একুশে আগস্টে আহত হয়েছিলেন বন্দরের আশরাফ

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৫৮ পিএম, ২০ আগস্ট ২০২১ শুক্রবার

একুশে আগস্টে আহত হয়েছিলেন বন্দরের আশরাফ

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে সেই বিষ্ফোরণে আহতরা। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তারা। বছরে পর বছর দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন অনেকেই। তেমনই একজন বন্দরের কলাগাছিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য আশরাফউদ্দিন। তার দাবী, গ্রেনেড হামলায় তার বাম পা স্প্লিন্টারের আঘাতে জখম হয়েছিলো। অত্যন্ত সহজ সরল বিধায় আহত হবার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য কারও যাননি এবং কিছু পাওয়ার আশায় দুয়ারে দুয়ারেও ঘুরেননি।

আশরাফ উদ্দিনের বাড়ি ইউনিয়নের কল্যান্দি এলাকায়। রেললাইন থেকে নামতেই হাতের বা দিকে তার বাড়ি। পেশায় একজন ইলেক্ট্রিশিয়ান। দুই ছেলে এক মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। আশেপাশের সকলেই জানে, আশরাফ গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন। বন্দরের বেশ কিছু নেতাকর্মীরাও জানে তার কথা। কিন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা কিংবা জাতীয় পর্যায়ে নেই তার নাম। ফলে বছরের পর বছর অবহেলিত থেকে যান তিনি। যদিও এনিয়ে তার কোন আক্ষেপ নেই। নেই কোন বাড়তি চাওয়া।

স্থানীয়দের মাধ্যমে খোঁজ খবর নিয়ে পাওয়া গেলো তাকে। একুশে আগস্টে আহত হয়ে বেঁচে থাকা এই আওয়ামী লীগ হাসিমুখে বরণ করে নিলেন প্রতিবেদককে। দীর্ঘদিন পরে তার গল্প কেউ শুনতে এসেছে তাতেই বেশ খুশি তিনি। ঘটনার বিবরণ দিয়ে খুলতে শুরু করেন তার অভিজ্ঞতার ঝুলি।

একুশে আগস্টের অভিজ্ঞতা : ‘সারাদেশে জেএমবি’র অব্যহত বোমা হামলার প্রতিবাদে সন্ত্রাস বিরোধী সভার আয়োজন করেছিলো তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। সেসময় বন্দর থেকে আমি, টিংকু এবং শাহী মসজিদ এলাকা থেকে আরেকজন সেই সমাবেশে গেলাম। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে পৌঁছে দেখি বড় বড় কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন, যেমন আমির হোসেন আমু, রাজ্জাক সাহেব, তোফায়েল আহমেদ সাহেব। আমি এক কোনায় দাঁড়িয়ে শুনতাছিলাম। ট্রাকের ২০/২৫ গজ দূরে আমি একটা ভবন সাইডে দাঁড়িয়ে সমাবেশ দেখছিলাম। এক পর্যায়ে দেখি আমার সাথে ২ জন আশেপাশে নেই। পরে জেনেছি তারা বাইরে গেছিলো খাওয়া দাওয়া করতে।

নেত্রী তখন ট্রাকে ভাষণ দিতাছিলো, উনার বক্তব্য প্রায় শেষ। উনি জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলে ফেলেছেন। এর পরপরেই বিকট শব্দে গ্রেনেড ফুটলো। তখনতো বুঝিনাই কি হইসে। আতঙ্কে দাঁড়াইয়া নেত্রীরে দেখতাছিলাম। তারপরে আরেকটা বিস্ফোরণ হইলো। আমি সাথে সাথে শুইয়া পরলাম। মানুষ সব দৌড়ায়া এদিক ওইদিক যাইতাছে। আমি আহত অবস্থায় গড়াতে গড়াতে স্টেডিয়ামের সামনে গিয়া পইরা রইলাম। আর কি হইসে আমার খেয়াল নাই। হটাৎ একটা লোক দোকান থেকে আমার দিকে আগায়া আইসা জিগাইলো আমার বাড়ি কই? আমি কইলাম আমার বাড়ি বন্দরে। উনি আমারে রিক্সা কইরা সদরঘাটের দিকে ন্যাশনাল হাসপাতাল নামে একটা হাসপাতালে নিয়া গেলো।

হাসপাতালে গিয়া দেখি মানুষ আর মানুষ। সবাই এইদিক ওইদিক পইরা আছি কেউ আসেনা আমাগো কাছে। পরে সাংবাদিকরা ডাক্তারগো গিয়া কইতাছে এদের কেন চিকিৎসা দিতাছেন না? এগুলা বলার পরে ডাক্তার আইসা আমাগো ধরছে। তারা কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা আর আমার পায়ে ব্যান্ডেজ কইরা পাঠায়া দিলো। যেই ছেলেটা আমাকে নিয়ে আসছে সে আমার পাশে থাইকা রিকশায় কইরা নারায়ণগঞ্জের বাসে উঠায়া দিসে।

রাত ১০/১১ টার নারায়ণগঞ্জ আসলাম। আমি ভয়ে বাসায় ঢুকতাছিলাম না, বাসায় সবাই কান্দাকাটি। সবাই তো ভয়ে শেষ, কারণ সবাই জানে আমি ঐখানে গেসি। বাসায় আসার ২/৩ দিন পরে বন্দরের বহু নেতাকর্মীরা আসলো আমারে দেখতে। এস এম আকরাম সাহেব আসলো আমারে দেখতে। তারপর আমারে টাকা পয়সা দিয়া চিকিৎসা করাইতে পাঠাইলো। আমার পায়ে এক্সরে কইরা ১২টা স্প্রিন্টার পাইলো। কিছু বাইর করলো আর ৩ টা বাইর করতে পারে নাই। কইসে এগুলা বাইর করতে সমস্যা, বাইর না করলেও কিছু হইবো না। এতদিন পরে কেন প্রকাশ করলেন তা জানতে চাইলে বলেন, আমাকে বড় বড় নেতাদের কাছে কেউই নিয়ে যায়নাই। কার কাছে কিভাবে বলবো তাও জানিনা। আর আমি রাজনীতি করছি বঙ্গবন্ধুর জন্য, অনেকে টাকা চায়, বাড়ি চায়। আমার তো এগুলা দরকার ছিলো না। তাই এতদিন বলিনাই। কিন্তু এলাকার মানুষ সবাই আমার কথা জানে। বিএনপির মানুষরাও আমারে সম্মান করে। বহু বছর নতুন নেতৃত্ব আসে, আমার কথা কেউ স্বরণ করেনা। আমি সদস্য ছিলাম, এখনও সদস্য আছি।

তিনি বলেন, আমি একদিন আনোয়ার চেয়ারম্যান সাহেবকে বলেছিলাম, খোকন সাহা দাদাকে বলেছিলাম। তারা শুনে আর কিছু বলেনি। আমার হতাশ লাগে যখন অলিগলিতে আওয়ামী লীগ দেখি, এরা দলটারে নষ্ট করে ফেলছে। আমাদের সময় আমরা যারা জীবন ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করছি তাদের কথা কেউ স্মরণ করে না। তারপরেও আমি জাতির পিতার আদর্শের সৈনিক ছিলাম, আজীবন থাকবো।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও