কেউ শুনেনা রূপগঞ্জবাসীর কান্না


তৈমূর আলম খন্দকার | প্রকাশিত: ০৮:৫৫ পিএম, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার
কেউ শুনেনা রূপগঞ্জবাসীর কান্না

বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম - মুক্তিযোদ্ধা, দেশের সেরা কন্ঠ শিল্পী আবদুল জব্বার মরমী কন্ঠে গেয়েছেন যে, “শহরবাসী শোন, তোমরা যাদের মানুষ বলো না, বিধিও যাদের কান্না শুনে না, এরাও মানুষ আছে তাদের প্রাণ, আমি চোখের জলে শুনাই তাদের গান”।

এ গানটির যথার্থতা ও মর্মাকথা আপনি যদি উপলব্দি করতে চান, তবে আপনাকে নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন রূপগঞ্জ থানার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখে আসতে হবে। ইতোপূর্বে যদি কোন দিন রূপগঞ্জে গিয়ে থাকেন তবে নিশ্চয় আপনি সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা রূপগঞ্জকে দেখেছেন যা বালু ও শীতলক্ষ্যা বিধৌত পলি মাটি দ্বারা বিধাতার আশীর্বাদপুষ্ট। দেখেছেন পুকুরে, খালে-বিলে, গ্রামবাসীর দলবেধে মাছ ধরার আনন্দ উল্লাস।

কিন্তু এখন দেখবেন রূপগঞ্জ একটি মরু অঞ্চল। সেখানে বালু চাষ হচ্ছে, ধান ও সবজি চাষাবাদ দেখা যাবে না। অথচ রাজধানীর সবজি চাহিদা পূরণ করতো ঢাকা সীমানা সংলগ্ন রূপগঞ্জের কৃষকেরা। সে স্থলে ভূমিদস্যুরা জোরপূর্বক ড্রেজার বসিয়ে মাইলের পর মাইল তিন ফসলী জমি, খাল-বিল, নিচু জমি বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্পের নামে ভরাট করে ফেলছে। যে বাধা দেয় তার উপর খর্গ নেমে আসে, অথচ জনগণের বিপদে যাদের নিকট আশ্রয় নেয়ার কথা (জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন) তারাও নগ্নভাবে ভূমিদস্যুদের পক্ষ নিয়েছে।

স্থানীয় জমির মালিক ও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে তারা (জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন) যেন বধির ও অন্ধ হয়ে পড়েছে। জোরপূর্বক ভূমি দখলের বিষয়টি যেন ভূমিদস্যুদের “অধিকারে” পরিণত হয়েছে। বালু ভরাট বন্ধ করা ও বন্ধ রাখার জন্য মহামান্য হাই কোর্ট ও এ্যাপিলেট ডিভিশন জেলা প্রশাসক, নারায়ণগঞ্জকে নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু সে নির্দেশ কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নাই এর মত অবস্থা। অথচ জোরপূর্বক তিন ফসলী জমি, নদী-নালা, খাল-বিল, জলাশয় ভূমিদস্যুদের দ্বারা বালু ভরাট অব্যাহত রয়েছে। ৭০টি ড্রেজার দ্বারা কায়েতপাড়া ইউনিয়নে বালু ভরাট চলছে দিন-রাতে বিরতিহীনভাবে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এমনি ভাবে ভূমিদস্যুরা তাদের দোসরদের মাধ্যমে রূপগঞ্জকে শ্মশানে পরিনত করেছে এবং এ মর্মে ভূমিদস্যুদের প্রতক্ষ্যভাবে সহযোগীতা করছে জনপ্রতিনিধিরা যাদের ছায়াতলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অবস্থান নেয়ার কথা ছিল।

সরকার, তথা জেলা প্রশাসন, তথা উপজেলা প্রশাসন বালু ভরাট বন্ধের জন্য হাই কোর্টের নির্দেশ পাওয়ার পর ওভারলুক করে যাচ্ছে। সমাজের বিত্তশালী লোকেরাও তাদের বৈষয়িক সুবিধা আদায়ের জন্য ভূমিদস্যুদের সাথে হাত মিলিয়েছে, রীতিমত দালালী করছে। যারা প্রতিবাদ করে তাদেরকে পুলিশী হয়রানীর মাধ্যমে থামিয়ে দেয়া হয়। এ বিষয়টি বক-ধর্মী বুদ্ধিজীবীদের গায়ে কাটা ধরে না, কারণ দেশেতো এখন হাতে গোনা ২/৪ জন ছাড়া মজলুমের পক্ষে কথা বলার বুদ্ধিজীবী নাই, দেশে বুদ্ধিজীবীর পরিবর্তে পরজীবী সৃষ্টি হয়েছে যারা বিত্তশালীদের বাড়ী বাড়ী ফেরী করে নিজেদের ভাগ্যে গড়ে এবং কে কার আগে কে সরকারের পক্ষে গান গাইবে তার প্রতিযোগীয় লিপ্ত রয়েছে।

সমষ্ঠিকে নিয়েই পথ চলা সমাজের একটি বিধিবদ্ধ সংস্কৃতি বটে। কিন্তু সমষ্ঠির পরিবর্তে মানবজাতি এখন একলা চলার নীতিকে অনুশরন করছে। শিক্ষিতদের মধ্যে এ ধরনের প্রবনতাই সবচেয়ে বেশী। রূপগঞ্জের অনেক সন্তানই আইনজীবী হিসাবে পেশা করছেন, যারা ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু এদের মধ্যে অনেকেই আছেন ভূমিদস্যু বিরোধী আন্দোলনে আসতে অনীহা প্রকাশ করে বলে যে, আমরা কি গ্রুপের বিরুদ্ধে পারমু? তখন আমার মনে হয় কেন মানুষ তার নিজ ও বন্যপ্রানীর সাথে পার্থক্য খুজে পায় না? জমি একজনের অথচ আর একজন বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলে, যার কোন প্রতিকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা কোথাও পাচ্ছে না। এ সব কারণেই হাই কোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ মন্তব্য করেছে যে, “দেশটা কি মগের মুল্লুক?”

হাইকোর্টের মন্তব্যে গোটা জাতি আশ্বস্থ হয়েছে, মজলুম মানুষ পেয়েছে মানসিক প্রশান্তি। উদাহারণ স্বরূপ বলা যায় যে, প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলছেন, তিন ফসলী জমি ভরাট করা যাবে না, খাল-বিল, নদী-নালা প্রভৃতি ভরাট করা যাবে না, পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোন কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। অথচ ভূমিদস্যুদের দ্বারা সবই সংগঠিত হচ্ছে, এর পিছনে রহস্য কি? সরকার প্রধান যেখানে প্রকাশ্যে তিন ফসলী জমি রক্ষার কথা জোর দিয়ে বলছেন সেখানে প্রধানমন্ত্রী আদেশ উপেক্ষিত, নাকি উভয় পক্ষই প্রধানমন্ত্রীর? মনে করে বিষয়টি তিনি দেখেও না দেখার নীতি অনুসরন করছেন?

অনেকেরই মন্তব্য যে, দেশে আইনের শাসন নাই। অন্যদিকে সরকার বলছে যে, আইন মোতাবেকই রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। এখানে কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা? সত্যকে কি মিথ্যা দিয়ে ঢাকা যায়? কিন্তু বর্তমানে দেখা যায় যে, “মিথ্যাই” প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। কারণ হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও বালু ভরাট হচ্ছে কি ভাবে? এ জন্য সরকার তাদের ব্যর্থতাকে কোন আংগিকে জবাব দিহিতার মোকাবেলা করবেন? সরকার ও সরকারী প্রশাসন জানে যে এ দেশে “জবাব দিহিতার” সংস্কৃতি উঠে গেছে। ফলে সরকারী প্রশাসনকে তাদের ব্যর্থতার জন্য কোন প্রকার জবাব দিতে হয় না, ফলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ-২১(২) এর নিদের্শনা মতে আমলারা এখন আর জনগণের সেবক নহে, বরং তারা মালিকে পরিনত হয়েছে।

রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির কথা শোনা যায়, কিন্তু আমলাদেরও সাহেব পাড়ায় বাড়ী গাড়ী থাকার কথা আমলারা স্বীকারই করে ফেলেছে। কিন্তু তাদের মানি লন্ডারিং এর বিচার সূদূর পরাতে, শুধু নামেই শোনা যাবে, কার্যত নহে।

সব বিষয়েই সরকার এখন “স্বাধীনতার চেতনার” কথা বলে। সরকারী দলের মনপুত কিছু না হলেই স্বাধীনতার চেতনা ভুলুন্ঠিত হয়ে পড়ে। এখন জানতে ইচ্ছা হয় স্বাধীনতার চেতনা কি এবং কত প্রকার? একজনের জমি আর একজন জোরপূর্বক ভরাট করে ফেলার নামই কি স্বাধীনতার চেতনা? ভূমিদস্যুরা তাদের দস্যুবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য ডিক্লারেশন প্রাপ্ত নিজ মালিকানাধীন পত্রিকাকে “হলুদ” সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহার করছে এটাই কি স্বাধীনতার চেতনা?

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে জাতি একটি সংবিধান পেয়েছে যার ৪২(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে, “আইনের দ্বারা আরোপিত বাধা নিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারন, হস্তান্তর ও অন্যভাবে বিলি ব্যবস্থা করার অধিকার থাকিবে এবং আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত কোন সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহন, রাষ্ট্রায়ত্ত বা দখল করা যাবে না।” স্বাধীনতার নির্যাস থেকে প্রাপ্ত “সংবিধান” লংঘন করে জোরপূর্বক মানুষের জমি দখল করার নামই স্বাধীনতার চেতনা?

বর্তমানে দেশে চলছে হালুয়া রুটি খাওয়ার মহোৎসব। এ মহোৎসবে কারা কারা জড়িত তা দেশ বাসী জানে। এ লুটেরাদের নিকট দেশ ও জাতি জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাদের প্রভাবেই প্রান্তিক চাষীরা দিনে দিনে ভূমিহীন হয়ে যাচ্ছে। অথচ এ জন্যই দেশবাসী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন করে ছিল? “স্বাধীনতা” ছিল তৎসময়ে “সময়ের” দাবী। তখন শ্লোগান ছিল “কেউ খাবে তো কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না।”

স্বাধীনতার ৫০ বৎসর পরেও কি দেশবাসী সমভাবে দু’বেলা খেতে পাচ্ছে, সবাই কি পাচ্ছে চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা? সম্পদের সুষম বন্টনের দাবী থেকে স্বাধিকার আন্দোলন এবং এ আন্দোলন যখন বেগমান হয়ে উঠে তখন বাঙ্গালী জাতি স্বাধীনতাকেই তাদের মুক্তির শোপান হিসাবে বেছে নিলো। নাকি স্বাধীনতা শুধু অর্জিত হয়েছে একটি গোষ্ঠী বা শ্রেণীর জন্য যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ যে যেখান থেকে পারছে লুটে পুটে খাচ্ছে। খাদ্য চাহিদা পূরনে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য কৃষি জমি ও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। দৃশ্যত: মনে হচ্ছে যে, রাষ্ট্র সে সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে সড়ে এসেছে।

নতুবা একজনের জমি আরেকজন জোরপূর্বক দখল করে কি ভাবে? কোন নৈতিকতায় রাষ্ট্র দূর্বল কৃষকদের পাশে না দাড়িয়ে ভূমিদস্যুদের আসকারা দিচ্ছে, অর্থাৎ অবৈধ জমি দখলের কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা কেন সৃষ্টি করছে না? সার্বিক পর্যালোচনায় হাই কোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ যথাযথই বলেছেন যে, “এটা (বাংলাদেশ) কি মগের মুল্লুক? এ আবেগ উৎকন্ঠা শুধু হাই কোর্টের নহে, বরং সমগ্র জাতির। গোটা জাতি নিরবে নিভৃতে দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ছে, কিন্তু মুখ খুলতে পারে না যা পেরেছে মহামান্য হাই কোর্ট ডিভিশন। “ভয়” সংস্কৃতি এখন জনগণকে দুমড়ে মুচড়ে খাচ্ছে। ভয়ভীতি দেখিয়ে সরকার জনগণকে শাসন করলো বটে, কিন্তু নিজেদের শ্রদ্ধার আসনে বসাতে ব্যর্থ হয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর