ভুল রিপোর্টে অপারেশন

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:০৩ পিএম, ৭ জানুয়ারি ২০২১ বৃহস্পতিবার

ভুল রিপোর্টে অপারেশন

একতা মেডিকেল সার্ভিসেস এর রিপোর্ট ছিল ‘অ্যাপেন্ডিসাইটিস’। অপারেশন থিয়েটারে রোগীর পেট কেটে ডাক্তার হতভম্ব। অ্যাপেন্ডিসাইটিস নয়। অন্য সমস্যা। ‘সিকাম’ ফুটো। সেখানে বড় ছিদ্র। তাই ময়লা বের হয়ে এসে পেট ভরে গেছে। ডাক্তার ময়লা পরিস্কার করে সিকাম রিপিয়ার করে দেয় এবং ড্রেন করে দেয়। আধাঘণ্টার অপারেশন শেষ হয় ৪ ঘণ্টায়। কিন্তু মূল সমস্যা রয়েই যায়।

রোগীর মূল সমস্যা কি জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের সার্জারী ডাক্তার মো. নাজমুল হোসেন (বিপুল) বলেন, নাবিয়া বেগমের মূল সমস্যা হচ্ছে তার পেটের ভেতরে টিবি বা ক্যান্সার রয়েছে। আরো সহজ করে বললে দাঁড়ায় গ্রোথ বা টিউমার জাতীয় কিছু। এই টিউমার ফেলতে পুনরায় রোগীকে অপারেশন জরুরী। দ্বিতীয় দফা অপারেশনটা হবে মেজর অপারেশন। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নাবিয়া বেগমকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সেরে উঠলে (পেটের ক্ষত শুকালে) কিভাবে দ্বিতীয় অপারেশন করাবেন তা জানেনা নাবিয়া বেগমের পরিবার।

এদিকে এতবড় অন্যায় করেও দম্ভ কমেনি একতা কর্তৃপক্ষের। ৬ জানুয়ারী সকালে মন্ডলপাড়ায় অবস্থিত একতা মেডিকেল সার্ভিসেস এ গেলে কাউন্টারে বসা এক যুবক নিজেকে ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আপনি রোগী ও রিপোর্ট সাথে করে নিয়ে আসেন। তাহলে কর্তৃপক্ষ আপনার অভিযোগ শুনবে। এর কোন বিকল্প নেই। আপনি সিভিল সার্জনের কাছে গেলেও লাভ হবে না। সব ম্যানেজ করেই ব্যবসা করতে হয়। আপনি আমার একটি কার্ড নিয়ে যান।’

নাম জ্ঞিজ্ঞাসা করতে যুবকটি জানালো তার নাম মো. রাকিব। এই প্রতিবেদক সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় ওই যুবক আরো বললো, ‘অবশ্যই রোগী ও রিপোর্ট সাথে আনবেন। নইলে কেউ আপনার কথা শুনবে না। মালিক পক্ষ খুবই শক্তিশালী।’ এ সময় কাউন্টারে একজন রিক্সাচালক অভিযোগের সুরে ও রাগান্বিত কন্ঠে বলেন, ভাই বউয়ের মিনস না কি বন্ধ। সেই রিপোর্ট করতে কেন ১৬শ টাকা রাখা হল। ম্যানেজাররূপী ওই যুবক (মোঃ রাকিব) খেকিয়ে উঠে বলে, ‘যাও মিয়া। আইছো কেন ?

একতা মেডিকেল সার্ভিসেস এর ভুল রিপোর্টে এক দরিদ্র গৃহবধূ এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে। একটি ভুল রিপোর্ট তার জীবনকে করে তুলেছে অভিশপ্তময় ও দুর্বিষহ। এখন দ্বিতীয়বার তার পেটে অপারেশন করতে হবে। নইলে তিনি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবেন বলে আশঙ্কা চিকিৎসকদের। দ্বিতীয় দফা অপারেশনটি হবে মেজর অপারেশন।

ভুক্তভোগী রোগীর নাম নাবিয়া বেগম (৪৫) হলেও একতা কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রেও একটা সুক্ষ্ম চালাকির আশ্রয় নিয়েছে। একতা তাদের রিপোর্টে রোগীর নাম লিখেছে রুবিয়া। এই কাজটি তারা ইচ্ছে করেই থাকে। যাতে রিপোর্ট নিয়ে কোন সমস্যা হলে তারা ফেসে না যায়। গরীব মানুষরা রিপোর্টে ইংরেজীতে লেখা নাম নিয়ে এত মাথাও ঘামায় না। তেমনটাই ঘটেছে নাবিয়া বেগমের ক্ষেত্রে।

একতা মেডিকেল সার্ভিসেস এর ভুল রিপোর্টের কথা স্বীকার করে ডা. মো. নাজমুল হোসেন বিপুল জানান, ওরা (একতা মেডিকেল সার্ভিসেস) রিপোর্টে অ্যাপেন্ডিসাইটিস এর কথা উল্লেখ করলেও তা অ্যাপেন্ডিসাইটিস ছিল না। একতা’র রিপোর্ট মোতাবেক অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের আয়োজন করা হয়। ওটিতে শরীর অবশ করে পেট কাটার পর দেখা যায় সমস্যা অ্যাপেন্ডিসাইটিস নয়। সিকাম ফুটো। ময়লা বেরিয়ে এসে পেট ভরে গেছে। তাৎক্ষনিকভাবে ওই মহিলার মেয়ে সিমুকে ভেতরে ডেকে নিয়ে জানানো হয় যে, তার মায়ের অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয় নাই। তখন মেয়ে বলে আমি কি জানি। মেয়েকে জানিয়ে আমরা সিকামের ফুটো রিপিয়ার করে ড্রেন করে দেই। মুক্তি জেনারেল হাসপাতালে ১০ দিন চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু রোগীর লোকজন চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারছিলেন না। পরে সেখান থেকে ঢামেক হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, পেটের ব্যথা নিয়ে গত ২১ ডিসেম্বর দেওভোগের নাবিয়া বেগম প্রথমে চিকিৎসার জন্য যান নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে জরুরী বিভাগের ডাক্তার দিপাঞ্জন ধর তাকে দেখে টেস্ট করাতে একতা মেডিকেল সার্ভিসেস এ পাঠায়। সেখানে একদিনেই রক্ত, প্র¯্রাব ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে দেয়া হয়। একতা বিকেল নাগাদ দুটি পরীক্ষা করে বলে দেয় এখানে আজকে আর আল্ট্রাসনোগ্রাম হবে না। পরের দিন সকালে আসতে হবে।

এদিকে ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন ওই দিনই পরীক্ষা করাতে। রাতে আর অন্য কোথাও তা সম্ভবও হয়নি। পরদিন ২২ ডিসেম্বর সকালে একঘণ্টা দেরি করিয়ে একতা আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয় যে, রোগীর অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে। রিপোর্ট দেখে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক ডা. গোলাম মোস্তফা ইমন বলেন, দ্রুত অপারেশন করাতে হবে। রোগীর পরিচিত এক মহিলা তাকে পরামর্শ দেয় যে, ডা. নাজমুল হোসেন বিপুল ভাল অপারেশন করেন। গরীব রোগী হলে ছাড়ও দেন। ওই মহিলার পরামর্শে নাবিয়া বেগম ডা. নাজমুলের শরণাপন্ন হন। ২২ ডিসেম্বর দুপুর আড়াইটায় অপারেশন করা হয় চাষাঢ়ার মুক্তি জেনারেল হাসপাতালে।

সূত্রমতে, নাবিয়া বেগম সরকারি হাসপাতালের ৩ জন ডাক্তারের হাত ঘুরে মুক্তি জেনারেল হাসপাতালে যায় অপারেশন করাতে। ২২ ডিসেম্বর দুপুর আড়াইটায় অপারেশন শুরু হয়। শরীর অবশ করে পেট কাটার পরেই ধরা পরে এটা এপেন্ডিসাইটিস নয়। সিকাম ফুটো। সেই ছিদ্র দিয়ে ময়লা বেরিয়ে পেট ভরে গেছে। নাবিয়ার পেটে টিবি বা ক্যান্সার রয়েছে। যার দরুন বৃহদান্তগুলি একটার সাথে আরেকটা লাগানো ছিল। যা স্বাভাবিকভাবে থাকবে ফ্রি। নড়াচড়া করবে। বৃহদান্তগুলি নড়াচড়া না করায় সিকাম পেটের ভেতরে একপাশে চেপে গিয়ে ধীরে ধীরে ছিদ্র হয়ে গেছে। সেই ছিদ্র রিপিয়ার করে দেয়া হয়। কিন্তু মূল সমস্যা রয়ে গেছে। প্রথম অপারেশনের ক্ষত শুকানোর পর দ্বিতীয় দফা অপারেশন করে ক্যান্সার সারাতে হবে। নইলে রোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারে।

জানতে চাইলে ডা. মো. নাজমুল হোসেন বিপুল বলেন, নাবিয়া বেগমের যে সমস্যা সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তা ধরা পড়বে না। এজন্য রোগীর সিটিস্ক্যান ও কলোনস্কপি করাতে হবে। এটা একটু ব্যয়বহুল। এই পরীক্ষা ছাড়া রোগীর পেটের ভেতরের ক্যান্সারের পজিশন বোঝা যাবে না। একতা মেডিকেল সার্ভিসেস এর রিপোর্টে ক্যান্সার ধরা পড়েনি। ওরা রিপোর্ট করেছে অ্যাপেন্ডিসাইটিস। অ্যাপেন্ডিসাইটিস রিপোর্ট করাতেই অপারেশন।


বিভাগ : স্বাস্থ্য


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও