নলুয়া পাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের তান্ডবের পরও হুমকি


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:১৯ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, রবিবার
নলুয়া পাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের তান্ডবের পরও হুমকি

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৮ নং ওয়ার্ড উত্তর নলুয়া পাড়া এলাকায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিধান (৯) ও তার পরিবারের সদস্যদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগের পরে প্রাণনাশের হুমকি দেয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা।

২০ সেপ্টেম্বর রোববার বিকেলে ভুক্তভোগী বিধান ও হামলায় আহত তার পরিবার স্বজনদের বক্তব্যে কিশোর গ্যাংয়ের তান্ডবের নানা তথ্য উঠে আসে। এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে সদর মডেল থানায় বিধানের মা বিনু বেগম অভিযোগ করে।

বিবাদীরা হল- সোহেল মিয়ার ছেলে শুভ (১৩), শুভ (২০), হুমায়ুন কবিরের ছেলে জুম্মান (২৪), হুমায়ুন কবিরের ছেলে জিয়ন কবির (১৮), সেলিমের ছেলে ফাইদ (২৩) সহ আরো ৭-৮ জন।

বিধান বলে, আমি আমাদের গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেখান থেকে থুথু ফেললে তা শুভর গায়ে গিয়ে পড়ে। এতে আমি গেঞ্জি খুলে থুথু মুছে দেই। এরপরেও সে আমাকে মারধর করে।

বিধানের বড় ভাই বলে, আমি ওই সময় দূর থেকে দেখতে পাই বিধানকে শুভ ৪-৫ টা চড় মারছে। এতে আমিও গিয়ে শুভকে চড় মারি। তখন সে হুমকি দিয়ে বলে, ‘দাঁড়া তর বাপেগো নিয়া আইতাছি।’ পরবর্তীতে সে ১৫-২০ জন নিয়ে এসে প্রথমে গালাগালি করে ও পরে আমাকে বেধড়ক মারধর করে। সেসময় তাদের হাতে লোহার এসএস পাইপ সহ দেশিয় অস্ত্র ছিল। সাইফ, সাব্বির, জুম্মান, জিয়ন, তনয় সহ আরো অনেকে ছিল। কিন্তু এতো জনের মধ্যে সবাইকে চিনতে পারিনি। এই গ্যাংয়ের সবাই মসজিদের আশে পাশে থাকে।

বিধানে মা অভিযোগ করে বলেন, আমি শুনতে পাই আমার ছেলেকে কে বা কারা মারধর করে তুলে নিয়ে গেছে। এই কথা শুনে ছুটে যাই। সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখি আমার ছেলেকে ঘেরাও করে একদল ছেলেরা মারছে। আমি চিৎকার করে আমার ছেলেকে জড়িয়ে ধরলে আমাকেও এলোপাথাড়ি মারধর করে। সাকিব, জুম্মন, বাধন, শিমন, আলামিন সহ আরো অনেকে মারধর করে। সবাইকে আমি চিনতে পারিনি। এই ঘটনা শুনে আমার বোন ও ভাইয়ের বউ এগিয়ে আসে। তাদেরকেও মারধর করে। সেসময় আমার পড়নে থাকা জামা ছিড়ে ফেলে। আমার ছেলে ও আমাকে ইট দিয়ে আঘাত করে নীলাফুলা জখম করে। আর আমার ছেলের চোখের নিচে আঘাত করলে প্রচন্ড রক্তপাত হয়।

হুমকির ব্যাপারে তিনি বলেন, এই ঘটনায় আমার ছেলেকে নিয়ে থানায় গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। এতে গতকাল রাতে তারা ফোন দিয়ে আমাকে হুমকি দিয়েছে। ফোনে বলে, ‘আমাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিছিস তোর ছেলেকে নিয়ে মেরে ফেলবো। শান্তিতে ঘুমাইছ।’ এছাড়া তারা কয়েকটা মোটরসাইকেলে করে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে দফায় দফায় মহড়া দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, সন্ত্রাসী ভিকির শেল্টারে এই কিশোর গ্যাংয়ের ছেলেরা এলাকায় সব সময় উৎপাত করে থাকে। এলাকা দিয়ে স্কুলের মেয়েরা শান্তিতে চলাফেরা করতে পারেনা। যুবক যুবক মেয়েদের নানা বাজে মন্তব্য সহ ওড়না টান দেয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এছাড়া মাদক সেবনের বিষয় তো ওপেন সিক্রেকে পরিণত হয়েছে।

এ ব্যাপারে ১৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কবির হোসেন বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর আমি একটা মিটিংয়ে ছিলাম। এরই মধ্যে একটা ফোন পেলাম এলাকায় একটা ঝগড়া হয়েছে। বিধান নামে একটা ছেলেকে মারধর করা হয়েছে। এলাকার কিশোর গ্যাং নামে পরিচিত একটি গ্রুপ আছে তারা ওই ছেলেটাকে মেরেছে। তো এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় পক্ষ বিপক্ষ হয়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পরে আমি সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান কে ফোন দিয়ে এই বিষয়ে অবহিত করি। এবং উভয় পক্ষকে শান্ত করতে বলি। পরবর্তীতে মিটিং থেকে অফিসে আসার পরে ওসি স্যারের সাথে আমার কথা হয়। তখন আমি তাকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করলে তিনি আমাকে ঘটনাস্থলে গিয়ে মূল ঘটনা সম্পর্কে জানাতে বলে। এরপর ঘটনাস্থলে গিয়ে মূল ঘটনা জেনে আমি তাকে অবহিত করি। এদিকে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারাও তাকে ঘটনার বর্ণনা দেয়। পরবর্তীতে আমি দুই পক্ষকে শান্ত করে বাসায় চলে যাই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী সেখানে গিয়েছি। কেউ যদি প্রমাণ দিতে পারে আমি সেখানে কাউকে নির্দেশনা দিয়েছি ধর, মার, পিটা এমন প্রমাণ দিতে পারলে আমি কাউন্সিলরের চেয়ার কালকে ছেড়ে দিব। এবং জুতোর মালা নিয়ে পুরো এলাকা ঘুরবো। আর এই পদ থেকে প্রকাশ্যে রিজাইন দিব।

তিনি আরো বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে যে আমি এই হামলার নির্দেশদাতা। আমি নাকি উষ্কে দিয়েছি মারামারি করার জন্য। আমি সেসময় এলাকায় ছিলাম না। আমি ছিলাম এলাকার বাইরে একটা মিটিংয়ে। এই মারামারির ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পরে সেখানে পৌঁছাই। যখন পুলিশ প্রশাসন পরিস্থিতি শান্ত করে তখন আমি সেখানে যাই। সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুল হাইয়ের উপস্থিতিতে আমি সেখানে যাই। সেসময় আমি বরং তাকে সহযোগিতা করি এই পক্ষের ছেলেদের শান্ত করার জন্য। উনি নিজেই দেখেছে, আমি ঘটনার প্রায় ১ ঘণ্টা পর সেখানে উপস্থিত হই। তাহলে আমি কিভাবে এই ঘটনার মদদ দাতা বা ইন্ধনদাতা হলাম।

এ ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তা ও সদর মডেল থানার এস আই রিয়াজুলকে ফোন করে পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্র বলছে, এই হামলার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের আরো অনেকে রয়েছে। তাদের মধ্যে সাজিদ, সাইফ, শিমন, তনয়, মিম, সাব্বির, শুভ, বাধন, শাকিল, শুভ, ইমরান সহ একটি বড় গ্যাং রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে থুথু ফেলাকে কেন্দ্র করে বিধানকে মারধর করে শুভ। পরে বিধানে বড় ভাই নিঝুম শুভকে চড় থাপ্পর মারলে শুভ তার সহযোগিদের নিয়ে তাদের মারধর করে। এসময় বিধানে মা এগিয়ে আসলে তাকেও মারধর করে। পরে তার অন্য স্বজনরা এগিয়ে আসলে তাদেরও মারধর করে। এসময় স্থানীয়রা ক্ষিপ্ত হয়ে কিশোর গ্যাংয়ের গ্রুপকে পাল্টা ধাওয়া করে। এতে করে দফায় দফায় দুই গ্রুপের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। পরে পুলিশ প্রশাসনে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এসময় আরো আহত হয়-মিনু, রানি, জাহাঙ্গীর, রিপন, কাঞ্চন, দুর্লব, সালাম, টুটুল, ইমরান, জিয়াসমিন সহ আরো অনেকে।

 

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর