সেই ড্রেজার স্কুল ফের বন্ধের পাঁয়তারা


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১১:২১ পিএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, মঙ্গলবার
সেই ড্রেজার স্কুল ফের বন্ধের পাঁয়তারা

হাইকোর্টের নির্দেশে খুলে দেয়া নারায়ণগঞ্জ শহরের কিল্লারপুলস্থ ৩৩ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ ড্রেজার জুনিয়র হাইস্কুলটি আবারো বন্ধের পাঁয়তারা চলছে। করোনা মহামারীর কারণে সরকার যেখানে দেড় বছর পরে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সেখানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজার পরিদপ্তরের কর্তৃপক্ষ স্কুলটির শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণার্থী আনসারদের বাসস্থানের জন্য অনুমতি দিয়েছে। যে কারণে ব্যহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। এছাড়া করোনা সংক্রমন শুরু হওয়ার পরে দীর্ঘ দেড় বছর ধরেই শিক্ষকদেরও বেতন দিচ্ছেনা কর্তৃপক্ষ। যে কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন শিক্ষকরাও। বারংবার স্কুলটি বন্ধের পাঁয়তারা কারণে শিক্ষার্থীও কমেছে।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারীতে ৩৩ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ড্রেজার জুনিয়র হাইস্কুলটি আকস্মিক বন্ধ ঘোষণার পরে শিক্ষাজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছিল প্রায় ৩শ’ শিক্ষার্থীর। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারী ৩৩ বছরের স্কুলটি হঠাৎ করে বন্ধের কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। দুই সপ্তাহের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক ও নারায়ণগঞ্জের ড্রেজার অধিদফতরের প্রধান প্রকৗশলীকে এ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি জাফর আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই আদেশ দেন। পাশাপাশি মামলার পরবর্তী আদেশের জন্য ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দিন নির্ধারণ রাখা হয়েছিল। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের স্কুলটি বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন আদালত। চার সপ্তাহের মধ্যে মামলা বিবাদীদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেছিলেন রিটকারী ব্যারিস্টার কাজী আখতার হোসাইন। সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন মো. হানিফ ফরহাদ ও এ এইচ এম রেহানুল কবীর রনি। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।

এদিকে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরে হাইকোর্টের রুল জারি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের হস্তক্ষেপে ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজার পরিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শামসুদ্দিন আহমদ স্কুলটির শিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে তালা খুলে দেন। সেসময় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শামসুদ্দিন আহমদ বলেন, স্কুলটি বন্ধ হোক সেটা আমি কখনোই চাইনি। কিন্তু নীড বেইসড সেটআপে ড্রেজার পরিদপ্তর অর্ন্তভুক্ত না হওয়ার কারণে আমার কিছুই করণীয় ছিলনা। যা কিছুই করা হয়েছে সেটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই হয়েছে। আমি শুধু নির্দেশ পালন করেছি। এখানে আমার কিছু করণীয় ছিলনা। আমি চাই স্কুলটি যাতে সঠিকভাবে চলে। এক্ষেত্রে আমি পূর্ণ সহযোগিতা করবো। তিনি আরো বলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা স্কুলটি পুণরায় চালু করার জন্য বলেছেন। স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমান মহোদয়ের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। আমি তাকে আশ্বস্ত করেছি স্কুলটি পুণরায় চালু হবে।

পরে ওই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারী স্কুলটি পরিদর্শনে আসেন নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর ও বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান। সেসময় সেলিম ওসমান জানিয়েছিলেন স্কুলটি আগে ড্রেজার পরিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কিন্তু আর্থিক সঙ্গতি দেখিয়ে স্কুলটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাবান্ধব। যেহেতু শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এজন্যই আমার এখানে আসা। পরে স্কুলটি খুললেও স্কুলটি কিভাবে চলবে কারা পরিচালনা করবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা ছিলনা। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের ড্রেজার কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের কাছে লিখিত দায়িত্ব দেয় তাহলে আমি (সংসদ সদস্য) ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা মিলে যৌথভাবে সভা করে সিদ্ধান্ত নিবো। সেক্ষেত্রে স্কুল ও এর সামনের মাঠটি সহ স্কুলের জন্য লিখিতভাবে বরাদ্দ দিতে হবে। যে কারণে আমরা কাছে আবেদন জানিয়েছি স্কুলটি যদি তারা পরিচালনা করতে না পারে তাহলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসনকে স্কুলটি পরিচালনায় লিখিত অনুমতি দেয়া হোক। কারণ স্কুলটি অত্যাধুনিকভাবে চালাতে হলে লিখিত সম্মতিটা জরুরীভাবেই দিতে হবে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার মালা জানান, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরে হাইকোর্টের রুল জারি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের হস্তক্ষেপে ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী ড্রেজার পরিদপ্তর কর্তৃপক্ষ স্কুলটি খুলে দেয়। কিন্তু স্কুলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এই ঘোষণা তখন শিক্ষার্থী অনেক কমে গিয়েছিল। পরে আবারো স্কুলটি চালুর পরে আমরা অনেক শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে আনলেও ড্রেজার পরিদপ্তর কর্তৃপক্ষ স্কুলটি পরিচালনার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসনকে লিখিত অনুমতি দেয়নি। যে কারণে ইচ্ছা থাকা সত্বেও এমপি সেলিম ওসমান স্কুলটির দায়িত্ব নিতে পারেনি। করোনা সংক্রমন শুরু হওয়ার পরে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে সারাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্কুলটিও দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। স্কুল বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষকদের বেতনও। আমরা শিক্ষকরা অত্যন্ত মানবেতর ভাবেই জীবন যাপন করেছি। চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয় সরকার। সে অনুযায়ী ড্রেজার জুনিয়র হাইস্কুলটিও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে পাঠদান চালু করেন শিক্ষকরা। তবে ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পরে ড্রেজার জুনিয়র হাইস্কুলটির দ্বিতীয় তলার ৪টি শ্রেণিকক্ষে অবস্থান নেয় প্রশিক্ষনার্থী আনসার সদস্যরা। ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে স্কুলটির শিক্ষক শিক্ষার্থীরা স্কুলে এসে দেখতে পান তাদের স্কুলের সামনে প্রশিক্ষনার্থী আনসার সদস্যরা কুচকাওয়াজ করছে। দ্বিতীয় তলার ৪টি শ্রেণিকক্ষের সকল বেঞ্চ টেবিল শ্রেণিকক্ষের বাইরে বারান্দায় রেখে প্রশিক্ষণার্থীদের বাসস্থান বানানো হয়েছে। এছাড়া স্কুলটির বেশ কিছু টেবিলে ও বেঞ্চও অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজার পরিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আজিজুল হকের কাছে মুঠোফোনে তিনি কল করেছিলেন। কিন্তু প্রধান প্রকৌশলী ব্যস্ততার অজুহাতে পরবর্তীতে তার সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি আরো জানান, ২০১৯ সাল থেকে স্কুলটি বন্ধের পায়তারা চলছে। বর্তমানে এটিকে ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে ভাড়া দেওয়ার পায়তারা চলছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর স্কুল চালুর পরে ২য় শ্রেণি থেকে ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে এসেছে। তবে ড্রেজারের প্রধান ফটকে দাড়িয়ে থাকা আনসার সদস্যরা শিক্ষার্থীদের দেখলেই বলে তোমার স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হবে অন্যত্র চলে যাও। যে কারণে অনেক শিক্ষার্থীই এখন অন্যত্র চলে যাচ্ছে। স্কুলটিতে ৬টি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় তলার ৪টিতে বর্তমানে আনসার প্রশিক্ষণার্থীদের দখলে। যে কারণে ২টি শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস করাতে হচ্ছে। পাশাপাশি আনসার প্রশিক্ষণার্থীরাও মাস্ক ছাড়াই অবাধে ঘোরাফেরা করছে। এতে তাদের যেমন পাঠদান ব্যহত হচ্ছে তেমনি শিক্ষক শিক্ষার্থীরাও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি দ্রুত স্কুলটির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।

প্রশিক্ষনার্থীদের দায়িত্বে থাকা আনসার কমান্ড্যান্ট সোনারগাঁ উপজেলার টিআই উত্তম কুমার দেবনাথ জানান, ড্রেজার পরিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আজিজুল হকের অনুমতি সাপেক্ষেই তারা স্কুলের শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষনার্থীদের থাকতে দিয়েছেন। প্রশিক্ষণের বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়ও অবগত আছে। এর আগে তারা আইইটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়েও প্রশিক্ষণ করিয়েছিলেন। স্কুলটির দ্বিতীয় তলায় বর্তমানে ৪২ জন প্রশিক্ষণার্থী রয়েছে। ২১ দিন ব্যপী প্রশিক্ষণ চলবে। তবে আনসারের পক্ষ থেকে যখন অনুমতি নেয়া হয় তখন তিনি জানতেন স্কুলটিতে তেমন একটা শিক্ষার্থী নেই। ক্লাসরুমগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে। তিনিও চান না শিক্ষার্থীদের পাঠদানে কোন ধরনের ক্ষতি হোক। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের সময়ে মাস্ক পড়ে প্রশিক্ষণ করা যায়না। তবে বাকী সময় প্রশিক্ষণার্থীরা মাস্ক পড়ে নেয়।

ড্রেজার পরিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আজিজুল হকের অফিসে গেলেও তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর