বড় হুজুর পাঠিয়েছেন


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:৩০ পিএম, ১৫ জুন ২০২১, মঙ্গলবার
বড় হুজুর পাঠিয়েছেন

নারায়ণগঞ্জে প্রায়ই বাসা বাড়িতে দেখা যায় দূর দূরান্তে অবস্থিত মাদ্রাসার রশিদ নিয়ে হাজির হয় একদল শিশু কিশোর। জিজ্ঞেস করতেই উত্তর মেলে ‘অমুক মাদ্রাসায় উন্নয়নের জন্য কিছু দান করেন’। ধর্মীয় কারণে অধিকাংশ মানুষই খালি হাতে তাদের ফিরিয়ে দিতে ইতস্তত বোধ করেন। তার উপর এতিম শিশুদের নিষ্পাপ চেহারা দেখে সাধারণ মানুষের মায়া কাজ করে দ্বিগুণ। আর এই এতিমদের ব্যবহার করে বছরের পর বছর সহায়তার নামে বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন একশ্রেনীর মাদ্রাসা শিক্ষক-পরিচালক।

বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই ধর্মপ্রান মানুষের দান ও সহায়তার উপর নির্ভরশীল। পাড়া মহল্লায় মাদ্রাসার দান বাক্স স্থাপন এবং প্রতি মাসে এলাকার ধন্যাঢ্য ব্যক্তিদের আর্থিক অনুদানের উপর চলে এর ব্যয়ভার। কোন কোন ক্ষেত্রে বাৎসরিক ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করে সেখান থেকে চলে বড় অংকের অর্থ সংগ্রহ। এরপরেও কোন কোন মাদ্রাসার পরিচালক ও শিক্ষক কোমলমতি বাচ্চাদের ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের কাজে। নিজ মাদ্রাসা থেকে অন্তত ৪,৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এলাকায় রশিদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় অর্থ। কোন কোন ক্ষেত্রে এসব রশিদে উল্ল্যেখিত মাদ্রাসার অস্তিত্ব থাকেনা, আবার কোন ক্ষেত্রে মাদ্রাসার নামে চলে ব্যবসা। তবে বাস্তবিক অর্থে এসব শিশুদের ব্যবহার করে অর্থ অনেক স্বচ্ছল মাদ্রাসারও অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।

২০১৮ সালে শিশু শ্রম নিষিদ্ধ করে আইন সংশোধন করা হয়। এতে বলা হয় ১২ বছর কিংবা তার কম শিশুদের দিয়ে কাজ করানো হলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। শিশুদের কাজে পাঠানোর বদলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর দিকেই মূলত জোড় দেয়া হয় সরকারের তরফ থেকে। কিন্তু সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই যখন কোমলমতি শিশুদের দিয়ে হাত পাতার মত কাজে নিয়োগ দেয়া হয় তখন তা বড় ধরণের অপরাধ হিসেবেই দেখছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কারন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাই শিশুদের বাধ্য করছেন ভিক্ষাবৃত্তির মত কাজে।

সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের সংক্রমনের মধ্যে এদের আনাগোনা কমলেও নতুন করে শুরু হয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। তাদের মধ্যেই একটি মাদ্রাসার চাঁদা আদায়ের রশিদ ও শিশুদের দিয়ে দূর দূরান্তে টাকা আনতে পাঠানোর প্রমান পাওয়া গেছে। তবে অভিযুক্ত মাদ্রাসা ও মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক বিষয়টি অস্বীকার করলেও মাদ্রাসার কমিটির সদস্য শিশুদের দিয়ে কালেকশন করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

সোমবার শহরের জামতলায় শিশু ছাত্র আসে তার মাদ্রাসার রশিদ বই সাথে নিয়ে। সেখানে সে বাড়ি বাড়ি প্রবেশ করে জানায় পাঞ্জাবি পায়জামার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে তাকে পাঠিয়েছে মাদ্রাসার বড় হুজুর আনোয়ার সাহেব। সেই কথামতো সে এবং আরও কয়েকজন মিলে বেরিয়েছেন অর্থ সংগ্রহে। তবে বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় এক বাসিন্দার। শিশুদের পুঁজি করে ভিক্ষাবৃত্তি করানোর ব্যাপারটি প্রমান রাখতে শিশু ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার মাদ্রাসার রশিদ বইয়ের ছবি তুলে রাখেন।

জামতলার বাসিন্দা আশরাফ সিদ্দিকি বলেন, প্রায়ই আমাদের বাসা ও এলাকায় ৮/১০ বছরের বাচ্চারা এসে মাদ্রাসার জন্য সহায়তা চায়। ইতিপূর্বে বেশ কয়েকজনকে আমি ধোঁকাবাজি করতে দেখেছি। অনেকেই আসে টাকার জন্য কিছু মাদ্রাসার নাম ঠিকানা বলতে পারে না। তাই আমি তার প্রতিষ্ঠানের ছবি তুলে রাখি। ছেলেটার কাছে জানতে পারি সে একা নয়, মাদ্রাসার হুজুর তাদের দলবেধে পাঠিয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। এগুলো তো বাচ্চাদের মানসিক বিকাশে ভয়াবহ প্রভাব রাখবে। মাদ্রাসা থেকে তাদের শেখানো হচ্ছে সহায়তার জন্য শিশু বয়স থেকেই হাত পাততে হবে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে।

সরেজমিনে, অভিযোগ ওঠা ফতুল্লার পিলকুনি এলাকার ‘আল কারিম দারুল ইসলাম ইয়াতীম খানা মাদ্রাসা’র ঠিকানায় গিয়ে এর সন্ধান পাওয়া যায়। বাচ্চাদের সহায়তা সংগ্রহের জন্য পাঠানো হুজুর আনোয়ার হোসেনেরও সন্ধান মিলে। আধাপাকা একটি মাদ্রাসা বর্তমানে সংস্কারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অস্থায়ী ভাবে পাশের একটি ভবনে স্থাপন করা হয়েছে মাদ্রাসা।

অভিযোগের বিষয়গুলো জানাতেই আনোয়ার হোসেন বলেন, তাদের মাদ্রাসা থেকে কালেকশন করা হয় তবে তা এত দূরে নয়। এবং এই ধরনের কাজ এলাকার আশেপাশেই হয়ে থাকে। তাছাড়া শিশুদের একা পাঠানো হয় না। সাথে বড়দেরও রাখা হয়। তবে জামতলা এলাকার বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি তা অস্বীকার করেন। বলেন, এই শিশু তাদের সাবেক ছাত্র। মাদ্রাসা থেকে রশিদ বই সংগ্রহ করে নিজেদের মত কালেকশন করে যাচ্ছে। রোজার পর থেকে মাদ্রাসার কোন কালেকশনে ছাত্রদের পাঠানো হয়নি।

প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে ডেকে আনা হয় হারুন নামে এলাকার নেতাগোছের এক ব্যক্তিকে। পরিচয় জানানো হয় তিনি মাদ্রাসা কমিটির সদস্য। সিগারেগ ফুঁকতে ফুঁকতে হাজির হন প্রতিবেদকের সামনে। আলাপচারিতায় জানান শিশুদের পাঠানো হয় নারায়ণগঞ্জ শহরের দিকে। তবে এই শিশু তাদের মাদ্রাসায় পড়তেন, এখন আর পড়েন না। কিন্তু শিশুদের দিয়ে এমন কালেকশন করানো ঠিক কিনা জানতে চাইলে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘কালেকশন ছাড়া মাদ্রাসা চলবে কিভাবে’?

২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরে মাদ্রাসায় পড়ানোর কথা বলে ৫ শিশুকে নিয়ে আসা হয় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে। নারায়ণগঞ্জ এনে তাদের ভুয়া মাদ্রাসার রশিদ ধরিয়ে দিনে ৫০০ টাকা সংগ্রহ করে দিতে বলা হয়। তাতে ব্যর্থ হলে চলে নির্যাতন এবং খাবার না দেয়া। এমন ঘটনা প্রচার হলে পুলিশ গিয়ে শিশুদের উদ্ধার এবং প্রতারক চক্রের ৬ জনকে আটক করে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের যেই বয়সে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয় তা অত্যান্ত সংবেদনশীল বয়স। এসময় তাদের চিন্তা চেতনার ব্যাপ্তি ঘটতে শুরু করে। তাকে যা প্রথমে শেখানো হবে সেটাই সে আপন করে নিবে। এমন বয়সে পড়াশোনার পাশাপাশি মানুষের কাছে যদি হাত পাতা শেখানো হয় তা ভয়াবহ রকম অপরাধ। তাছাড়া নিজ এলাকা থেকে অন্তত ৪/৫ কিলোমিটার দূরে পাঠিয়ে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও ফেলে দিচ্ছে মাদ্রাসাগুলো। এসব বিষয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নজরে না আনলে বিকৃত মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে আগামীর প্রজন্ম।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর