প্রতারিত হয়ে খাঁটি মধুর সফল ব্যবসায়ী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৩৪ পিএম, ১৬ জানুয়ারি ২০২১, শনিবার
প্রতারিত হয়ে খাঁটি মধুর সফল ব্যবসায়ী

প্রাণঘাতি করোনায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ওলটপালট হয়ে গেছে। করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন অনেকের আপনজন। কিন্তু করোনার প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে পুষ্টিকর খাদ্য মধু সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হয়েছে অনেককে। এমন বিরুপ অভিজ্ঞতার শিকার হয়ে ই-কমার্সকে ব্যবহার করে এখন নিজেই বনে গেছেন খাঁটি মধুর সফল ব্যবসায়ী। মানুষের মাঝে খাঁটি পন্য পৌছে দেওয়ার পাশাপাশি আয় করছেন লাখ টাকা।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে ই-কমার্স প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে সফলতা অর্জন করা সফল উদ্যোক্তা হচ্ছেন মোহাম্মদ নাহিদ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবার বড় ছেলে মোহাম্মদ নাহিদ বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএ সম্পন্ন করেছেন। পড়াশোনা শেষে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশাপাশি নাহিদ আনসার ও ভিডিপির একজন ওয়ার্ড দলনেতা এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে জড়িত।

মোহাম্মদ নাহিদের উদ্যোক্ত হওয়ার শুরুর গল্পটা মর্মান্তিক। প্রাণঘাতি করোনায় নাহিদের পরিবারের ৮ জন সংক্রমিত হয়েছিল। হারাতে হয়েছে পরিবারের ১ সদস্যকে। পরিবারের সদস্যরা যখন করোনায় আক্রান্ত। তখন তাঁদের সুরক্ষার জন্য খাঁটি মধু, শরিষার তেল, তিলের তেল খুঁজতে থাকেন। কারণ করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষায় ওষুধীগুণ সম্পন্ন এসব খাদ্যের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তবে তিনি কোনো ভাবেই খাঁটি জিনিস পাচ্ছিলেন না।

এরপর তাঁর বোন পরামর্শ দিয়েছেন যে কষ্ট সে করেছে এই কষ্ট যেন আর কাউকে করতে না হয়। সাধারণ মানুষের মাঝে খাটি পন্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য নাহিদকেই এসব পন্য বিক্রি করতে বলেন। এরপর থেকেই শুরু হয় নাহিদের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প।

নাহিদের বন্ধু ও সহকর্মী তাওলাদ হোসেনের মাধ্যমে যুক্ত হয় উদ্যোক্তাদের অনলাইন প্লাটফর্ম ‘নারায়ণগঞ্জ বাই এন্ড সেল’ নামক ফেসবুক গ্রুপে। গত জুলাইয়ে তারিখে প্রাকৃতিক চাকের খাঁটি মধু ও ঘানিতে ভাঙ্গানো খাঁটি সরিষার তেল নিয়ে শুরু ই-কমার্স উদ্যোগ ‘বন্ধন’ নামে প্রাতিষ্ঠানিক নাম দিয়ে ব্যবসায় জীবনে পথ চলা শুরু করেন। আর পেছনে তাঁকাতে হয়নি নাহিদকে।

খাঁটি মধু সংগ্রহের জন্য নাহিদ মধু সংগ্রহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মধু সংগ্রহকারীরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে মধুর চাক খুঁজে বের করেন। নাহিদ সেখানে নিজে উপস্থিত হয়ে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করে তাঁদের থেকে কিনে নেন। একই প্রক্রিয়ায় যারা তেল উৎপাদস করেন তাঁদের থেকে তেল সংগ্রত করেন।

পথ চলা প্রসঙ্গে নিউজ নারায়ণগঞ্জকে নাহিদ বলেন, ‘আমার পরিবারের ৮ সদস্যের যখন করোনা শনাক্ত হয় তখন হন্যে হয়ে খাঁটি মধু খুঁজি। কারণ খাঁটি মধু খাওয়ালে নাকি করোনার প্রভাব কমে যায়। কিন্তু কোথাও খাঁটি মধু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যে কারণে খাঁটি মধু খুঁজে পেতে খুব কষ্ট হয়েছে। আমি যেহেতু স্বেচ্ছাসব হিসেবে কাজ করি। আমার বোন আমাকে পরামর্শ দেয় যে আর কাউকে যেন এমন কষ্ট করতে না হয়। আমি যেন খাঁটি মধু বিক্রি করি। তাহলে কেউ প্রতারিত হবে না। এভাবেই শুরু হয়।’

তিনি বলেন, ‘পরে আমি এবং তাওলাদ এ বিষয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক অনেক কিছুই আলাপ করি। প্রথমে আমি মধু ও সরিষার তেল নিয়ে কাজ শুরু করি। পরে তিলের তেল সহ আরো কিছু পণ্য যুক্ত করি। এভাবেই আমার শুরু। ই-কমার্স করার জন্য নির্দিষ্ট সময় ও অফিসের প্রয়োজন নেই। সবদিক বিবেচনা করে ই-কমার্স পেশা আমার স্বপ্ন থেকে সত্যিতে পরিণত হয়।’

নাহিদ বলেন, ‘উদ্যোক্তা জীবন মানেই চ্যালেঞ্জে ভরপুর। এছাড়াও আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরী করি। চাকরী এবং ব্যবসা একসাথে চালানোটা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং কারন নারায়ণগঞ্জ এর ডেলিভারিগুলো আমি নিজেই দেই। এতে কাস্টমারের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি হয়। মূলত আমার কাজের প্রতি আন্তরিকতা আর ভালোবাসাই এসব চ্যালেঞ্জ জয় করতে সাহায্য করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ব্যবসায়ীক দিক চিন্তা করে আমি এ কাজ শুরু করিনি। আমি খাঁটি মধু সংগ্রহ করে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি শুরু করি। এ পর্যন্ত এক লাখের বেশি টাকার মধু বিক্রি করেছি।’

নাহিদ বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ বাই এন্ড সেল গ্রুপ নারায়ণগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বড় উদ্যোক্তাদের প্লাটফর্র্ম। এ ধরণের প্লাটফর্মগুলো উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরীতে বড় ভূমিকা পালন করছে। আমরা যারা নতুন উদ্যোক্তা তাদের জন্য এ ধরণের ফেসবুক গ্রুপ আত্মবিশ্বাসের জায়গা।’

ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানিয়ে নাহিদ বলেন, ‘বন্ধন নিয়ে আমার একটা লক্ষ্য আছে। আমাদের সংগৃহিত খাঁটি মধু বাংলাদেশ সহ বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই।’

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর