রাজনীতি করতে নয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে পদের প্রয়োজন : সুমন

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩৮ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার

রাজনীতি করতে নয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে পদের প্রয়োজন : সুমন

নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে কোন ধরনের ধোকাবাজি না করে স্বচ্ছতায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় ও বিএনপি নেতা মাহমুদুর রহমান সুমন।

তিনি বলেছেন, ‘সাধারণ নেতাকর্মীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পদ দেওয়ার মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে যারা রাজনীতি করে তারা মূলত বিশেষ কোন উদ্দেশ্য নিয়েই দলের মেরুদন্ড ভাঙার কাজে লিপ্ত। বড় বড় হোটেল আর আলোর ঝলকানিতে নেতাকর্মীদের রঙিন স্বপ্ন না দেখিয়ে বরং রাজপথে আন্দোলনই পারে এখন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে। আমি সে চেষ্টাটিই করে যাবো।’

মাহমুদুর রহমান সুমন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জাগো দল হতে বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিকবার পদ বহন করা প্রয়াত বদরুজ্জামান খান খসরুর ছেলে যিনি নিজেও আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেব দায়িত্ব পালন করেছেন।

আসছে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রত্যাশা করছেন সুমন। কারণ হিসেবে সাফ কথা ‘আমার বাবা রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পুরোটা সময় বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের জন্য, এলাকার উন্নয়নের জন্য। যৌবনকালের শ্রম আর কষ্টার্জিত উপার্জিত অর্থের বেশীরভাগই পরিবার সংসারে খরচ না করে দল আর নেতাকর্মী সহ এলাকাবাসীর জন্য ব্যয় করেছেন। আবার অসমাপ্ত কাজ আর লক্ষ্যে পৌছাতেই মানবকল্যাণে বিএনপির রাজনীতি করতে চাই।’

সুমন বলেন, ‘জেলা বিএনপির কমিটি আসছে। একজন রাজনৈতিক বাবার সন্তান হিসেবে ও নিজেও রাজনীতি করার কারণে ভালো একটি পদ প্রত্যাশা থাকতেই পারে। আমিও প্রত্যাশা করি। কিন্তু বিগত দিনে যেভাবে নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে তাতে কিছুটা আপসোসও হয়। গণমাধ্যমেও এসব নিয়ে অনেক নেতিবাচক সংবাদ হয়েছে। এগুলো আমাদের কষ্ট দেয়।’

‘টাকা দিয়ে, উচু মানের ফাইভ স্টার হোটেলে লোকজনদের ডেকে নিয়ে নানা প্রকার লোভ দেখিয়ে আর শীর্ষ নেতাদের আরো বড় পদে পদায়িত করার প্রস্তাব দিয়ে টাকা নিয়ে রাজনীতি করার পক্ষে আমি না। বরং আমি মনে করি রাজনীতি হতে হবে রাজপথে। এখন দল ক্ষমতায় নাই। তাই ক্ষমতায় আনার জন্য সব কিছুই করতে হবে তপ্ত রোদের মধ্যে, মুষলধারে বৃষ্টিতে ভিজে। ফাইভ স্টার হোটেলে বসে পদ দিলে আর সেইসব নেতাদের রাজপথে দেখা যাবে না। ফলে আমি পদে আসতে পারলে ভবিষ্যৎ বিএনপির কমিটিতে যোগ্য, মেধাবী, পরিশ্রমী, নিগৃহীত, নির্যাতিত নেতাদেরকই প্রাধান্য দিব। এতে দলের ভীতও পোক্ত হবে।’ বক্তব্যে যোগ করেন সুমন।

তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করতে হলে পদ প্রয়োজন হয় না। মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হলে পদের আশা করা ভুল। কিন্তু দলের ভেতরে সুস্থধারা বহমান, নেতাকর্মীদের যোগ্য পদে পদায়িত ও মূল্যায়ন করতে হলে পদের প্রয়োজন হয়। আমি সে জন্যই দলের স্বার্থে কাজ করার জন্যই পদ প্রত্যাশা করতেই পারি।’

১৯৯১ সালে খসরু উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে তাকে বিএনপির নির্বাচনের কথা বলেন দলের হাই কমান্ড। কিন্তু খসরু তখন উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েনি। ছোট ভাই আতাউর রহমান আঙ্গুরকে বিএনপির মনোনয়ন এনে দেন। যদিও তিনি তখন বিএনপি তো দূরের কথা রাজনীতিতেই ছিলেন না। এ নিয়েও দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয় খসরুর। খালেদা জিয়াকে আশ্বস্ত করেন খসরু যে তিনি আঙ্গুরের জয়ের দায়িত্ব নিবেন। শুরু হয় খসরুর চ্যালেঞ্জের যাত্রা। ঘরে ঘরে গিয়ে খসরু বলতেন, ‘আপনারা আমাকে যেমন ভালোবাসেন তেমনি ভালোবাসবেন আঙ্গুরকে। তাকে ধানের শীষে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন।’

খসরুর কথা রাখেন আড়াইহাজারবাসী। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে আঙ্গুর সংসদ সদস্য নিবাির্চত হন। কিন্তু ওয়ান এলেভেনের পরে খসরুর সম্মান নষ্ট করেন আঙ্গুর। ভিড় করেন সংস্কারপন্থিদের দলে।

২০০৮ সালের নিবার্চনে দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। তখন দলের মনোনয়ন পান খসরু। দলীয় বিরোধের কারণে ৮৭ হাজার ভোট পেয়েও আসনটি হাতছাড়া হয় বিএনপির। আসনটি চলে যায় আওয়ামী লীগের প্রাথীর্ নজরুল ইসলাম বাবুর হাতে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠা থেকেই তিনি এ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে জাগো দল থেকে যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সহ একাধিক পদে।

দেশের প্রথম গার্মেন্ট কারখানা স্থাপন করেন খসরু। সেটাও ৮০ এর দশকে। পরে আড়াইহাজারে স্পিনিং মিল। তবে ওই সময়ে উপার্যনের ক্ষেত্রে খসরু ছিলেন অনেক উপরে। প্রচুর বিদেশী অর্ডার রপ্তানি করে অল্প দিনেই প্রচুর সম্পদের মালিক বনে গেলেও সে টাকা ঘরে রাখতে পারেনি।

স্মৃতিচারণে সুমন বলেন, ‘তখন ব্যাংকিং প্রথা তেমন চালু ছিল না। তখন দেখেছি আব্বাকে বস্তায় ভরে টাকা আনতে। সে টাকা এলাকায় নিয়ে যেতেন। কার বাড়িতে খাবার নাই, কার বিয়ে এসব খোঁজ রাখতেন তিনি। বিলিয়ে দিতেন কষ্টার্জিত সেই টাকা।’

‘আড়াইহাজারের অন্তত ৯০ ভাগের বেশী স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদে বাবার অনুদান কিংবা সহযোগিতা রয়েছে। তিনি অকাতরে বিলিয়ে গেছেন। শুধু রাজনীতি না বরং রাজনীতির ঊর্ধ্বে এসে তিনি মানুষের পাশে ছিলেন। আমি সেটা অনুসরণ অনুকরণ করতে চাই। বাবার মতই আদর্শবান সৎ মানুষ হিসেবে বিএনপির রাজনীতি করে মানুষের কল্যাণ করতে চাই।’ যোগ করেন সুমন।

সুমন নিজেও এখন ব্যবসায়ী। সেই সঙ্গে রাজনীতিতেও সময় দিচ্ছেন। তাঁর সাফ কথা ‘এখনো ভালো মানুষ রয়েছে। এখনো সুযোগ আছে সামাজিক দৃশ্যপট বদলানোর। এখনো পরিকল্পনা করলে অনেক কিছুই করা যায়। গত সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাইনি তাতে আফসোস নাই। দল মনে করেছে দেয়নি। আগামীতে প্রত্যাশা থাকবে। দল মূল্যায়ন করবে বিশ্বাস করি।’

ব্যবসার কলাণে পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্র ভ্রমণ করেছেন সুমন। অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, ‘অনেক উন্নত বিশ্বে যেখানে অফিসার হিসেবে থাকে ভারতীয়রা সেখানে বাংলাদেশীরা চাকরি করেন নিচের পদে। কারণ ভারতীয়রা ভালো ইংরেজি বলতে পারেন। বাংলাদেশীরা পারেন না বলেই এ অবস্থা। এমপি হতে পারি কিংবা নাই পারি আমার লক্ষ্য শিক্ষাকে জোর দেওয়া। কারণ শিক্ষিত হলে বাংলাদেশীরা আর বিদেশে গিয়ে অবহেলিত হবেন না।’

আড়াইহাজারে এখনো সামাজিক বনায়ন প্রয়োজন উল্লেখ করে সুমন বলেন, ‘আমার একটি ইচ্ছে আড়াইহাজারের প্রত্যেক বাড়িতে নারিকেল কিংবা অন্যান্য গাছ রোপন করবো। লোকজনদের উদ্বুব্ধ করবো বৃক্ষরোপনে। এতে সবুজায়ন বনায়ন পরিবেশের ভারসাম্য যেমন বাড়বে তেমনি একটা সময়ে এসব গাছ উপার্যনের একটি মাধ্যম হবে।’

সুমন বলেন, ‘দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণ থেকে আমাকে জনকল্যাণে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি সেটা করে যাচ্ছি। আমৃত্যু করে যাবো। এতে আমার ব্যক্তি উন্নয়ন হয়তো ঘটবে না কিন্তু সামাজিক একটি বিপ্লব হবে। আমি সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছি।’

‘দলের নেতাকর্মীরা এখনো দৃঢ়, এত মামলা হামলার পরেও অনেকে আকড়ে ধরে আছে দলটি। এরাই দলের প্রাণ। এদের উপর ভর করেই একদিন বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। সে পথ বেশী দূরে না। তখন এসব অবহেলিত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব’ বলেন সুমন।

তিনি বলেন, ‘এখন নেতাকর্মীদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে পদবী দিয়ে অনেক নেতারা লাভবান হয় বা হওয়ার চেষ্টা করে। এগুলো এক সময়ে তাসের ঘরের মত ঝরে পড়বে। যারা প্রকৃত রাজনীতিক, যারা নিজের অর্থ দলের জন্য বিলিয়ে দিচ্ছেন তাদের মূল্যায়ন এক সময়ে হবেই।’

সুমনের মতে কোন এলাকার জনপ্রতিনিধি হওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের সমর্থন পাওয়া প্রয়োজন। এলাকায় তার শিকড় থাকা উচিত। এলাকার মানুষের বিপদে আপদে সম্পৃক্ত থাকলেই কেবল প্রকৃত জনপ্রতিনিধি হওয়া সম্ভব। উড়ে এসে জুড়ে বসে টাকার জোরে ক্ষমতাবান হওয়া যায় কিন্তু মানুষ সেটাকে সমর্থন করে না।

‘‘এখনো ডাক দিলে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। এটা বাবার আদর্শের কারণে। বাবার রাজনৈতিক বর্নাঢ্য ইতিহাসের কারণে। বাবাকে মানুষ ভালোবাসতেন সেটার প্রতিদান এখনো মানুষ দেয়। আশা করি আগামীতেও একজন আদর্শবান বিএনপি নেতার ছেলে হিসেবে নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবো।’’

বদরুজ্জামান খান খসরু সবশেষ আড়াইহাজার থানা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর যখন নেতাকর্মীরা বিমর্ষ তখন হাল ধরেন ছেলে সাবেক যুবদল নেতা মাহমুদুর রহমান সুমন।

তিনি বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান বিদেশে থেকেও দল ও দেশকে নিয়ে ভাবেন। দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তিনি বদ্ধপরিকর। তাঁর নির্দেশনায় বিএনপি টিকে আছে এবং থাকবে। তারেক রহমানের প্রত্যেকটি নির্দেশনা আমরা পালন করছি। আশা করি তাঁর নির্দেশে তাঁর হাত ধরেই দেশে আবারো গণতন্ত্র ফিরবে। অপশাসন দূর হয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আর সেটা বাস্তবায়নে যা প্রয়োজন, যা ত্যাগ স্বীকার করা প্রয়োজন সব আমি করবো ইনশাল্লাহ। আমি তারেক রহমানের উপরেই ভরসা করতে চাই, তাঁর নেতৃত্বেই অবিচল থাকতে চাই।’


বিভাগ : সাক্ষাৎকার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও