জিউস পুকুরের সাথে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নাই : আইভী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪৪ পিএম, ১১ নভেম্বর ২০২০ বুধবার

জিউস পুকুরের সাথে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নাই : আইভী

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, ‘জিউস পুকুরের সঙ্গে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। একজন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতা এখানে নাই। আমার বাবা আলী আহম্মদ চুনকারও ছিল না। এ জায়গা যদি ক্রয় করে থাকে আমার নানা মাহাতাব উদ্দিন সাহেব। ওনার ক্রয়কৃত সম্পত্তি থেকে যদি তার ছেলে মেয়েরা ওয়ারিশ হিসেবে প্রাপ্ত হয়ে থাকে তাহলে কি অপরাধ আমার। এটা কখন কিনেছে মাহাতাব সাহেব এবং ও জামির আহমেদ? এটা খতিয়ে দেখা উচিত। যদি এটা ১৯৮০ বা ১৯৮১ সালে ক্রয় করে থাকে তাহলে আজকে ৩৯ বছর পর এসে কেন এ প্রশ্ন করা হচ্ছে। তাহলে কোথায় ছিল সমাজপতিরা, হিন্দু সম্পত্তি রক্ষার্থে?

১১ নভেম্বর বুধবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে সিটি করপোরেশনে মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী তার পরিবার স্বজনদের বিরুদ্ধে দেওভোগের জিউস পুকুর সহ লক্ষীনারায়ণগ জিউর মন্দিরের দেবোত্তর সম্পতি দখলের অভিযোগে মানববন্ধনের পরে প্রতিক্রিয়ায় নিউজ নারায়ণগঞ্জকে এসব কথা বলেন আইভী।

তিনি আরো বলেন, ‘১৯৮৪ সালে আলী আহম্মদ চুনকাকেও একই ভাবে একই অভিযোগে অভিযুক্ত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে (তখন তিনি বিরোধী দলের নেত্রী ছিলেন) তখন এ অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অভিযোগও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল। আজকে পুনরায় ৩৬ বছর পর এসে একই অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে করা হচ্ছে। তাহলে এ ষড়যন্ত্রকারী কারা? এবং তারা সময় সময় তারা সময়কে ও মানুষকে ব্যবহার করে এক সম্প্রদায়কে উত্তেজিত করার জন্য এবং আমার নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের চক্রান্তমূলক মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার জন্য এ কাজটি করছে। তবে সত্য কোন দিনও মিথ্যা হয় না। সত্য প্রমাণিত হবেই। এ জায়গার মালিক নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নয় অথবা মেয়রের বাবাও নয়। এ জায়গা ক্রয় করেছে কারা সেটা খোঁজে দেখা হোক। এবং সেই ক্রয়টা বৈধ না অবৈধ সেটাও বের করা হোক।’

এর আগে মানববন্ধনে মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা বলেন, ধর্মের নামে ভন্ডামী চলবেনা। কেউ কেউ নিজেকে ধার্মিক দাবি করে মসজিদের জায়গা দখল করে নেন মন্দিরের জায়গা দখল করবেন আওয়ামীলীগ এটা সহ্য করবে না। স্মারকলিপি অনুযায়ী মেয়র আইভীর আত্মীয়স্বজন এই জায়গা দখল করেছেন এই বিষয়টা আমি নেত্রীর (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার) কাছে তুলে ধরবো। আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, যারা হিন্দু সম্পত্তি দখল করে আমার নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই নমিনেশন দিবেনা। এটা অত্যন্ত পরিষ্কার। জননেত্রী শেখ হাসিনা এদেশের সংখ্যা লঘুদের রক্ষাকবজ। তিনি আবশ্যই আপনাদের বিষয় বিবেচনা করবেন।

জিউস পুকুরের জায়গা নিয়ে তিনি আরো বলেন, হুমকি ধামকি দিবেন না। যদি হত্যা করতে চান তাহলে আমাকে হত্যা করেন। আমি শেষ পর্যন্ত জিউস পুকুর নিয়ে কথা বলবো। জিউস পুকুর সহ সব জায়গা উদ্ধার করবো।

নারায়গঞ্জ জেলা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি বাবু চন্দন শীল বলেন, শুধু দুঃখের সাথে বলতে চাই, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদেরকে আমরাই ভোট দিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসাতে আপনাদের অনুরোধ করেছি। একারণে দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু দখলের নামে কাউকে হুমকি দিবেন হত্যার হুমকি দিবেন এটা হতে পারেনা।

মানববন্ধন শেষে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। জেলা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ এবং জেলা ও মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে এ স্মারকলিপি জমা দেয়া হয়।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ নগরী স্থাপনের সময়কালে শ্রী বিকন লাল ঠাকুর শহরের দেওভোগ আখড়া এলাকায় আমাদের উপাস্য দেবতা লক্ষীনারায়ণের নাম শ্রী শ্রী রাজা লক্ষীনারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দির নামে একটি মন্দির স্থাপন করেন।

শত শত বছর ধরে এই মন্দিরটি নারায়ণগঞ্জের লাখো লাখো হিন্দু ধর্মালম্বীদের জন্য একটি পবিত্রতা ও শুদ্ধতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। প্রয়াত বিকন লাল ঠাকুর মন্দিরটির পাশেই পূজা-অর্চনা ও আশপাশের অধিবাসীদের সুবিধার্থে ৩৬৭ শতাংশ জায়গা নিয়ে একটি পুকুর খনন করায় যা স্থানীয়দের কাছে জিউশ পুকুর নামে পরিচিত।

শত শত বছর ধরে এই পুকুরটি হিন্দু ধর্মালম্বীরা যেমন পূজা-অর্চনা করছেন ঠিক তেমনি মুসলিম ভাই-বোনেরাও নিজেদের প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহার করে আসছেন, যা অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অবিস্মরণীয় নিদর্শন। মন্দির ও উক্ত জিউশ পুকুর মিলিয়ে উক্ত বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তিটি মন্দিরের সেবাতে ও মন্দির কমিটির পক্ষ থেকেই দেখভাল করা হচ্ছে শত বছর ধরে।

ভূমি জরিপের সিএস (ব্রিটিশ) পর্চায় এই বিশাল সম্পত্তিটি (মন্দির ও পুকুরসহ মোট আয়তন প্রায় ৪ একর) দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবেই রেকর্ডভুক্ত হয়। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর এই বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তিটি বিশেষ করে পুকুরটি দখল করে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে একটি স্থানীয় চক্র। বিভিন্ন সময় জাল নকল দলিল করে তারা দখলের চেষ্টাও করে। বিশেষ করে ২০০১ সালের পর বিএনপি জামাত জোট আমলে এই দখলের আগ্রাসন বেড়ে যায় শত গুণ।

সাবেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমল থেকে দেবোত্তর এই সম্পত্তি গিলে খেতে যার পরিবার ওৎপ্রোতভাবে জড়িত তিনি আর কেউ নন আপনার দলেরই মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর পরিবার। যেসকল নকল দলিল করে এই সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে সেইসব দলিলেই মেয়র আইভীর মা, দুই ভাইসহ তারই আত্মীয় স্বজনের নাম রয়েছে।

আপনি জেনে আশ্চর্য হবেন যে, ভোটের সময় মেয়র আইভী হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছের মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে মন্দিরে মন্দিরে গিয়ে কড়জোরে নমষ্কার করেন। অথচ তার পরিবারই এই মন্দিরের তথা দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করে আসছে। ইতোপূর্বে এই পুকুর ভরাটেরও চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু নারায়ণগঞ্জের আপামর মানুষের বাধার মুখে সেটি সম্ভব হয়নি। উপায়ন্তর না পেয়ে মন্দিরের পক্ষে আদালতে মামলা দায়ের করা হলেও মামলার বাদী সহ সংশ্লিষ্টদের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী নিজে ডেকে নিয়ে এবং লোক মারফত ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছেন।

‘আমরা মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর এমন রুপ দেখে মোটেও বিস্মিত নই। কারণ ১৯৭৯ সালে যখন জিয়াউর রহমানের শাসনামলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতে থাকাটাই ছিল দুষ্কর, তখন মেয়র আইভীর প্রয়াত পিতা সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ চুনকা আওয়ামী লীগের নেতা হয়েও জামায়াত শিবির তৈরীর কারখানা বলে খ্যাত নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুলের জন্য আদমজী ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের জায়গা দখল করে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের কাছে মাত্র ১০হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন। স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন যুদ্ধাপরাধী ও আল বদর বাহিনী প্রধান আলী আহসান মুজাহিদ। এসকল তথ্য নারায়ণগঞ্জ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মাঈনউদ্দিন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর অবলীলায় স্বীকার করেছিলেন।

উল্লেখিত দলিলই প্রমাণ করে জামাত আমীরের দেওয়া প্রতি বক্তব্যই তাহলে সত্য। ওই স্বীকারোক্তিতে জামায়াত আমীর মেয়র আইভী ও তার পরিবারের প্রতি জামাতের কৃতজ্ঞতাবোধ রয়েছে বলে জানান, প্রয়াত আলী আহাম্মদ চুনকার নেতৃত্বেই রাজাকার প্রধান দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে নারায়ণগঞ্জে এনে জিয়াউর রহমান আমলে সভা করা হয়েছিল। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদের স্ত্রী আর আইভী ক্লাসমেট ছিল। মুজাহিদ যখন জেলে ফাঁসির প্রহর গুনছিল, তখন মুজাহিদের স্ত্রীর একটি ফোনে মেয়র আইভী তাদের পরিবারের জন্মনিবন্ধন করে দিয়েছিলেন। মেয়র আইভী ও তার পরিবারের এই দখল দ্বারিত্ব এবং লেবাসী রাজনীতি আমাদের কাছে অনেক আগেই স্পষ্ট হয়েছে।

আমরা ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষার জন্য কখনওই আপনার দ্বারস্থ হতাম না। কারণ আপনার নেতৃত্বে এদেশে এখন আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষার অন্য আইনের দ্বারস্থ হয়ে আজ আমরা অসহায়, আমরা নিরাপত্তাহীন।

আমরা এদেশের শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে আপনার নেতৃত্বে অবিচল আস্থা রেখেই আপনার দ্বারস্থ হয়েছি। কারণ এই দেবোত্তর সম্পত্তিটির বর্তমান মূল্য ১০০কোটি টাকার উপরে হলেও একে ঘিরে লাখো লাখো সনাতন ধর্মালম্বীদের অনুভূতির কোন মূল্য নির্ধারণ করা যাবে না। আজ তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মেয়র আইভী ও তার পরিবারের এই দখলদারিত্ব আর লেবাসী ভূমিকার কাছে আমরা অসহায়। আপনি মানবতার মা, আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। আপনার কাছে বিনীত নিবেদন, আমাদের সাংবিধানিক অধিকার ও লাখ লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের অনুভূতির প্রতি আপনি সদয় হোন। এই দখলদারিত্বের রাহু গ্রাস থেকে মুক্ত হতে আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপক কুমার সাহার সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কমিটির সভাপতি নিম চন্দ্র ভৌমিক, সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জী নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা, জেলা ঘাতক দালাল নিমূল কমিটির সভাপতি বাবু চন্দন শীল, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার শিপন, মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অরুন দাস ও সাধারণ সম্পাদক উত্তম সাহা সহ প্রমুখ।


বিভাগ : সাক্ষাৎকার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও