‘এখনই কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানতে হবে’ বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

হাফসা আক্তার,স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২৭ পিএম, ১২ আগস্ট ২০২০ বুধবার

‘এখনই কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানতে হবে’ বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বেপরোয়া হয়ে উঠছে এসব গ্যাংগুলো। এসব কিশোর গ্যাংয়ের কারণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে ব্যাপক প্রভাব পরতে পারে বলে মনে করছেন সকলে। বেশিরভাগ মানুষের ধারণা নির্দিষ্ট শেল্টারদাতাদের আষ্কারায় এই গ্যাংগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সাহস করে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জে সচেতন নাগরিকরা কি মনে করে তা জানতে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন নিউজ নারায়ণগঞ্জ। তাঁরা হলেন নারায়ণগঞ্জ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুমন রেজা, নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুস সালাম, সাংস্কৃতিক জোট নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি শাহীন মাহমুদ, আমরা নারায়ণগঞ্জবাসীর সভাপতি নূরউদ্দিন ও গণসংহতি আন্দোলনের নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয়কারী তরিকুল সুজন।

রুমন রেজা নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমরা দেখতে পাই মাদকের সহজলভ্যতার কারণে এ সকল কিশোর মাদকের সাথে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পরছে। যার সূত্র ধরে তারা নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পরছে। তাছাড়া এ কিশোরদের প্রতি সমাজের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা সমাজ সঠিক ভাবে পালন করেনা। তাছাড়া আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু সুবিধাবাসী লোক এ সকল কিশোরকে লালন করে। নিজেদের সুবিধার্থে তারা ইচ্ছা করেই এ সকল কিশোরদের বিপথে নেয়ার চেষ্টা করে। এখন এর কিশোর গ্যাং এর নিস্পত্তির দায়িত্ব কারও একার নয়। সমাজ, প্রশাসন পরিবার সকলকে এক সাথে এর দায়িত্ব নিতে হবে। কোনভাবেই এর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

আব্দুস সালাম বলেন, ‘এই সময়ে স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অনলাইন ভিডিও গেমস এর প্রতি আসক্ত হয়ে পরছে। যার মধ্যে বেশিরভাগ গেমসই হানাহানি এবং মারামারি সম্পৃক্ত যা এ উঠতি বয়সে তাদের অস্থির করে তুলছে। তাছাড়া এ সময়ে সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা দেখা যায়না বলেই চলে। বাবা-মা যতক্ষন সচেতন না হবে ততক্ষন তাদের নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে সংবাদকর্মীদের দায়িত্ব হলো বাবা-মায়েদের সচেতন করে তোলা যাতে তারা পরিবারের এ বয়সী কিশোরদের দিকে বিশেষ নজর দিতে পারে। আর প্রশাসনের দায়িত্ব হলো এই যে মহল্লা কেন্দ্রীক বিভিন্ন গ্যাং তৈরি হচ্ছে, তা কারও না কারও ছত্রছায়ায়। তার যদি এখনই মোকাবিলা না করা যায়, তবে একটা সময় পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে। এছাড়াও আমরা দেখতে পাই কয়েকদিন আগে গোদনাইলে একটি হত্যাকান্ড হয়েছে যার এখনো বিচার কার্য শুরু হয়নি। প্রশাসনের এই শিথিলতা আমাদের আরও বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিশোর গ্যাং এর মোকাবিলায় প্রয়োজন প্রশাসন, সমাজ ও পরিবারকে একত্রে কাজ করা।’

নূরউদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এতটাই সহজ হয়ে উঠেছে যে কিশোররা সকল দিকই খুব ভালোভাবে আয়ত্ব করে নিচ্ছে। অথচ কোনটা ঠিক এবং কোনটা ভুল তা তারা বুঝার জন্য সময় নেয়না বা বুঝতেও চায়না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধ খুব সহজভাবে দেখতে দেখতে তারা অভ্যস্ত হয়ে পরে এবং এই বিষয়গুলো তাদের কাছে সহজ মনে হতে থাকে।

তাছাড়া বর্তমানে বাবা-মায়েরাও সন্তানের দিকে তেমন খেয়াল রাখে না বা তাদের তদারকি নেই বললেই চলে। এই মুহূর্তে আমাদের উচিত সমাজে বিভিন্নভাবে সচেতনতা তৈরি করা এবং এ বয়সী কিশোরদের দিকে পরিবারের এবং সমাজের একটু বিশেষ খেয়াল রাখা উচিৎ। এবং প্রশাসনের নিয়োমিত তদারকি করা উচিত।’

তরিকুল সুজন বলেন, ‘প্রথমত এ সকল কিশোরদের হাতের কাছে মাঠ নেই। তারা খেলাধুলা করতে পারছে না। ফলে তারা বিনোদনের জন্য ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে গিয়ে মাদক এবং অপরাধের সঙ্গে সাথে জড়িয়ে পরছে। তবে যারা এ সকল শিশুদের শেল্টার দেয় এবং তাদের ব্যবহার করে তারা অনেকাংশে দায়ি। তাছাড়া আমরা যে দেখতে পাই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভাড়া করে লোক আনা হয়, তাও এরই অংশ। এই সমস্ত কিশোরদের নিয়ে আমাদের সরকার ও সমাজ তেমন ভাবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য যদি এলাকাভিত্তিক মাঠ, পাঠাগার, পুকুর, বিনোদন কেন্দ্র, পার্ক থাকতো, তবে কিশোররা এসকল অপরাধ থেকে দূরে থাকতো। এ সকল জিনিসের অনুপস্থিতির কারণে কিশোররা সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন অপরাধ চক্রে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে আমরা চাই যে সকল এলাকায় কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে সে সকল এলাকায় প্রমাসনের কঠোর তৎপরতা শুরু হোক। আমাদের আগে ভাবা উচিৎ এ সকল কিশোরদের শেল্টার দেয় কারা? এ সকল কিশোরদের যারা শেল্টার দেয় তাদের দ্রুত চিহ্নিত না করতে পারলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য। নারীরা যখন একা একা কোথাও যাতায়াত করবে তখন এ সকল কিশোররা তাদের উত্তক্ত করবে।’

শাহীন মাহমুদ বলেন, ‘সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই এই কিশোর গ্যাং এর প্রভাবগুলো আমরা দেখতে পাই। আমাদের শাসন ব্যবস্থার অবকাঠামো ধ্বসে গেছে। শেষ অব্দি আমরা এ বিষয়েও রাজনৈতিক প্রভাব দেখতে পাই। কারণে আমাদের যারা বর্তমানে ক্ষমতায় আছেন, তারা নিজেদের ভোট হালাল করার জন্য এই কিশোর গ্যাং এর শেল্টার দাতাদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। তারা আমাদের কিশোরদের দেশের সংস্কৃতি এবং শিক্ষার দিকে না নিয়ে গিয়ে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করে। এর নিয়ন্ত্রনে তাৎক্ষনিকভাবে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। জেলা প্রশাসনই এখন কঠোর আইন প্রয়োগ করে এই ভয়াবহতা রুখতে পারে।’


বিভাগ : সাক্ষাৎকার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও