সিমেন্ট কারখানাগুলোর ট্রাকগুলো যখন ঘাতক


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:৫৭ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০২১, বৃহস্পতিবার
সিমেন্ট কারখানাগুলোর ট্রাকগুলো যখন ঘাতক

নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা মেঘনা ও ধলেশ^রী নদীর তীরে গড়ে ওঠা ১৭টি সিমেন্ট কারখানা আশীর্বাদ না হয়ে যেন অভিশাপে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সিমেন্ট কারখানাগুলো বায়ু দূষণসহ বিভিন্নভাবে সাধারণ মানুষের জীবন একে একে কেড়ে নিচ্ছে। সিমেন্ট কোম্পানির যন্ত্রণার পাশাপাশি তাদের ট্রাকগুলোর বেপরোয়া চলাচল কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। গত কয়েক বছরে সিমেন্ট কোম্পানীগুলোর ট্রাক কাভার্ডভ্যানের চাপায় না ফেরার দেশে চলে গেছে পুলিশ, গার্মেন্টের মালিক, সাংবাদিক, স্কুলছাত্রসহ অনেক সম্ভাবনাময় প্রাণ। এছাড়াও সিমেন্ট কোম্পানীগুলোর ট্রাক কাভার্ডভ্যানগুলো ওভারলোডের কারণে সড়কগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়েই প্রতিনিয়ত সড়কপথে চলতে হচ্ছে যাত্রীসাধারণকে।

জানা গেছে, নব্বই দশকের আগ পর্যন্ত সিমেন্ট আমদানী করেই চলতে হতো বাংলাদেশকে। কিন্তু ১৯৯৫ সালের পর থেকে বদলেছে চিত্র। দেশেই গড়ে ওঠেছে অসংখ্য সিমেন্ট কারখানা। যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও মেঘনার তীরেই ১৭টি। এগুলো হলো শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে বন্দরের নবীগঞ্জে আকিজ সিমেন্ট, মদনগঞ্জে সিমেক্স সিমেন্ট (ইনসি) বাংলাদেশ লিমিটেড, মদনগঞ্জে বসুন্ধরা সিমেন্ট, সিদ্ধিরগঞ্জে ইষ্টার্ন (সেভেন হর্স) সিমেন্ট লিমিটেড, রূপগঞ্জের টাটকীতে স্ক্যান (হাইডেলবার্গ) সিমেন্ট, মীর সিমেন্ট লিমিটেড, সৈয়দপুর মুক্তারপুর এলাকায় প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস লিমিটেড, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ^রী নদীর তীরে মুক্তারপুর এলাকায় শাহ সিমেন্ট ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেড, ধলেশ^রী নদীর তীরে মুক্তারপুর এলাকায় ক্রাউন সিমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড, মেট্রোসেম সিমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড, এ্যামিরেটস সিমেন্ট কোম্পানী, মেঘনা নদীর তীরে সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজারে অবস্থিত আমান সিমেন্ট লিমিটেড, সোনারগাঁ কুতুবপুরে লাফার্জ মোংলা সিমেন্ট, চররমজান এলাকার হোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড ও ইউনিক সিমেন্ট লিমিটেড, মেঘনাঘাটের এমটিসি (মদিনা) সিমেন্ট ও রাইপাড়া এলাকার আনোয়ার সিমেন্ট লিমিটেড।

দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সিমেন্ট কোম্পানিগুলো। তবে মানুষের জীবন ধারণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বায়ু তথা পরিবেশের প্রতি তাঁদের বড় ধরণের উদাসীনতাও দৃশ্যমান। ঠিকমতো ডাস্ট কন্ট্রোল প্রযুক্তি ব্যবহার না করায় এসকল সিমেন্ট কারখানা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে, সালফার ও সিলিকনযুক্ত সূক্ষ্ম ধুলিকণা। সিমেন্ট উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বায়ুমান নিয়ে, খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীর করা ২০১৭ সালের এক গবেষণা ফলাফল বলছে- প্রতি মেট্রিকটন সিমেন্ট উৎপাদনে ধুলো তৈরী হয় ৫১ গ্রাম। আর, একটি সিমেন্ট কারখানা থেকে বছরে ৫০.২ মেট্রিকটন ধুলো ছড়ায় তার চারপাশে। যার মধ্যে থাকে ক্যালসিয়াম অক্সাইড, সিলিকন অক্সাইড, অ্যাল্যুমিনিয়াম অক্সাইড, ম্যাগনেসিয়াম অক্সাউড, সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং অতি সুক্ষ্ম ধুলিকণা পিএম ০.৫।

আইন অনুযায়ী বায়ুতে ভাসমান বস্তর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ২০০ পিপিএম। কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশি মাত্রার ধূলিকণা বায়ুতে ছাড়ছে নারায়ণগঞ্জের। এসকল সিমেন্ট কারখানার কোনো কোনোটি গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি ধূলিকণা ছাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশীরভাগ সিমেন্ট কারখানার নেই ধুলা প্রতিরোধক ব্যবস্থা। প্রাথমিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করছেন শ্রমিকরা। এক গবেষণা বলছে, শুধু একটি সিমেন্ট কারখানায়ই বছরে প্রায় ৫০ মেট্রিকটন ধুলো উৎপন্ন করে। সিমেন্ট কারখানাগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়ছে, সালফার ও সিলিকনযুক্ত সূক্ষ্ম ধুলিকণা। ফলে বাড়ছে ফুসফুসের অনিরাময়যোগ্য সিলিকোসিস রোগ ও ক্যানসার।

এদিকে সিমেন্ট কারখানাগুলো যেমন দূষণ ছড়াচ্ছে তেমনি তাদের কারখানাগুলোর ট্রাক কাভার্ডভ্যানগুলোও চলছে অতিরিক্ত সিমেন্ট বোঝাই করে। যে কারণে নারায়ণগঞ্জের বেশীরভাগ সড়কই নির্মাণের কিছুদিনের ব্যবধানেই ভেঙ্গে যাচ্ছে। বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পঞ্চবটি পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। একই অবস্থা সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাট সড়কেরও।

এছাড়া সিমেন্ট কারখানাগুলোর ট্রাক কাভার্ডভ্যান চালকদের বেপরোয়া চলাচলও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটাচ্ছে। সর্বশেষ ১৮ অক্টোবর রাতে ফতুল্লায় শাহ সিমেন্ট কারখানার একটি ট্রাকচাপায় পিষ্ট হয়ে শফিকুল ইসলাম জনি নামে এক সাংবাদিক নিহত হয়েছে। রাত সাড়ে ১০টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কে ফতুল্লার পঞ্চবটি কলোনির সামনে ট্রাক তাকে চাপা দেয়। তখন দ্রুত তাকে রাজধানী ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ৩টায় মৃত্যুবরন করেন। নিহত সাংবাদিক জনি ফতুল্লার ইসদাইর গাবতলী খানকা এলাকার আমির হোসেনের ছেলে। তার স্ত্রী ও ২ বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। জনি ফতুল্লা মডেল প্রেসক্লাবের সদস্য, চ্যানেল এস টিভির ফতুল্লা প্রতিনিধি ও নারায়ণগঞ্জের আলো নামে একটি স্থানীয় পত্রিকার ফটো সাংবাদিক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ফটো নারায়ণগঞ্জ অনলাইন পোর্টালেরও সম্পাদনা করতেন। ১৯ অক্টোবর সকাল ১১টায় স্থানীয় মসজিদে তার জানাজা নামাজ শেষে মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

এদিকে ১৮ অক্টোবর রাত ৯টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কে ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় একটি অজ্ঞাত ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ২৬ বছর বয়সী সিমা বেগম নামে এক গৃহিনীর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার সময় ট্রাকটি বেপরোয়া গতিতে ফতুল্লার পঞ্চবটির দিকে পালিয়ে যায়। ধারনা করা হচ্ছে ওই ট্রাকটিও কোন সিমেন্ট কোম্পানীর ট্রাক হতে পারে। নিহত সিমা ফতুল্লার আফাজনগর এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী সোহেল মিয়ার স্ত্রী।

২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়কের গোগনগরে প্রিমিয়ার সিমেন্টের কাভার্ডভ্যানের চাপায় দ্ইুজন নিহত হয়েছে। নিহত অটোরিকশা চালক জামাল হোসেন (৪০) সদর উপজেলার গোগনগরের ভাসানী সরদারের ছেলে ও যাত্রী মাসুদ মিয়া (৪২) রাজধানীর কামরাঙ্গির চর এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে। এসময় স্থানীয়রা কাভার্ড ভ্যানটি আটক ও ভাঙচুর করে। তবে এর চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। ৭ সেপ্টেম্বর ফতুল্লার দেলপাড়ায় ট্রাকের চাপায় আরাফাত হোসেন (১৫) নামে নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র নিহত হয়েছে। ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট বন্দরের কদমরসুল পূর্বপাড়া এলাকায় আকিজ সিমেন্টের ট্রাকের চাপায় এক স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে। নিহত সাফায়েত (৯) কদম রসুল কিন্ডার গার্টেন স্কুলের ৩য় শ্রেণির ছাত্র ও একই এলাকার মাসুম মিয়ার ছেলে। এদিকে উত্তেজিত জনতা ট্রাকটি ভাঙচুর ও চালকের সহকারীকে আটক করলেও চালক পালিয়ে যায়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির গাড়ি এ রাস্তা দিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ট্রায় সময় ভারি মালবাহী গাড়িতে অনেকে দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত হচ্ছে।

১১ মার্চ ফতুল্লায় ট্রাক চাপায় রুহুল আমিন (৪০) নামে দিনমজুর নিহত হয়েছে। ৬ মার্চ ফতুল্লায় কাভার্ডভ্যানের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহি মঞ্জুরুল মাজেদ সৌরভ (৩২) এনজিও কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। ১ মার্চ ফতুল্লায় দাপায় মালবাহী ট্রাকের চাপায় লাল মিয়া (৩৫) নামের রোলিং মিল শ্রমিক নিহত নিহত হয়েছে।

২০১৮ সালের ৫ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ বন্দরে বসুন্ধরা সিমেন্ট কারখানার গেইটের সামনে সিমেন্ট বোঝাই কভার্ড ভ্যানের চাপায় ট্রাক হেলাপর নিহত হয়েছে। নিহত হেলপার সজল (১৮) গোপালগঞ্জ জেলা ও থানার ভবানীপুর গ্রামের বাবলু শেখের ছেলে।

১১ ফেব্রুয়ারী বন্দরে মদনগঞ্জ-মদনপুর সড়কের ফরাজীকান্দা এলাকায় সিমেক্স সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর ট্রাক চাপায় আপন (২৮) নামে এক অটোরিকশা চালকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে।নিহত আপন সুদূর কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানা এলাকার আব্দুল খালেকের ছেলে। সে দু’সন্তানের জনক।

২০১৫ সালের ৬ মার্চ রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার কালাদী এলাকার এশিয়ান হাইওয়ে (বাইপাস) সড়কে ট্রাকের চাপায় ইটবোঝাই ট্রাক্টরের চালক বিল্লাল হোসেন (৩২) নামে একজন নিহত ও দুইজন আহত হয়েছেন। নিহত বিল্লাল হোসেন উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের দেবই এলাকার আব্দুল সামাদ মিয়ার ছেলে।

২০১২ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে ফতুল্লায় ট্রাকের চাপায় পিষ্ট হয়ে একটি রফতানিমুখী গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমপি) মিতু সাহা (৩৮) মারা গেছে। ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীতে গার্মেন্টসের কাজ শেষ করে রিকশায় করে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-পাগলা সড়কের পঞ্চবটি মোড়ে পেছন থেকে সিমেন্টবাহী একটি ট্রাক চাপা দিলে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। মিতু সাহা ফতুল্লার বিসিক শিল্পাঞ্চলের শৈবাল গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার স্বামীর নাম মৃত জীবন কুমার সাহা। তিনি শহরের টানবাজার এলাকায় থাকতেন।

একই বছরের ৬ জুন নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনের সময় সিমেন্টভর্তি একটি কাভার্ড ভ্যানের চাপায় পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আরিফুল হক আরিফ নিহত হয়েছেন। রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়কের কাশীপুর হাটখোলা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর