মাসুদের নির্দেশে সাংবাদিক কোপায় খুনি সহোদর!


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৪৮ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০২০, রবিবার
মাসুদের নির্দেশে সাংবাদিক কোপায় খুনি সহোদর!

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনকে সংবাদ প্রকাশের জের ধরে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। কথিত যুবলীগ নেতা ও মামলার আসামী মাসুদের নির্দেশে হত্যাকারী দুই সহোদর তুষার ও তুর্জয় সাংবাদিককে কোপায়। ইলিয়াসকে ছুরিকাঘাত শেষে সাহসিকতার সাথে নিজে দায়ভার নিয়ে গ্যাংয়ের বাকি সবাইকে সরে যেতে বলে। আর নির্দেশদাতা মাসুদের সাহসিক দম্ভোক্তি গ্যাংয়ের সবাইকে সন্ত্রাসী কর্মকা- করতে সাহস জুগিয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

প্রত্যক্ষদর্শী একটি সূত্র বলছে, ঘটনার সময় এলাকাবাসী অনেকে সামনে উপস্থিত থাকলেও কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। কারণ যুবলীগ নেতা ও সন্ত্রাসী মাসুদের হুংকারে কেউ এগিয়ে আসেনি। মাসুদ হুংকার দিকে সাংবাদিককে মারার নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনা মোতাবেক তুর্জয় ও তুষার সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল। এছাড়া আরো অনেকে ছিল। তবে তুর্জয় একটি ছোট ছুরি দিয়ে বুক ও পেটের বাম পাশের মাঝামাঝি অবস্থানে ঢুকিয়ে দেয়। অন্যদিকে তুষারও ছুরি দিয়ে পোছ মারে। পরে তুষার নিজে এই হত্যার ঘটনা সামাল দিবে উল্লেখ করে সবাইকে সরে যেতে বলে।

প্রসঙ্গত, ১১ অক্টোবর রাতে বাসায় যাওয়ার পথে উপজেলার আদমপুর এলাকায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা সাংবাদিক ইলিয়াসকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। ওই রাতে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত তুষারকে আটক করে পুলিশ। এসময় তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ধারালো ছুরিও উদ্ধার করা হয়। নিহত ইলিয়াস উপজেলার জিওধরা এলাকার মজিবর মিয়ার ছেলে। সে স্থানীয় দৈনিক বিজয় পত্রিকার বন্দর সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতো।

১২ অক্টোবর সোমবার সকালে নিহতের স্ত্রী জুলেখা বেগম বাদী হয়ে ওই মামলা দায়ের করেন। এতে আটককৃত তিনজনসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়। আসামিরা হলো গ্রেপ্তারকৃত তুষার (২৮), মিন্নাত আলী (৬০) ও মিসির আলী (৫৩)। আর পলাতক রয়েছে হাসনাত আহমেদ তুর্জয় (২৪), মাসুদ (৩৬), সাগর (২৬), পাভেল (২৫) ও হযরত আলী (৫০)। এর আগে ভোরে বন্দর উপজেলার জিওধরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিন্নাত আলী ও মিসির আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

১৪ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ হুমায়ুন কবীরের আদালতে ওই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। পরে তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেয় আদালত।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বন্দর থানার পরিদর্শক আজগর হোসেন বলেন, আদালতে তুষার সাংবাদিক ইলিয়াসকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে সেটা বলেছে। তবে এখনও বিস্তারিত জবানবন্দির নথি পাইনি। তবে আমাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তুষার জানিয়েছে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ থেকে সে ইলিয়াসকে হত্যা করে। এগুলো হলো, একই এলাকায় পাশাপাশি বসবাস ছিল সাংবাদিক ইলিয়াস ও তুষারদের। ২০১৮ সালে মাদক বিক্রির বাধা দেয়ায় শামীম নামে এক যুবকের সঙ্গে তুষারের ঝগড়া হয়। ওইসময় তুষার লাঠি দিয়ে শামীমের মাথায় আঘাত করলে গুরুতর আহত হয় শামীম। এ ঘটনায় তুষারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে শামীম। আর সেই মামলা করতে সাংবাদিক ইলিয়াস উস্কানি দিয়ে ছিল ধারণা তুষারের। এছাড়াও এলাকায় অবৈধ গ্যাস লাইনের সংযোগ দেওয়ায় টাকা নিয়ে তুষার, ইলিয়াস, মাসুদ সহ আরো কয়েকজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এসবের জের ধরেই সাংবাদিক ইলিয়াসকে হত্যা করা হয়।’

এদিকে হত্যাকান্ডের ঘটনার পর একে একে হত্যাকারীদের ভয়ংকর সব মুখোশ উন্মোচিত হচ্ছে। ভয়ংকর সব অস্ত্র হাতে নানা ছবিও ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। ছবিতে দেখা গেছে, সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন হত্যা মামলার মূল হোতা ও প্রথম আসামী তুষার ওই ছবিতে বড় তরোয়াল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ছবির একেবারে মধ্যেখানে অবস্থান করছে। এছাড়া ছবির ডান পাশে তুষারের ভাই ও মামলার দ্বিতীয় আসামী হাসনাত আহম্মেদ তুর্জয় বড় খুন্তি হাতে অবস্থান করছে। এছাড়া তাদের গ্যাংয়ের বাকি দুই সদস্যও চাপাতি ও বড় তলোয়ার হাতে নিয়ে অবস্থান করছিল।

এছাড়া খুনি আসামীদের সাথে ক্ষমতাসীন রাজনীতিক দলের বিতর্কিত নেতাদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।

সাংবাদিক ইলিয়াস হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবীতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা এবং বিক্ষোভ মিছিল করেছে বন্দরে সম্মিলিত সাংবাদিক জোট। ১৭ অক্টোবর শনিবার সকাল ১০ টায় বন্দর প্রেসক্লাবের উদ্দ্যোগে এ কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হয়।

বন্দর প্রেসক্লাব`র সভাপতি মোবারক হোসেন কমল খানের সভাপতিত্বে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় সংহতি প্রকাশ করে সাংবাদিক নেতারা বক্তব্যে বলেন, আমরা আর প্রতিবাদ জানাতে চাইনা। সময় এসেছে প্রতিরোধ করার। আমাদের লেখনী অস্ত্রের চাইতে শক্তিশালী। ইলিয়াসকে যারা হত্যা করেছে তারা মাদক ও গ্যাস চুরির সাথে জড়িত। হত্যাকান্ডের মূল হোতা মাসুদ প্রধানের অফিসে আসা যাওয়া ছিল স্থানীয় কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তার। শুধু মাসুদ প্রধানই নয় তাদের আশ্রয় দাতাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনুন। ইলিয়সের পরিবারের প্রতি সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেই। তারা আজ বড় অসহায়।

সাংবাদিক নেতারা আরো বলেন, সন্ত্রাসীরা যেন আর কোন সাংবাদিকের উপর হামলা করতে সাহস না পায় তারজন্য ইলিয়াস হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবী করছি। এলাকা ভিত্তিক কিশোর অপরাধী ও মাদক বিক্রেতা এবং গ্যাস চোরদেরকে কারা সেল্টার দেয়? তাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর