পরীক্ষার এসাইনমেন্ট নিয়ে কপি পেস্ট


ইমতিয়াজ আহমেদ , স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১১:৪০ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০২১, সোমবার
পরীক্ষার এসাইনমেন্ট নিয়ে কপি পেস্ট

চলছে করোনাকাল। স্কুল কলেজ পড়–য়ারা বাড়িতেই সময় কাটায়। মাঝে মধ্যে স্কুল বা কলেজে এর শিক্ষার্থীরা এসাইনমেন্ট লিখতে বসে। সন্তানদের অভিভাবকরা লক্ষ্য করছেন যে, ওদের এসাইনমেন্ট করাটার মধ্যে কিছুটা ফাঁক-ফোকর থেকেই যাচ্ছে। দু’একজন একটু মাথা খাটিয়ে উত্তর লিখলেও অধিকাংশ ব্যস্ত কপি পেস্ট করতে। কপি করছে হাতে লিখে। একজনের খাতা দশজন দেখে কপি করছে। বিষয়টি স্বীকার করে নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা বললেন, একেবারে কিছু না করার চেয়ে কিছু করা ভাল। যারা ট্যালেন্ট, তারা অবশ্য এর মধ্যে থেকেই বেরিয়ে আসবে। তবে আমরা সতর্ক করে দিচ্ছি এসাইনমেন্টের খাতা একজনের সাথে আরেকজনের মিলে গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাজেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উচিত নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে উত্তর লেখা। শুধুমাত্র হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকার চেয়ে এসাইনমেন্ট করা ভাল। অন্ততপক্ষে পড়াশোনার সাথে একটা সংযোগ থাকছে।

এক প্রশ্নের উত্তরে নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, চলতি বছর (২০২১ সাল) জেলায় ১৭৯ টি স্কুলের ৩৫ হাজার ২২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট গ্রহণ করেছে ৩৩ হাজার ৫৭৯ জন পরীক্ষার্থী। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট জমা দিয়েছেন ৩৩ হাজার ৪৩৯ জন পরীক্ষার্থী। এসাইনমেন্ট জমা দেয়নি ১৪০ জন পরীক্ষার্থী। উল্লেখ্য যে, ২০২০ সালে ১৪৪৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিল। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফরম পূরণ করেছে। এ কারণে তাদের এসাইনমেন্ট গ্রহণ ও জমা দিতে হবে না।

সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় ৬২ টি স্কুলের ১৬ হাজার ৬৯২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট গ্রহণ করেছে ১৫ হাজার ৮৮৮ জন পরীক্ষার্থী। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট জমা দিয়েছেন ১৫ হাজার ৮১১ জন পরীক্ষার্থী। এসাইনমেন্ট জমা দেয়নি ৭০ জন পরীক্ষার্থী।

বন্দর উপজেলায় ২২ টি স্কুলের ৩ হাজার ৩৭৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট গ্রহণ করেছে ৩ হাজার ২৪৪ জন পরীক্ষার্থী। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট জমা দিয়েছেন ৩ হাজার ২২০ জন পরীক্ষার্থী। এসাইনমেন্ট জমা দেয়নি ২৪ জন পরীক্ষার্থী।

সোনারগাঁও উপজেলায় ৩১ টি স্কুলের ৪ হাজার ৯০৭ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট গ্রহণ করেছে ৪ হাজার ৫৯৮ জন পরীক্ষার্থী। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট জমা দিয়েছেন ৪ হাজার ৫৬৭ জন পরীক্ষার্থী। এসাইনমেন্ট জমা দেয়নি ৩১ জন পরীক্ষার্থী।

রূপগঞ্জ উপজেলায় ৩৬ টি স্কুলের ৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট গ্রহণ করেছে ৫ হাজার ৪৪১ জন পরীক্ষার্থী। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট জমা দিয়েছেন ৫ হাজার ৪৩৩ জন পরীক্ষার্থী। এসাইনমেন্ট জমা দেয়নি ৮ জন পরীক্ষার্থী।

আড়াইহাজার উপজেলায় ২৮ টি স্কুলের ৪ হাজার ৫০৮ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট গ্রহণ করেছে ৪ হাজার ৪০৮ জন পরীক্ষার্থী। প্রথম তিন সপ্তাহে এসাইনমেন্ট জমা দিয়েছেন ৪ হাজার ৪০৮ জন পরীক্ষার্থী। এসাইনমেন্ট জমা দেয়নি ১০০ জন পরীক্ষার্থী।

একাধিক সূত্রে জানাগেছে, নগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে মিলছে মাধ্যমিক (এসএসসি) ও উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার্থীদের এসাইনমেন্ট। ফটোকপি ও প্রিন্টের (কম্পিউটার) দোকানে এসাইনমেন্ট পাওয়া যাচ্ছে। এসব দোকানের সামনে ‘এসাইনমেন্ট প্রস্তুত করা হয়’ রীতিমত এমন বিজ্ঞপ্তি ঝুলানো থাকে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা গিয়ে তা কিনে নিয়ে আসছেন। এছাড়াও, অনলাইনে মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিভাগের এসাইনমেন্ট রয়েছে। যে কেউ চাইলেই তা ডাউনলোড করতে পারছে। অন্যদিকে, কপি-পেস্ট করে জমা দেওয়া এসব এসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের কোন কাজে আসবে কিনা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে জানানো হয়েছে এসাইনমেন্ট প্রস্তুতের ক্ষেত্রে নকল বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা বাতিল করা হবে।

কপি-পেস্ট বা নকল বন্ধ করতে এসাইনমেন্ট কার্যক্রম সরেজমিনে মনিটরিংয়ে সব সরকারি বেসরকারি স্কুল-কলেজের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষদের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। গত ১৮ আগস্ট মাউশি এ নির্দেশনা দিয়েছেন। কোনো এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার্থী নকল করে বা অসদুপায় অবলম্বন করে এসাইনমেন্ট করলে তা বাতিল করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে কমিটিকে। অধিদপ্তর থেকে সব স্কুল কলেজের প্রধানদের এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নগরীর ‘শিক্ষা পাড়া’ খ্যাত কলেজ রোড ও চাষাড়ার এলাকার বিভিন্ন দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এইচএসসি শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিভাগের এসাইনমেন্ট বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু প্রশ্ন নিতে চাইলে প্রশ্ন, আর প্রশ্ন উত্তর দু’টিই নিতে চাইলে তাও বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি পেইজের দাম নেয়া হচ্ছে ৫ থেকে ১০ টাকা। শিক্ষার্থী, অভিভাবক অথবা যে কেউ দোকানে গেলেই মিলছে এসাইনমেন্ট।

নগরী ছাড়াও এখন উপজেলা ও গ্রামের বিভিন্ন ফটোকপি ও প্রিন্টের দোকানে শিক্ষার্থীদের এসব এসাইনমেন্ট বিক্রি করতে দেখা যায়। দোকানের বাইরে ‘এইচএসসি শিক্ষার্থীদের এসাইনমেন্ট প্রস্তুত করা হয়’ এমন লেখাও রয়েছে। এসব দোকানদারের সাথে কথা বলেন, তারা বিভিন্ন কোচিং এবং অনলাইন থেকে শিক্ষার্থীদের এসাইনমেন্ট প্রস্তুত করছেন। এসব এসাইনমেন্ট মানসম্মত কিনা জানতে চাইলে দোকানদাররা বলেন, অনেকেই তো নিয়ে যাচ্ছেন।

নগরীর বিভিন্ন কলেজের এইচএসসির শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন বা ফটোকপি ও প্রিন্টের দোকান থেকে এসাইনমেন্টের প্রশ্ন উত্তর কপি করে বাসায় বসে হাতে লিখছে। এ এসাইনমেন্টের ফলে কোন উপকার হবে কিনা জানতে চাইলে, উপকার হচ্ছে না বরং সময় নষ্ট হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তারা।

জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, উন্নত বিশে^ সফটওয়্যার অনলাইনে পাঠাতে হয় এবং এসাইমেন্টে নকল ধরার সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। এসাইনমেন্ট কেউ নকল করলে সফটওয়্যারে তা ধরা পড়ে। এসাইনমেন্টের ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার্থীরা নতুন। তাছাড়া, করোনাভাইরাসের এই মহামারির সময় শিক্ষার্থীদের কোন রকমে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট রাখার জন্য এসাইনমেন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের নির্দেশনা রয়েছে, এসাইনমেন্টগুলো বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কোনভাবে এসাইনমেন্ট মিলে গেলে বা কপি মনে হলে, প্রয়োজনে ওই শিক্ষার্থীকে আবার ডাকা হবে। এসাইনমেন্টের ব্যাপারে আমাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করবো।

নগরীর একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষার্থীর অভিভাবক মাহাবুব হাসান জানান, গত বছর করোনার জন্য পরীক্ষা নিতে পারেনি। এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য এসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছে। তবে সবাই দেখছি অনলাইনে বসে দেখে দেখে হাতে লিখছে। কপি-পেস্ট করা এসব এসাইনমেন্ট যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হবে কিনা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এছাড়া, দেখে দেখে লিখে জমা দেওয়া এসাইনমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কী উপকার হবে তা আমার বোধগোম্য নয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ শরিফুল হোসেন বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে- এসাইনমেন্ট প্রস্তুতের ক্ষেত্রে কোন শিক্ষার্থী যদি নকল বা অনিয়মের সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তার এসাইনমেন্ট বাতিল হয়ে যাবে। আমাদের শিক্ষকবৃন্দের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে, যদি কোন শিক্ষার্থী নেট বা অন্য কোথাও থেকে এসাইনমেন্ট কপি করে তা যেন বাতিল করা হয়। প্রতিটি শিক্ষার্থীর ৩০টি এসাইনমেন্ট থাকবে। কোন শিক্ষার্থীর যদি একটি এসাইনমেন্ট বাতিল হয়, তাহলে তার ২৯টি এসাইনমেন্ট কাউন্ট করা হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর