গুম অপহরণে যুবকের ফিরে আসার তদন্তে গাফিলতি নাই : সিআইডি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:৩০ পিএম, ০১ অক্টোবর ২০২০, বৃহস্পতিবার
গুম অপহরণে যুবকের ফিরে আসার তদন্তে গাফিলতি নাই : সিআইডি

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানায় একটি অপহরণের ৬ বছর ও মামলার ৪ বছর পর নিজেই আদালতে মামুন নামের যুবকের হাজির হওয়ার পর তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সিআইডি কর্মকর্তাদের দাবী তাদের কোন গাফিলতি নাই। অপরদিকে পুলিশের দাবী একজন নারীর দেওয়া জবানবন্দীর সূত্র ধরেই তারা তদন্ত করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১০ মে ফতুল্লার মামুন অপহরণ হয়েছে অভিযোগ এনে দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৯ মে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন বাবা আবুল কালাম। ওই মামলায় ৬ জনকে বিবাদী করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামুনকে অপহরণের পর গুমের অভিযোগ করা হয়েছিল।

বিবাদীরা হলো তাসলিমা, রকমত, রফিক, সাগর, সাত্তার, সোহেল। মামলার পর পুলিশ অভিযুক্ত ৬জনকেই গ্রেপ্তার করে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। অভিযোগ রয়েছে রিমান্ডে থাকা সময়ে গ্রেপ্তারকৃত ৬ জনকে মারধর করা হয়। এবং ৬জনকেই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদানের জন্য আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু তাদের কেউ আদালতে জবানবন্দী দেয়নি।

ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন ফতুল্লা মডেল থানার এস আই মিজানুর রহমান। তিনি আদালতে আসামীদের রিমান্ড চাওয়ার সময়ে আর্জিতে উল্লেখ করেন, ‘খালাতো বোন তাসলিমা ২০১৪ সালের ১০ মে মামুনকে ডেকে নিয়ে কৌশলে অপহরণ করে বিষাক্ত শরবত পান করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দিয়ে গুম করেছে।’

পরবর্তীতে মামলাটি পুলিশের অপরাধ বিভাগ সিআইডিকে ন্যস্ত করা হয়। সিআইডি সহকারী পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর মামলার চার্জশীট আদালতে দাখিল করেন। এতে মামলার এজাহারভুক্ত ৬জনকেই অভিযুক্ত করেন। সাক্ষী করা হয়েছিল ২১ জনকে।

চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪ সালের ১০ মে খালাতো বোন তাসলিমাকে দিয়ে কৌশলে মামুনকে বাড়ি ডেকে আনা হয়। পরবর্তীতে মামনুকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তাসলিমা। কিন্তু বিয়েতে রাজী না হওয়াতে বিবাদী ৬ জন মিলে মামুনকে কোমল পানির সঙ্গে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে সিএনজি চালিতা অটো রিকশা করে অপহরণ করে অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যায়। তবে কোথায় কিভাবে কি অবস্থায় রাখা হয়েছে সেটা জানা যায়নি।’

ঘটনার বিবরণে মামলার অন্যতম আসামী চাঁদপুরের মতলব থানা এলাকার রকমত আলীর মেয়ে তাসলিমা বলেন, ‘‘জেলে থাকাবস্থায় আমাদের উপর অনেক নির্যাতন নিপীড়ন করা হয়। আমাকে গর্ভাবস্থায় জেল খাটতে হয়েছে। দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে জবানবন্দী আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা জবানবন্দী দেয়নি। কারণ আমরা এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত না। এরই মধ্যে মামুন আদালতে উপস্থিত হয়েছে।’’

যা বললেন পুলিশ সুপার
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেন, ‘যেহেতু এ মামলায় চার্জশীট দিয়েছে সিআইডি সেহেতু তারাই ভালো বলতে পারবে তারা কিসের উপর ভিত্তি করে চার্জশীট দিয়েছে। এ বিষয়ে এখন তারাই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কারণ জেলা পুলিশ চার্জশীট দেয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সিআইডি অপহরণের চার্জশীট দিয়েছে, হত্যা বা গুমের চার্জশীট দেয়নি। সেহেতু বাদীর বিরুদ্ধে আদালত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।’

সিআইডি কর্মকর্তার বক্তব্য
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার নাছির উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘আমি তিন মাস আগেই এখানে এসেছি। এ বিষয়ে আমরা জানা নেই। যেহেতু চার্জশীট দাখিল করেছেন সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ তিনিই ভালো বলতে পারবেন।’

আসামি পক্ষের আইনজীবীর অভিযোগ পুলিশের তদন্তের গাফিলতিতে নিরপরাদ ব্যক্তি কারাভোগ করেছেন? তিনি বলেন, ‘তদন্তে করো গাফিলতি থাকলে যারা তদন্ত করেছেন তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সিআইডি সহকারী পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমাদের তদন্তে কোন গাফিলতি নেই। কারণ আমরা সাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে চার্জশীট আদালতে জমা দিয়েছি। এখন সে কোথায় থেকে ফিরে আসলো এসব বিষয়ে ক্ষতিয়ে দেখতে হবে। এমনও হতে পারে বিবাদীদের সঙ্গে আপোষ করে এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে। যেহেতু তারা একে অপরের আত্মীয়ও। বিষয়টি আমরা ক্ষতিয়ে দেখবো পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাাবে।’

যা বললেন এস আই মিজান
এ বিষয়ে মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তার ফতুল্লা মডেল থানার এসআই মিজানুর রহমান জানান, মামুন নিখোঁজের দুই বছর পরে মাকসুদা চাঁদপুর মতলবে নিখোঁজ মামুনের বাড়িতে গিয়ে জানান মামুনকে অপহরণের পর হত্যা শেষে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে গুম করা হয়েছে।

তিনি প্রত্যক্ষদর্শী বিধায় তাকে বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল। তিনি পুলিশ প্রশাসন ও গণমাধ্যমের কাছেও প্রকাশ্যেই এ কথা বলবেন। পরে নিখোঁজ মামুনের পরিবার মাকসুদার এসব কথা রেকর্ডিং করে রাখে। এরপর তারা বিষয়টি নিয়ে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজির কাছে যান। ডিআইজি নিখোঁজ পরিবারের কথা শুনে এবং মাকসুদার স্বীকারোক্তির বিষয়টি শুনে ঘটনাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় মামলা নিতে ফতুল্লা মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। এরপর আদালতে স্বীকারোক্তি দেন মাকসুদা। তিনি লাশ শীতলক্ষ্যা নদীর কোথায় গুম করা হয়েছে সেই ঘটনাস্থলও দেখান। কিন্তু আমরা শীতলক্ষ্যা নদীতে তল্লাশী চালিয়ে লাশের কোন সন্ধান পাইনি। পরে গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী নেওয়ারও চেষ্টা করি। কিন্তু তারা কেউই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়নি। এরপর মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। সর্বশেষ মামলাটি সিআইডি তদন্ত করে চার্জশীট দিয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর