নারায়ণগঞ্জে জ্বর সর্দিকাশির প্রাদুর্ভাব : ডাক্তারদের সতর্কবাণী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩৭ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ বুধবার

নারায়ণগঞ্জে জ্বর সর্দিকাশির প্রাদুর্ভাব : ডাক্তারদের সতর্কবাণী

ঘরে ঘরে চলছে জ্বর সর্দিকাশি। ঘরে একজনের সর্দি-কাশি হলে বাকীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। এ কারণে ডাক্তাররা সাবধানবাণী উচ্চারণ করলেন। বলেছেন, এমনিতেই কোভিড আমাদের ঘাড়ের উপর চেপে বসে আছে। সিজন পরিবর্তনের জন্য এমনটা হলেও সতর্ক থাকতে সকলকে। কেননা, সর্দি-জ্বর মনে করে অবহেলাতে করোনা আক্রমন করে বসতে পারে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার থেকে টানা জ্বরে ভুগলেন নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শরীফউদ্দিন সবুজ। জ্বরের গতি বাড়ছিল। ঝুঁকি না নিয়ে করোনা টেস্ট করালেন ১৯ সেপ্টেম্বর। পরদিন রেজাল্ট দেখে স্বস্তি। রেজাল্ট ছিল নেগেটিভ।

শরীফউদ্দিন সবুজ বললেন, এখন ঘরে ঘরেই জ্বর-কাশি হচ্ছে। আমারও সাধারণ জ্বর হয়েছিল। তবে দু’দিন পরে জ্বরটা বেড়ে গিয়েছিল। ভয় পেয়ে যাওয়ার মতই ঘটনা। তাই করোনা টেস্ট করিয়ে নিয়েছি। ফলাফল এসেছে নেগেটিভ। তবে জ্বরটায় শরীর কাহিল করে ফেলেছে। ডাক্তারদের পরামর্শ মেনে চললে কোন সমস্যা হয় না। আমি এখন সুস্থ।

এদিকে সর্দি-কাশি সম্পর্কে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডাঃ মোঃ আসাদুজ্জামান নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, এখন সিজন পরিবর্তন হচ্ছে। এ সময়টায় সর্দি-কাশি হয়। তবুও সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। কেননা আমাদের ঘাড়ের উপর চেপে আছে করোনা। তাই সর্দি-জ্বরকে অবহেলা করা যাবেনা। ঘরে একজনের সর্দি-কাশি হলে বাকিদের সাবধানে থাকাটাই শ্রেয়। আক্রান্ত ব্যক্তি একটু আলাদা থাকলেই বাকিরা নিরাপদে থাকবেন। ঘরেও মাস্ক ব্যবহার করতে পারলে সবচেয়ে ভাল হবে। এই সর্দি-জ্বরে শরীরও ব্যাথা করবে। আমাদের এ কারনে সতর্ক থাকতে হবে-যাতে করে করোনায় আক্রান্ত না হয়। সর্দি-জ্বরের সাথে যে করোনা আক্রমন করে বসবেনা তারতো কোন নিশ্চয়তা নেই। কাজেই সাবধান থাকাই ভাল।

জানাগেছে, করোনাকালে এমন ফ্লুজনিত সমস্যায় বেড়েছে আতঙ্ক। তবে জ্বর নিয়ে ভীতি থাকলেও করোনা পরীক্ষায় আগ্রহ নেই রোগী বা স্বজনদের। ফলে গত কয়েক দিনের তুলনায় করোনা পরীক্ষার নমুনাও কমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর-কাশি ফ্লুজনিত রোগে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কিন্তু চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হয়ে অনেকেই ফার্মেসিতে ভিড় করছেন। অনভিজ্ঞ ফার্মাসিস্টের দেয়া ওষুধে পড়ছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে জ্বর-কাশিজনিত ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ফ্লুজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে হাসপাতালের বহির্বিভাগেও।

গত এক সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে কমপক্ষে ৬০ জন জ্বর-সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সরকারি দুই হাসপাতাল ছাড়াও গত কয়েক দিন নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের প্রাইভেট চেম্বারে ফ্লুজনিত রোগীর ভিড় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে সর্দি-জ্বরজনিত রোগীও বেড়েছে হাসপাতালে।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শহরের বিভিন্ন এলাকাতে সর্দি-কাশি দেখা দিয়েছে। দেওভোগ পানির ট্যাংকী এলাকার বাসিন্দা মো: জামিল জানান, এমনিতেই গরম বেড়েছে। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘুমোতে পারিনা। তার উপর ভুগছি সর্দি-জ্বরে। কি যে যন্ত্রণা। বলার মত নয়। ব্যবসা করি ফুটপাতে। সারাক্ষণ ধুলোবালি ঢোকে নাকেমুখে। তাই জ্বর সারছেনা। গলা ব্যাথা নেই। সতর্ক আছি। জ্বর যদি বেড়ে যায় অবশ্যই করোনা টেস্ট করাবো। দিনে প্রচন্ড গরম। বৃষ্টি হলে রাতে ঠান্ডা। তাপমাত্রার এ তারতম্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না শরীর। তাতেই গড়বড় করছে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি। সেই ফাঁকে হামলা চালাচ্ছে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া। এর ফলে নারায়ণগঞ্জে ঘরে ঘরে মানুষজন সর্দি-কাশি-জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, এসময়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য যে জ্বর আসে তাতে সাধারণভাবে সবার আগে সর্দি হয়। নাক দিয়ে পানি পড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। করোনা আক্রান্তদের ক্ষেত্রে খুব কমই নাক দিয়ে পানি পড়ার লক্ষণ দেখা গেছে। তাই সর্দি থাকলে সাধারণ জ্বর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে যেকোনো জ্বরে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

তারা আরও বলছেন, বর্তমানে ভাইরাল জ্বর একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তবে কোন ধরনের ভাইরাস দ্বারা কোন জ্বর হচ্ছে তা শনাক্ত করা জরুরি। সাধারণ ফ্লুর মতো এসব ভাইরাল রোগের লক্ষণ দেখা দিলেও জটিলতার আশঙ্কা বেশি থাকে। সতর্ক থাকলে এসবের জটিলতা এড়ানো সম্ভব। তবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ও লিভারের অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তিসহ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের জন্য এসব জ্বর ঝুঁকিপূর্ণ।

মহানগরের পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আমজাদ হোসেন মিলন জানান, ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত হয়ে একে একে ঘরের পাঁচজনই অসুস্থ। এ জ্বর যার হচ্ছে সে শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল হয়ে পড়ছে। নিতাইগঞ্জের ডালপট্টি এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা বলেন, হঠাৎ সীমাহীন জ্বর। পরীক্ষা করে দেখা গেছে করোনা নেই। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন ভাইরাল জ্বর।

সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম জানান, ডেমরার মাতুয়াইলে শিশু মাতৃসদনে শিশুরোগীদের ভিড় বেশি। সেখানে তিনি গিয়েছিলেন ছেলের ঘরের নাতিকে নিয়ে। মাতুয়াইলে শিশু মাতৃসদনের একজন চিকিৎসক তাকে জানান, সাবধান থাকবেন। আমাদের হাসপাতালেও আসা শিশুদের মধ্যে জ্বরের রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। হঠাৎ অত্যাধিক গরম ও মাঝে মধ্যে বৃষ্টি। এ গরম ঠান্ডায় ভাইরাল জ্বর হচ্ছে। প্রথমে কাশি দিয়ে শুরু হয় পরে জ্বর। আবার অনেকের কাশি থাকে না। একজনের হওয়ার পর ঘরের সবার হচ্ছে।

শহরের বাইরে অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও একই অবস্থা চলছে। আমাদের সংবাদদাতারা সে খবর নিশ্চিত করেছেন। আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. আশ্রাফুল আমিন বলেন, বলতে গেলে প্রতিঘরেই জ্বরের রোগী আছে। প্রথমে একজনের শুরু হচ্ছে তারপর এক এক করে সব ফ্যামিলি মেম্বার জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, সর্দি, কাশিও আছে অনেকের। তবে ম্যাক্সিমামই সাধারণ প্যারাসিটামল, সর্দি কাশির ওষুধে সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। তাই বলে কোনো জ্বরকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে জ্বরের অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে, যেমন সাধারণ ফ্লু/ভাইরাল ফিভার/করোনা/ডেঙ্গু ইত্যাদি। তাই জ্বর হলে বাড়িতে বসে না থেকে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডেঙ্গু বা করোনা ভাইরাসের ইনফেকশন নেই সেটা নিশ্চিত হতে হবে। কারণ করোনা যদি হয়েই থাকে তাহলে জ্বর হবার তিন থেকে পাঁচদিনের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে সুস্থতার চান্স অনেকাংশে বেড়ে যায়। সুতরাং বর্তমানে কোনো জ্বরকেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।


বিভাগ : স্বাস্থ্য


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও