খাজা মহিউদ্দিনকে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু : ‘ভেব না, তুমি পাশ করবা’

এস এম শহিদুল্লাহ (লেখক ও গবেষক) : || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩৮ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ শুক্রবার

খাজা মহিউদ্দিনকে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু : ‘ভেব না, তুমি পাশ করবা’

১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে দশটায় ঢাকার বাড্ডায় প্রিমিয়ার প্লাজায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খাজা মহিউদ্দিন।

সংগঠক হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু খাজা মহিউদ্দিনের কথা বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছেন।

জুন মাসের উল্লেখযোগ্য দিক হলো ছয় দফা দিবস। যে ছয় দফাকে বলা হয়ে থাকে বাঙালির মুক্তির সনদ। যেখানে স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল।

আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালের ২০ মে কার্যকরী কমিটির সভায় ৭ জুন মঙ্গলবার, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালনের আহবান জানায়। সে আহবানে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা বিপুলভাবে সাড়া দেয়। বিশেষ করে ৭ জুন হরতালের দিন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা জড়িয়ে পড়ে। ৭ জুন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও তেজগাঁয় পুলিশের গুলিতে ১১ জন নিহত ও অগণিত মানুষ আহত হন। ছয় দফা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হন এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা সারোয়ার ও খাজা মহিউদ্দিন। সে সময় মোস্তফা সারোয়ার ছিলেন নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং খাজা মহিউদ্দিন ছিলেন ঢাকা ছাত্র লীগের সভাপতি। তখন নারায়ণগঞ্জ মহকুমা ছিল ঢাকা জেলার অন্তর্গত। এ দুজন নেতা সম্পর্কে জেলে বন্ধী অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিছু লেখেন যা ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে।

খাজা মহিউদ্দিন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু যা লিখেছেন-

২৫ জুন ১৯৬৬ শনিবার সন্ধ্যায় দেখলাম পুরানা বিশ সেলে নারায়ণগঞ্জের খাজা মহীউদ্দিনকে নিয়ে এসেছে। ওর বিরুদ্ধে অনেকগুলি মামলা দিয়েছে। ডিভিশন দেয় নাই। ভীষণ মশা, পরশু পরীক্ষা, মশারিও নাই। তাড়াতাড়ি একটা মশারির বন্দোবস্ত করে ওকে পাঠিয়ে দিলাম। আমার কাছাকাছি যখন এসে গেছে একটা কিছু বন্দোবস্ত করা যাবে। বেশি কষ্ট হবে না। খাজা মহিউদ্দিন খুব শক্তিশালী ও সাহসী কর্মী দেখলাম। একটুও ভয় পায় নাই। বুকে বল আছে। যদি দেশের কাজ করে যায় তবে এ ছেলে একদিন নামকরা নেতা হবে, এ সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নাই। ত্যাগ করার যখন প্রাণ আছে, আদর্শ যখন ঠিক আছে, বুকে যখন সাহস আছে একদিন তার প্রাপ্য দেশবাসী দেবেই।

২৬ জুন ১৯৬৬ রবিবার

ভোর রাত্র থেকেই মাথা ভার ভার লাগছিল। বিছানা ছাড়তেই মাথার ব্যথা বেড়ে গেল। আমার মাথায় যন্ত্রনা হলে অসহ্য হয়ে উঠে। অনেকক্ষণ বাইরে বসে রইলাম, চা খেলাম, কিছুতেই কমছিল না। ওষুধ আমার কাছে আছে, ‘স্যারিডন’, কিন্তু সহজে খেতে চাই না। আবার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুলে বেশি লাগে তাই অনেকক্ষণ বাইরে যেয়ে হাটতে লাগলাম। বাতাসে ভালই লাগছিল। ব্যাথা একটু কম লাগছিল। ব্যথা একটু কম কম লাগছিল।

ডিপুটি জেলার সাহেব চলে গেলেন। রবিবার ছুটির দিন। তবুও এঁদের ছুটি নাই, অনেক কাজ। নারায়ণগঞ্জ থেকে চটকল ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি আব্দুল মান্নানকে নিয়ে এসেছে। জামিন দেয় নাই, নারায়ণগঞ্জে মামলায় তাকে আসামি করেছে। ভদ্রলোক কাছেও ছিল না। শুনলাম নারায়ণগঞ্জে মশা কামড়াইয়া তার হাত মুখ ফুলাইছে দিয়াছে। আরও বহু লোককে গ্রেপ্তার করে নারায়ণগঞ্জ জেলে রেখেছে। অনেক ছাত্রও আছে। জামিন পায় নাই। কাপড় দেয় নাই, ডিভিশন দেয় নাই। প্রত্যেকটা লোক অর্ধেক হয়ে গেছে। তিন শতের উপর লোককে আসামি করেছে। যাকেই পেয়েছে গ্রেপ্তার করে জেলে দিতেছে।

খাজা মহীউদ্দিন পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে। আর একটা ছেলে-মিলকী তাকে অনুমতি দেওয়া হয় নাই। জেল কর্তৃপক্ষ ঢাকার এসডিওকে জানাইয়াছিল। তিনি বলেছিলেন, ডিসি সাহেবের সাথে পরামর্শ করে জানাবেন। আগামীকাল সকালে পরীক্ষা শুরু হবে। কোনো খবর এসিডও সাহেব দেন নাই। বোধহয় ঢাকার ডিসি সাহেব গভর্নর সাহেবের অতি প্রিয় লোক। অনুমতি দেন নাই। খুব মুখ কালো করে দাড়িয়েছিল ছেলেটা। একটা বৎসর নষ্ট হয়ে গেল। ফিস দিয়েছে, সকাল কিছু প্রস্তুত, কিন্তু পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেয় নাই।

পুরানা ২০ সেলে তাকে বললাম দূর থেকে, ‘ভেব না ভাই। আমাকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাহির করে দিয়েছিল। যারা বাহির করে দিয়েছেন তাঁদের অনেকেই আমার কাছে এসেছিলেন। ক্ষমা করে দিয়েছিলাম-পরে শোধ নিতে পারতাম, নেই নাই। খোদার উপর নির্ভর করো’। খাজা মহীউদ্দিন যে কি খেয়ে পরীক্ষা দিবে তাই ভাবলাম। ডিপুটি জেলার সাহেবকে বললাম, একটু খেয়াল রাখবেন ছেলেটার দিকে। আমার কাছে তো কিছু কিছু জিনিস আছে কিন্তু দেবার তো হুকুম নাই। তবুও ভাবলাম, বেআইনি হলেও আমাকে কিছু দিতে হবে। দেখা হয়েছিল। আমার সেলের কাছ দিয়ে যেতে হয়। আমি এগিয়ে যেয়ে ওকে আদর করে বললাম, ‘ভেব না, তুমি পাশ করবা। মাথা ঠান্ডা করে লেখবা’। [উল্লেখ্য যে, খাজা মহিউদ্দিন জেলবন্দী অবস্থায় পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাস করেছিলেন।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও