যে কারণে ট্রেন লাইনচ্যুত (ভিডিও)


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:৫০ পিএম, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার
যে কারণে ট্রেন লাইনচ্যুত (ভিডিও)

কেনো ট্রেন লাইনচ্যুত হল। এই প্রশ্নটি ছিল সকলের মুখে মুখে। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল দায়িত্বে অবহেলার কথা। নিয়মিত রেললাইন চেক করার কথা থাকলেও তা হয়নি। করোনাকালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে লোকাল ট্রেন বন্ধ ছিল দীর্ঘ ৬ মাস। এই ৬ মাসে একটি বারের জন্যও লাইনের অবস্থা চেক করা হয়নি। চলছে বর্ষাকাল। বর্ষায় রেললাইনের গোড়ায় মাটি নরম হয়ে লাইনের ক্ষতি হয়। মাটি নরম হওয়ার সাথে সাথে স্লিপারের নাট বল্টুও লুজ হয়ে যায়। সেকেত্রে নাট-বল্টু টাইট দিতে হয়। যাতে স্লিপার কিম্বা রেলের পাত সরে না যায়। কেননা স্লিপার কিম্বা পাত সরে গেলে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তেমনটিই ঘটেছে ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ২ নং রেলগেইট এলাকায়।

দুপুর ১ টায় ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার সময় ২নং গেইট ক্রস করার সময় লাইনের বামপাশের এক্সট্রা পাতটি স্লিপার থেকে একটু একটু করে সরে যায়। কম গতিতে এগিয়ে যাওয়া ট্রেনটি এ সময় বামপাশে কাত হয়ে যেতে শুরু করলে চালক বোসকেবিন থেকে একটু এগিয়ে ব্রেক করেন। ওই সময় যাত্রীরা ভয়ে ট্রেন থেকে লাফ দেয়। রেললাইনের দু’পাশের দোকানদাররা ভয়ে পেয়ে যান। মহান আল্লাহপাকের অশেষ রহমতে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

জানা গেছে, প্রতিটি রেলস্টেশনে গ্যাং ও মিস্ত্রী রয়েছে। যারা প্রতিনিয়ত রেললাইন চেক করে। কোথাও স্ক্রু ঢিলা হয়ে গেলে বা স্ক্রু ছুটে গেলে মিস্ত্রী কয়েকজন খালাসী নিয়ে এসব মেরামত করে। ট্রেন লাইন সংস্কার করা হবে শ্যামপুর ওয়াসা গেইট থেকে পাগলা পর্যন্ত। এবং গলাচিপা থেকে উকিলপাড়া পর্যন্ত। লাইন উঁচু করা হবে পাথর ফেলে। সে সাথে সংস্কার হবে ট্রেনলাইন সংলগ্ন ড্রেনলাইন। বর্ষাকালে ট্রেনলাইনের মাটি সরে যায়। নিয়মিত লাইন চেক করতে হয়। প্রয়োজনে পাথর ফেলে লাইন মেরামত চলে। অভিযোগ রয়েছে, পাগলা, ফতুল্লা অংশে নিয়মিত রেললাইনের পাথর ও স্লিপার চুরি হয়। অনেক নেশাখোর লোহার ক্লিপ, স্ক্রু নাট বল্টু খুলে নিয়ে যায়।

সূত্রমতে, রেলওয়েতে প্রায় ৭৫ শতাংশ ট্রেন লাইনচ্যুত হয় শুধু ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইনের কারণে। প্রতিনিয়ত ইলাস্টিক রেল (প্যান্ডেল) ক্লিপ ও নাট-বল্টু চুরি হওয়ায় ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়েই ট্রেন চালাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, রেলপথে বছরে প্রায় ৫ লাখ পিস ক্লিপ চুরি হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া পরিত্যক্ত রেললাইন, রেলবিট, লেভেল ক্রসিংয়ের রেল, ফিশপ্লেটও চুরি হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। চুরি যাওয়া এসব যন্ত্রাংশ দ্রুত লাগানোর নিয়ম থাকলেও বছরের পর বছর তা লাগানো হচ্ছে না। প্রতি মাসে কমপক্ষে একবার সরকারি রেলওয়ে পরিদর্শক (জিআইবিআর) কর্তৃক লাইন পরিদর্শনের কথা থাকলেও তা হয়না। এ অবস্থায় ক্লিপ, নাট-বল্টু সাপ্লাই ও প্রতিস্থাপনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, রেলের কংক্রিট স্লিপারের সঙ্গে লাইন আটকে রাখা প্যান্ডেল ক্লিপসহ যন্ত্রাংশ রেলপথের অপরিহার্য উপাদান। গুরুত্বপূর্ণ এসব যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন ও সাপ্লাইয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ট্রেন লাইনচ্যুতসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। দুটি রেলপাতের সংযোগস্থলে ৪টি করে ৮টি নাট-বল্টু থাকার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে দু-একটি নাট-বল্টুর রয়েছে। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন। বছরের পর বছর মূল্যবান এ ক্লিপ ও যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা ঘটছে। খোয়া যাওয়া ক্লিপ বা যন্ত্রাংশ পূরণে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। ক্লিপ বা মূল্যবান যন্ত্রাংশে ‘বিআর’ (বাংলাদেশ রেলওয়ে) লেখা থাকলে চুরি রোধ করা সহজ হতো বলে অনেকেই মনে করেন। চুরি যাওয়া একটি ক্লিপ ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে প্রতি মাসেই জিআইবিআর কর্তৃক রেললাইন পরিদর্শন করে রিপোর্ট দেয়ার কথা। কিন্তু লোকবল সংকটের কারণে গড়ে প্রায় ৪ বছর পরপর পরিদর্শন করা হচ্ছে। ২০০৬ সালে ঢাকা-জয়দেবপুর ও ২০১৩ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন সর্বশেষ পরিদর্শন করা হয়।

সূত্রমতে, রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ এ ক্লিপ ও হুক শুধু চুরিই হয় না, ট্রেন চলাচলে ক্লিপ বা হুক ভেঙেও যায়। অনেক সময় এসব যন্ত্রাংশ স্টকে থাকে না। টেন্ডার শেষে এসব মালামাল পেতে প্রায় ৬-৭ মাস লেগে যায়। ফলে ইচ্ছে থাকলেও খোয়া যাওয়া যন্ত্রাংশ দ্রুত লাগানো সম্ভব হয় না। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) গণমাধ্যমকে জানান, লাইন থেকে ক্লিপ চুরি বা খোয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে লাগানোর নিয়ম রয়েছে। প্রয়োজনে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে হলেও ক্লিপ পুনরায় লাগাতে হবে। ক্লিপবিহীন লাইন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি জানান।

এরআগে গত ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই এক সপ্তাহের টানা বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইন। দেবে গিয়েছিল শ্যামপুর ওয়াসা গেইট থেকে পাগলা এলাকা পর্যন্ত রেললাইনের কিছু অংশ। রেললাইন পরিদর্শনে একটি বিশেষ টীম এসে ঘুরে গিয়েছিল নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশন। টীমের সদস্যরা ঘটনাস্থল শ্যামপুর ওয়াসা গেইট ও পাগলা এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার এর নেতৃত্বে আসা ইঞ্জিনিয়ারিং টীমটি ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করে দ্রুত লাইন সংস্কার ও পাথর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেবার পরিদর্শন টীমটি ঢাকায় ফিরে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, টানা বর্ষনে ও বন্যায় সারাদেশে রেললাইন কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। তাছাড়া প্রতি বর্ষায় শ্যামপুর ওয়াসা গেইট এলাকা থেকে পাগলা পর্যন্ত এবং চাষাড়ার গলাচিপা থেকে নন্দিপাড়া ও উকিলপাড়া পর্যন্ত রেললাইন বৃষ্টিতে তলিয়ে যায়। অথবা টানা বৃষ্টিতে লাইনের পাশে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয় রেললাইন। এবারো তাই হয়েছে। শ্যামপুর ওয়াসা গেট এর পশ্চিম পাশে ডাইং ও মিল কারখানা রয়েছে। এ সকল মিল কারখানা ও ডাইং এর পানি এক সময় রেললাইনের স্লিপারের ফাঁক-ফোকর দিয়ে পানি সরতো পূর্ব দিকে। এখন ডাবল লাইনের কাজ চলমান। ডাবল লাইনের মাটি ভরাট করা হয়েছে। এখন নির্দিষ্ট কিছু ক্যানেল তৈরী করে দেয়া হয়েছে পানি নিষ্কাশনে। ক্যানেলগুলো দিয়ে পানি সরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে রেললাইনের পাশে জলাবদ্ধতা তৈরী হয় স্বাভাবিক নিয়মেই। পানি জমে থাকলে ধীরে ধীরে নরম হয় লাইনের মাটি। তখন দু’একবার ট্রেন গেলেই লাইন একটু করে দেবে যেতে থাকে। তখন লাইনে পাথর ফেলতে হয়। এটা রেলওয়ের রুটিন কাজ। এবার করোনার জন্য ৬ মাস ট্রেন চলাচল করেনি। নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে গেন্ডারিয়া পর্যন্ত অনেক স্পটে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাইন পরীক্ষা করে ট্রেন চালু করা উচিৎ ছিল। কিন্তু তা হয়নি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর