দুর্ধর্ষ রাজাকার পরিবারের আদ্যোপান্ত প্রকাশ


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৪:২৩ পিএম, ০৩ অক্টোবর ২০২০, শনিবার
দুর্ধর্ষ রাজাকার পরিবারের আদ্যোপান্ত প্রকাশ

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনকে ‘রাজাকার পুত্র’ আখ্যায়িত করে চেয়ারম্যান মাকসুদ কর্তৃক অসহায় মানুষদের অর্থ ও ভূমি আত্মসাতের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্তসহ সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগীরা। ওই সময়ে মাকসুদ ও তার পরিবারের সকল অপকর্ম প্রকাশ করা হয়।

শনিবার ৩ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব ভবনের তৃতীয় তলায় সিনামন রেস্তোরায় বন্দর থানার নিপীড়িত জনগণের ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করা হয়।

লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মহানগর আওয়ামীলীগের নেতা ও জেলা আওয়ামী যুব আইনজীবী পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মামুন সিরাজুল মজিদ।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য আব্দুল কাদির, বন্দর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি বিল্লাল হোসেন, জেলা পরিষদের সদস্য মো: আলাউদ্দিন, ২৭নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, নবীগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বুলবুল আহমেদ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের বাবা চিহ্নিত রাজাকার রফিক গংদের অগ্নিসংযোগসহ নির্মম খুনের লোমহর্ষক কাহিনী যা এরশাদ শিকদারকেও হার মানিয়েছিল। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের বই ‘শান্তি কমিটি ১৯৭১”এ রাজাকারের তালিকায় চেয়ারম্যান মাকসুদের পরিবারের ৪ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে তারা হলো তার বাবা রফিক, দাদা মাইনুদ্দীন, চাচা আব্দুল মালেক ও সামাদ। রাজাকার রফিকের জীবদ্দশায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার দিন পর্যন্ত অসংখ্য নিরীহ ব্যক্তিকে খুন করা হয়।

যার মধ্যে বন্দর থানার রামনগর গ্রামের মগা প্রধান (দুঃইখ্যার বাবা), ধামগড়ের আইছাইল্লা মুন্সিকে প্রকাশ্য দিবালোকে, ধামগড় ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সভাপতি নাসির মাষ্টারের বড় ভাই গিয়াসউদ্দীন, তার নিকট আত্মীয় আমিনুদ্দীন, মতিউর রহমান এবং আবদুল হামিদকে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। রাজাকার রফিক গংরা কুড়িপাড়া, ধামগড়, হরিপুর, গোকুলদাসের বাগসহ ১৮টি গ্রাম জালিয়ে দিয়েছিল। এসময় তাদের হাতে ১২ জনের অধিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। তারা হলো, কুড়িপাড়া গ্রামের লালু মিয়ার পুত্র মোঃ মুন্তু,(নাজির মেম্বারের পিতা) লালখারবাগের নাজির মেম্বারের পিতা ছিটু মুন্সি ওরফে (খাইট্টা ছিডা), আব্দুল হকের পিতা খালেক, হরিপুরের ছলিমুদ্দিন প্রধানের পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ, ছব্দর আলী, আব্দুল হাকিমের পুত্র বছরুদ্দীন, আব্দুল জব্বারের পুত্র সাহাদুল্লা, বঙ্গশাসনের শহীদুল্লাহর নাবালিকা কন্যা শাহিদা, আব্দুল রব, সোনারগাঁ কুতুবপুরের আইয়ুব আলী ও আব্দুল জাব্বার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রাজাকার রফিক মিয়া লক্ষন খোলার আরেক রাজাকার আজিজ সরদারের নেতৃত্বে,বন্দর শিল্প এলাকা শান্তি কমিটির সেক্রেটারী পদ গ্রহন করে গড়ে তুলেছিল বিরাট রাজাকার বাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধের পরে প্রতিশোধ হিসাবে মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার রফিকের ভাই ছাত্তার, মুস্তফা, কাবিল, তার জামাতা নান্নু (কিলার বিল্লালের বাবা) সঙ্গীয় সেলামতকে (চাঁদাবাজ ইছহাকের পিতা) হত্যা করে। কিন্তু বেঁচে মূল হোতা রফিক ও তার পরিবার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বঙ্গবন্ধু দালালি আইন পাস করেন, তখন রফিক গংদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত লোকেরা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ঢাকা জেলা জজ কোর্ট রফিককে সহ তার পুত্র আত্বীয় স্বজন, রাজাকারদের মধ্যে ১৮ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন। কিন্তু খুনি মোস্তাক আহম্মদ যখন বেআইনিভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসেন সে সময় এই দালালদের তিন ভাগের দুই ভাগ সাজা মাফ করে দিলে, আবার এই রাজাকার গ্রুপ অল্প দিনে কারামুক্ত হয়ে তাদের খুনের তান্ডব শুরু করে।

১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী রাজাকার রফিক ও তার ছেলে খুনী আনোয়ার, মাকসুদ, মুন্সি, মোয়াজ্জেম হোসেন কালু, ভাগিনা বিল্লাল সম্মেলিতভাবে লাঙ্গলবন্দ চিড়ইপাড়া এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক ভূইয়াকে (বালার ছেলে) দিন দুপুরে কুপিয়ে খুন করে। এ ব্যাপারে বন্দর থানায় মামলা হয় মামলা নং ১১(২)৯৪।

রফিকের ছেলে মাকসুদের বড় ভাই কালু সামান্য গরুর মাংস কেনার কথা কাটাকাটির ছলে, নিরহ কসাই নবী হোসেনকে ১৯৯২ সালের ২২ আগষ্ট কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তায় বন্দি করে নদীতে ফেলে দেয়। এ ব্যাপারে বন্দর থানায় মামলা হয়।

যোগী পাড়ার আওয়ামী লীগ নেতা কাজী নুর মোহাম্মদের ছেলে মহসিনকে (মাকসুদের চাচাত শ্যালককে), রাজাকার পুত্র মাকসুদের নেতৃত্বে তার বড় ভাই আনোয়ার, ভাগিনা বিল্লাল, ভাগ্নি জামাই সেভেন মার্ডারের আসামী সেলিম (কাউন্সিলার বাবুলে ছোট ভাই) বেলা ৫ টায় নির্মমভাবে কুপিয়ে মাথা কেটে, উপস্থিত লোকদের সামনে কাটা মাথা দিয়ে কুড়িপাড়া স্কুলে ফুটবল খেলেছে। এ ব্যাপারেও মামলা হয় যাহার নং ০৭(১০)০৩।

রাজাকার পুত্র মাকসুদের পিতা রফিক রাজাকার, বড় ভাই আনোয়ার, মোঃ ওমর, ভাগ্নি জামাই সেভন মার্ডারের আসামী সেলিম (কাউন্সিলার বাবুলের ছোট ভাই) নিজে মিলে খুন করে মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দীনকে। যার বাড়ি ছিল লালখারবাগ। এ ব্যাপারেও বন্দর থানায় মামলা হয় যাহার নং ১২(০৪)৮৬।

রাজাকার পুত্র মাকসুদের চাচা মতিন, রাজাকার মালেক, সামাদ রাজাকারের ছেলে ইকবাল (বর্তমানে মাকসুদের পিএস) মাকসুদের প্ররোচনায় হত্যা করে চাপাতলী গ্রামের নান্নু কাঠমিস্ত্রির ছেলে মনির হোসেনকে।

নান্নুু ছিল মতিনেরই ফার্নিচার হাউজের কাঠ মিস্ত্রি। এ ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। রাজাকার পুত্র মাকসুদের ভাই আনোয়ার, ফুপাতো ভাই সালাউদ্দীন, ভাগিনা বিল্লাল, ভাগ্নি জামাই সেভন মার্ডারের আসামী সেলিম (কাউন্সিলার বাবুলের ভাই), ভাতিজা সমরাট, তুহিন গংরা হত্যা করে মুরাদপুর গ্রামের দেলোয়ারকে। যার বন্দর থানার মামলা নং ২৪(৫)০৪।

রাজাকার পুত্র মাকসুদের ভাই আনোয়ার, ভাগিনা বিল্লাল, ফুপাতো ভাই সালাউদ্দীন মিলে খুন করে পাঠানটুলী নিবাসী এক বাস মালিক মোশারফকে। শুধু মাত্র সামান্য বাস ভাড়া নিয়ে কথা কাটকাটির কারনে। এ ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়।

রাজাকার পুত্র মাকসুদের ভাই আনোয়ার, মাকসুদের ভাগ্নি জামাই সেলিম (কাউন্সিলার বাবুলের ভাই) হত্যা করে চাঁনপুর দেওয়ানবাগের জুলহাসকে। বন্দর থানায় এ ব্যাপরেও মামলা হয়। যার মামলা নং ১৯(৬)৯৮।

রাজাকার পুত্র মাকসুদের ফুপাত ভাই সালাউদ্দিন মুরাদপুর নিবাসী নূরা ও বাবুল দুই ভাইকে হত্যা করে যাহা বন্দর থানা মামলা নং-৩৪(৩)০৩। রাজাকার পুত্র মাকসুদের ফুপাত ভাই সালাউদ্দিন মুরাদপুর নিবাসী নিলুফাকে হত্যা করে যাহা বন্দর থানা মামলা নং- ০৪(১০)০৩।

সেলিম, আনোয়ার, বিল্লাল তিন জন মিলে কুতুবপুরের একজন আদমজীর শ্রমিক, সুরু মিয়াকে চাঁদার জন্য আদমজী মিল ঘাট থেকে দিনের বেলায় ৫ টার সময় কুড়িপাড়া ধরে নিয়ে আসে নদীর পাড়ে নৌকায় রেখে তার দুই হাত বগল পর্যন্ত কেটে নেয়। যাহা সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা নং ০৯(০৪)৯৮ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রথমে ১৭ বছর সাজা প্রদান করেন।

রাজাকার রফিক ও তার পরিবারে সদস্যরা পাকিস্তান সময় থেকে এ পর্যন্ত ৩০/৩৫ টি খুনের রেকর্ডকৃত আসামী। যারা এখনো অস্ত্র, মাদক ভূমিদস্যুতা, চাঁদাবাজির মতো মারাত্মক অপরাধ করে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে বন্দর, সোনারগাঁ, সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় বহু মামলা আছে।

চেয়ারম্যান মাকসুদের বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতা ও অর্থ আত্মসাতের বহুবিধ অভিযোগ রয়েছে। ২০১০ সালের ৩০ জুন থেকে অদ্যাবধি আলাউদ্দিনের নামে বাংলাদেশ রেলওয়ের কমার্শিয়াল লীজকৃত প্রায় ১৪২৫০ বর্গ ফুট এবং সরকারি রেলওয়ের ৬৯,৫০০ বর্গ ফুট জায়গা (যা গোকুলদাসেরবাগ চৌড়াস্তার মোড়ে অবস্থিত ) জবরদখল করে এলাকার দোকান দেওয়ার নামে শতাধিক লোকের কাছ থেকে জনপ্রতি ২-৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও তাদের কোন দোকান বুঝিয়ে দেয়নি। চেয়ারম্যান মাকসুদ ও তার অনুগামীরা প্রায় ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। কেউ টাকা চাইতে গেলে তাদেরকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকী দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জনগণের থেকে আত্মসাতের অর্থ দিয়ে চেয়ারম্যান মাকসুদ জাঙ্গাল এলাকায় টুএসবি ও শাসনেরবাগ এলাকায় এফএনএফ নামের দু’টি পরিবেশ দূষণকারী ইটভাটা তৈরী করেছে। যার ফলে এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

এছাড়া বারপাড়া এলাকায় নিয়াজুল হক রানাগং এর জমি থেকে অবৈধভাবে ইটভাটার জন্য মাটি কেটে নিয়ে গেছে চেয়ারম্যান মাকসুদ গং। তাছাড়া মাকসুদ সোনালী পেপার মিল্স কর্তৃপক্ষের লঙ্গলবন্দ মৌজার প্রায় ৬ বিঘা জমি ও ৬ বিঘা পুকুর দখল করে রেখেছে বলেও অভিযোগ করা হয়। চেয়ারম্যান মাকসুদ চাপাতলীস্থ নামিরা মসজিদের নামে জোরপূর্বক লালখারবাগ নিবাসী ছিটু মুন্সির ছেলের কাছ থেকে ৪ শতাংশ জায়গা জোরপূর্বক ক্রয় করিয়া ১৬ শতাংশ জায়গা দখল করেন নেয়। যার মালিকরা দীর্ঘসময় ধরেও কোন প্রতিকার পায়নি।

এছাড়া চেয়ারম্যান মাকসুদ ও তার দোসররা অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে যা একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ কাজে চেয়ারম্যান মাকসুদ, কামরুজ্জামান বাবুল, জামান, জামাল, আলতাফ হোসেন, ফিরোজ, তাওলাদ হোসেন জড়িত।

বর্তমানে চেয়ারম্যান মাকসুদ ও তার সহযোগী কাউন্সিলর কামরুজ্জামান বাবুল নিজেদের অপকর্মকে চাপা দেওয়ার জন্য মসজিদ ও স্কুল কমিটিতে নিজেদের নাম লেখানোর চেষ্টা করছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে দাবি জানানো হয়, রাজাকার পুত্র, খুনি, ভূমিদস্যু, অর্থ আত্মসাতকারী মাকসুদ এবং বাবুল গংদের বিরুদ্ধে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় এনে সুবিচার করা হোক।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর