সিটি করপোরেশনে টানা তিনবারের মত মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। তাছাড়া রয়েছেন শামীম ওসমানের মত এমপি। কিন্তু তার পরেও বঙ্গবন্ধু সড়কে বঙ্গবন্ধুর কোন প্রতিকৃতি না থাকা বেশ দুঃখজনক।

একজন চাকরিজীবী মনে করেন, বঙ্গবন্ধু সড়কের চাষাঢ়ার অংশে ও নিতাইগঞ্জের অংশের শুরুতে বা মন্ডলপাড়াতে পৃথকভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি স্থাপন করা প্রয়োজন। তাহলেই বঙ্গবন্ধু সড়কের প্রতি পূর্ণাঙ্গ যথার্থতা আসবে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও