জেল খেটে রিমান্ডে ‘মিথ্যা’ জবানবন্দী দেননি তাসলিমা (ভিডিও)


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১১:০০ পিএম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, বুধবার
জেল খেটে রিমান্ডে ‘মিথ্যা’ জবানবন্দী দেননি তাসলিমা (ভিডিও)

অপহরণ না করেও অপহরণের দায়ে জেল কাটতে হয়েছে। যেতে হয়েছে পুলিশি রিমান্ডে। দেয়া হয়েছিল মিথ্যা জবানবন্দি দেয়ার চাপ। তারপরেও নিজের অবস্থান থেকে সড়ে আসেননি চাঁদপুরের মতলব থানা এলাকার রকমত আলীর মেয়ে তাসলিমা। এমতাবস্থায় চলে আসছিল বিচারকি কার্যক্রম। বিচার প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল।

এরই মধ্যে ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার আদালতে এসে উপস্থিত হন কথিত অপহৃত হওয়ার চাঁদপুরের মতলব থানা এলাকার মোঃ আবুল কালামের ছেলে মামুন। সেই সাথে বিচারকি কার্যক্রমও অন্যদিকে মোড় নেই।

ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তাসলিমা জানান, আমাকে একই এলাকার মোঃ আবুল কালামের ছেলে মামুন পছন্দ করতো। আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আমি সাড়া দেয়নি। পরে আমি আমার ভাইদের সাথে খালার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় চলে আসি। কয়েকদিন পর আমি আবার বাড়ি চলে যাই। বাড়ি চলে যাওয়ার পর আমার বিয়ে হয়ে যায়।

এদিকে মামুন তার পরিবারের সদস্যদের সাথে অভিমান করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু মামুনের বাবা আবুল কালাম আমি সহ আমার খালু রকমত, ভাই রফিক, খালাতো ভাই সোহেল ও সাগর এবং আমার মামা সাত্তার আসামী করে মামলা দায়ে করে। আর এই মামলায় আমি ও আমার ভাই এক বছর ধরে জেল খাটে। বাকীরা সবাই এক মাস করে জেল কাটে।

জেলে থাকাবস্থায় আমাদের উপর অনেক নির্যাতন নিপীড়ন করা হয়। আমাকে গর্ভাবস্থায় জেল খাটতে হয়েছে। দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে ‘মিথ্যা’ জবানবন্দী আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা জবানবন্দী দেয়নি। কারণ আমরা এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত না। এরই মধ্যে মামুন আদালতে উপস্থিত হয়েছে।

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানায় একটি অপহরণ মামলার ৬ বছর পর নিজেই আদালতে হাজির হয়েছেন কথিত অপহৃত। অথচ পুলিশ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ওই অপহৃতকে হত্যার পর লাশ গুম করে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দিয়েছে। আর সিআইডি তাদের দেওয়া চার্জশীটে বলেছেন, ওই যুবককে অপহরণ করা হয়েছে। এসব কারণে গত ৪ বছর ধরেই মামলার আসামী হয়ে বিভিন্ন সময়ে কারাভোগ ও রিমান্ডের শিকার হয়েছেন খালাতো বোন সহ ৬জন। মামলাটির বিচার কাজও সম্পন্নের পথে ছিল।

এ অবস্থায় ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় কথিত অপহৃত হাজির হলে দেখা দেয়া চাঞ্চল্য।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১০ মে মামুন অপহরণ হয়েছে অভিযোগ এনে দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৯ মে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন বাবা আবুল কালাম। ওই মামলায় ৬ জনকে বিবাদী করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামুনকে অপহরণের পর গুমের অভিযোগ করা হয়েছিল। বিবাদীরা হলো তাসলিমা, রকমত, রফিক, সাগর, সাত্তার, সোহেল। মামলার পর পুলিশ অভিযুক্ত ৬জনকেই গ্রেপ্তার করে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। অভিযোগ রয়েছে রিমান্ডে থাকা সময়ে গ্রেপ্তারকৃত ৬ জনকে মারধর করা হয়। এবং ৬জনকেই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদানের জন্য আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু তাদের কেউ আদালতে জবানবন্দী দেয়নি।

ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন ফতুল্লা মডেল থানার এস আই মিজানুর রহমান। তিনি আদালতে আসামীদের রিমান্ড চাওয়ার সময়ে আর্জিতে উল্লেখ করেন, ‘খালাতো বোন তাসলিমা ২০১৪ সালের ১০ মে মামুনকে ডেকে নিয়ে কৌশলে অপহরণ করে বিষাক্ত শরবত পান করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দিয়ে গুম করেছে।’

পরবর্তীতে মামলাটি পুলিশের অপরাধ বিভাগ সিআইডিকে ন্যস্ত করা হয়। সিআইডি সহকারী পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর মামলার চার্জশীট আদালতে দাখিল করেন। এতে মামলার এজাহারভুক্ত ৬জনকেই অভিযুক্ত করেন।

চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪ সালের ১০ মে খালাতো বোন তাসলিমাকে দিয়ে কৌশলে মামুনকে বাড়ি ডেকে আনা হয়। পরবর্তীতে মামনুকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তাসলিমা। কিন্তু বিয়েতে রাজী না হওয়াতে বিবাদী ৬ জন মিলে মামুনকে কোমল পানির সঙ্গে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে সিএনজি চালিতা অটো রিকশা করে অপহরণ করে অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যায়। তবে কোথায় কিভাবে কি অবস্থায় রাখা হয়েছে সেটা জানা যায়নি।’

আইনজীবীরা যা বললেন
মামলার বিবাদী পক্ষের আইনজীবী সুপ্রীম কোর্টের অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন সোহেল জানান, ফতুল্লা থানায় তাদেরকে রিমান্ডে নিয়েছে। ফৌজদারী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী নেয়ার জন্য তাদেরকে বারবার চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে এবং মেরে রক্তাক্ত করেছে তৎকালিন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। কিন্তু জবানবন্দী আদায় করতে পারে নাই। পরবর্তীতে তারা জেলা ও দায়রা জজ থেকে জামিন নিয়েছে। তাসলিমা ও রফিক হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছে।

একজন আইনজীবী হিসেবে আমার বক্তব্য হচ্ছে, একটা মিথ্যা মামলা করে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন হয়রানী করলো। তদন্তকারী কর্মকর্তা একটা রিপোর্ট দিল। এই রিপোর্ট কিসের ভিত্তিতে দিল। দীর্ঘদিন ধরে এই গরীব মানুষগুলো জেল কাটল। আজ আদালতে গিয়ে দেখি ভিকটিম হাজির। আদালত ভিকটিমকে বাদীর আইনজীবীর জিম্মায় দিয়েছে। এই ধরনের ভুয়া মামলায় পুলিশ অফিসার ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা যেন সতকর্তার সাথে যেন তদন্ত করে। এই মানুষগুলোর হয়রানীর জন্য আমি রাষ্ট্রপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করছি। তদন্তকারী কর্মকর্তা রাষ্ট্রের একজন লোক। সেই সাথে মিথ্যা মামলার জন্য বাদীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানাচ্ছি।

বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শেখ ফরিদ জানান, আমার মক্কেল কাউকে আসামী করে মামলা করেননি। একটি অজ্ঞাতনামা মামলা করেছিলেন। কিন্তু পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামী হিসেবে তাদের নাম যোগ করেন। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন ছিল। এরই মধ্যে ভিকটিম ফিরে আসেন এবং আমরা তাকে নিয়ে আদালতে হাজির। আদালত ভিকটিমকে আমার জিম্মায় দিয়েছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর