‘বাবা আত্মহত্যা করতে পারে না’

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:০০ পিএম, ২৫ আগস্ট ২০২১ বুধবার

‘বাবা আত্মহত্যা করতে পারে না’

লেবু মিয়ার বাড়ি কোনটা? ইসদাইরের রাবেয়া হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলো দক্ষিন দিকে শান্তা গার্মেন্টের গলি। গলিধরে কিছুদূর এগোলেও একটি ৩ তালা বাড়ির নিচতালায় ভাড়া লেবু মিয়ার পরিবার। প্রবেশ পথেই দেখা মিললো বিশাল ডেকচিতে চলছে রান্নার কাজ। আগুনের তাপ সরিয়ে ঘরের সামনে দাঁড়াতেই এগিয়ে এলো লেবু মিয়ার ছোট ছেলে। প্রতিবেদকের পরিচয় জেনে ঘামে ভেজা মুখ মুছে নিয়ে ভেতরে আসতে অনুরোধ করেন তিনি। বাড়িতে চলছে কুলখানীর আয়োজন।

জানা গেল, লেবু মিয়ার ছোট ছেলের নাম মনির হোসেন। বর্তমানে তিনি একাই এই পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কাজ করেন একটি গার্মেন্টসে। কিছুদিন পূর্বে বিয়ে করলেও স্ত্রীকে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাবার বাড়িতে। এক ছুটির দিনে লেবু মিয়া (৬৩) ট্রেনে কাঁটা পরে প্রাণ হারানোয় পুরো পরিবারের দায়িত্ব হঠাৎ করেই মনিরের উপর চেপে বসলো। হতবিহবল মনির হোসেন এখনও জানেন না কিভাবে এত বড় দায়িত্ব সামলে উঠবেন তিনি।

মনির বলেন, আমার বাবা কোনভাবেই আত্মহত্যা করতে পারেন না। উনি তার গায়ে সামান্য ব্যাথা লাগতে দেন না। ঘটনার দিনেও তিনি গায়ে পারফিউম দিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছেন। সকালে বের হবার আগে আমার মা’কে বলে দিয়েছেন তার কাপড়গুলো যেন ধুয়ে রাখা হয়। এমন একটা মানুষ কিভাবে আত্মহত্যা করে? উনি এমন কোন মানুষ না বা তার সাথে এমন কিছু হয়নি যে তার আত্মহত্যা করতে হবে। তবে গত ২ সপ্তাহ ধরে তিনি মানসিকভাবে একটু অন্যরকম হয়ে ছিলেন। মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না তিনি।

স্কুলের নিরাপত্তা কর্মী থেকে চাকরিচ্যুত হবার পর কি হয়েছিলো তার সাথে তা জানতে চাইলে মনির জানায়, করোনার কারণে স্কুল থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তাও প্রায় ১ বছর হয়ে গেছে। এরপর তিনি আমাদের এলাকায় নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব নেন। ঘটনার আগেরদিনেও আমার বাবা ডিউটি করে এসেছিলো। সকালে তিনি যেখানে কাজ করেন সেখান থেকে ৫০০টাকা ধার নিয়ে এসে আমার মায়ের হাতে ৪০০টাকা দেয় বাজার করার জন্য। তিনি নিজে ১০০টাকা রেখে দেন। তার ব্যবহৃত মোবাইলটি চার্জে বসিয়ে বেরিয়ে যান। আমাদের বলে যান, নামাজের পরে ফিরে আসবেন তিনি।

এরপর দুপুর ৩টা বাজলে দেখি তার কোন খোঁজ নেই। রাত ৮টা বাজে আমি আমার বড় ভাইকে ফোন দিয়ে জানাই। সে আশ্বাস দেয় বাবা ফিরে আসবে। ১১টা বাজেও ফিরেনা। দেড়টা পর্যন্ত এভাবেই খোঁজ নিতে থাকি। পরদিন সকালে আমি কাজে ফিরে যাই। দুপুরের দিকে আমার ভাই জানায় বাবা ঢাকা মেডিকেলে অসুস্থ অবস্থায় আছে। বিকেলে হাসপাতালে গিয়ে দেখি বাবা আর নেই। ঘটনার দিন রাত থেকে বিকেল পর্যন্ত আমরা কেউই ট্রেনে কাটা পড়ার কথা শুনিনি।

কান্না জড়িত কন্ঠে লেবু মিয়ার স্ত্রী বললেন, আমার স্বামীকে আমি ভালো মত চিনি। এই লোকটা নিজের হাতেও একটা সামান্য আঘাত লাগতে দিতো না। নিজেকে সুস্থ রাখতে খুবই ব্যস্ত থাকতো সে। এই লোক নিজে আত্মহত্যা করবে আমি অন্তত তা বিশ্বাস করিনা। আমার ৪টা ছেলে মেয়েও কোনদিন বিশ্বাস করবে না। ওরা ওর বাবাকে ভালোমত চিনে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, লেবু মিয়া বেশ ভালো ও মিশুক মানুষ ছিলেন। স্কুলে চাকরি করার কারণে সকলেই তাকে চিনে। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্থানীয়দের মাঝে। ট্রেন চালু হবার দ্বিতীয় দিনেই লেবু মিয়া কাঁটা পরে মারা যাবেন তা বিশ্বাসও করতে পারছেন না অনেকে।

স্থানীয় রাবেয়া হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, লেবু মিয়া বেশ ভালো মানুষ ছিলেন। তবে উনার রাগ ছিলো বেশী। শুনেছি শেষ যেখানে কাজ করতো সেখানে নাকি রাগারাগি করে এসেছিলো। আমি এমনিতেও তাকে আগে থেকে সহায়তা করতাম। যদি তার পরিবারের কোন সহযোগীতা প্রয়োজন হয় তাহলে অবশ্যই তার পাশে থাকবো আমরা।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও