শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণে ধীরগতি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:২৩ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, রবিবার
শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণে ধীরগতি

৫ মাস হয়ে গেলেও এখনো শীতলক্ষ্যা সেতুর নিচ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবেই চলাচল করছে নৌযানগুলো। নারায়ণগঞ্জে সৈয়দপুর কয়লাঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ‘এমভি-এসকেএল-৩’ নামে একটি কার্গো জাহাজ ধাক্কায় ‘এমভি সাবিত আল হাসান’ নামে লঞ্চটিকে ডুবিয়ে দিয়ে ৩৪ জনের প্রাণহানির ঘটনার প্রায় ৫ মাস হয়েছে। ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ এবং জেলা প্রশাসনের পৃথক ৩টি তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে ২৩টি ও ২১টি সুপারিশ প্রস্তাবনা করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিল যার মধ্যে অন্যতম কারণ ছিল শীতলক্ষ্যা ব্রীজের নির্মাণ কাজে ধীরগতি এবং ব্রীজ নির্মাণের অজুহাতে শীতলক্ষ্যা নদীকে সংকীর্ণ করে রাখা। তবে অদ্যাবধি সেই সুপারিশের কোন ধরনের বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সৈয়দপুর-মদনগঞ্জ তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় নির্মাণাধীন সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ। এর মেয়াদ বাড়ানোসহ কিছু সংশোধনী করা হয়েছে। ৩৫ স্প্যানবিশিষ্ট ১ হাজার ২৯০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে মেয়াদকাল ধরা হয়েছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। তবে সে সময়ের মধ্যে সেতুর বিশদ নকশা প্রণয়নে পরামর্শক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সেতুটির নকশা প্রণয়নে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। নারায়ণগঞ্জ শহরতলীর সৈয়দপুর ও বন্দরের মদনগঞ্জ পয়েন্টে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর জন্য ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। যার দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৯০ মিটার। চারটি লেনে ১৫ মিটার চড়া হবে। সেতু নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে ৬২ দাগে ৩০ জমির মালিকের ১০ দশমিক ৩ একর জায়গা ইতোমধ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ওইসব জমি মালিকদের অধিগ্রহণের মূল্য হিসেবে ওই বছরের ২২ নভেম্বর ১৫ কোটি ৭৯ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬০ টাকার চেক প্রদান করেছে সরকার।

২০১০ সালে একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটি নির্মাণকাজের শেষ সময় ধরা ছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তার আগে চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণকাজ শেষ করার কথা গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রকল্পের উন্নয়ন সহযোগী সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের (এসএফডি) ঠিকাদারের অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে সময় বাড়ানো হয় ৩১৭ দিন। সে হিসাবে গত ৩১ ডিসেম্বর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এখন বলা হচ্ছে, করোনার কারণে নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়েছে। তাই গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর এসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো প্রকল্পের মেয়াদ আরও ৫৭৪ দিন বাড়ানোর আবেদন করে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা করে এখন আরও ৩৬৫ দিন তথা এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এরপর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড হিসেবে আরও এক বছর তথা ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে পরামর্শক সেবারও সংশোধন করতে হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ বাড়ানোয় পরামর্শকের চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে। প্রকল্পের আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করতে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করে এখন ডিপিপি সংশোধন করা হবে। ঠিকাদারের নির্মাণকাজের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এক বছরের পরামর্শক খাতের জন্য ৭ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। গত মার্চ মাস পর্যন্ত এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৭১.৫৬ শতাংশ। এ নিয়ে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মেয়াদ বৃদ্ধির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয় মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করতে হলে বাড়বে ঋণচুক্তির মেয়াদও।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শীতলক্ষ্যার ওপর ছয় লেনের সেতু হবে। সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে নারায়ণগঞ্জ জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলার। তা ছাড়া নির্মাণাধীন পদ্মাসেতুর সঙ্গে বাইপাসের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-মাওয়া-খুলনা মহাসড়কে সংযোগ স্থাপিত হবে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ চলছে ১০ বছর। এখন আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি খরচও বাড়াতে হচ্ছে।

এদিকে চলতি বছরের ৪ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে সৈয়দপুর কয়লাঘাট এলাকায় নির্মাণাধীন শীতলক্ষ্যা ব্রীজের কাছে শীতলক্ষ্যা নদীতে ‘এমভি-এসকেএল-৩’ নামে একটি কার্গো জাহাজ ধাক্কায় ‘এমভি সাবিত আল হাসান’ নামে লঞ্চটিকে ডুবিয়ে দিয়ে ৩৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ঘটনার রাতে জেলা প্রশাসনের ৭সদস্য ও বিআইডব্লিউটিএর ৫ সদস্যের দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ৫ এপ্রিল নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে আরো একটি ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি ১২ এপ্রিল নৌসচিব মেজবাহ্ উদ্দীন চৌধুরীর কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে। ৩৪ জনের প্রাণহানির ঘটনায় কার্গো জাহাজের বেপরোয়া গতি ও নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর ত্রুটিপূর্ণ নকশাকে দায়ী করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে নদীর মাঝখানে নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর পিলার স্থাপন করা এবং নৌপথে প্রতিবন্ধকতামূলক নির্মাণসামগ্রী রেখে নৌপথ সরু করে ফেলাকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপরদিকে ১৫ এপ্রিল জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনেও কার্গো জাহাজের বেপরোয়া গতি, চালকের উদাসীনতায় দুর্ঘটনা, সরু নদী পথ সহ তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের স্থাপনার ত্রুটিসহ ২১টি সুপারিশ উল্লেখ করা হয়।

এদিকে ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরেও শীতলক্ষ্যা সেতুটির নির্মাণ কাজ চলছে ধীরগতিতেই। করোনার সংক্রমন বৃদ্ধির কারণে গত ৫ এপ্রিল থেকে কয়েকদফা লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। পরে ১১ আগষ্ট থেকে পুরোদমে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিনেও সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ার কারণে শীতলক্ষ্যার ওই স্থানটি এখনো সংকীর্ণ অবস্থাতেই রয়েছে। সেতুটির নিচে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে সেতুর পিলার সরিয়ে নদীর প্রশস্ততা বাড়ানোর সুপারিশ আমলেই নেয়নি সেতু কর্তৃপক্ষ। বরং পূর্বের ন্যায় সরু পথেই নির্মাণাধীন শীতলক্ষ্যা সেতুর নিচ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে সবধরনের নৌযানকে।

নিরাপদ নৌপথ চাই ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সবুজ শিকদার মাষ্টার বলেন, শীতলক্ষ্যার ওই সেতুটির অনেক পরে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। অথচ পদ্মা সেতু যেখানে দৃশ্যমান এবং উদ্বোধনের প্রহর গুনছে সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক উদ্বোধনকৃত প্রকল্পটির এখনো নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। ব্রীজটির নির্মাণ কাজে ধীরগতির কারণে নৌরুটটি সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। গত ৪ এপ্রিলের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্যও ব্রীজটির নির্মাণকাজের ধীরগতিও অনেকাংশে দায়ী বলে তিনি মনে করেন। কারণ ব্রীজটির সামনে দিয়ে জাহাজ কিংবা লঞ্চ চলাচলের সময়ে যে ধরনের সচেতনতামূলক প্রচারণা দরকার ছিল সেগুলোর কিছুই করা হয়নি। এখনো ঝুঁকি নিয়ে ব্রীজটির নিচ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে সব ধরনের যানবাহনকে।

মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনার মামলার বাদি ও বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপ পরিচালক বাবু লাল বৈদ্য জানান, শীতলক্ষ্যা সেতুর নির্মাণ কাজের জন্য সেতু বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কর্তৃপক্ষ প্রতিবন্ধকতামূলক নির্মাণসামগ্রী আগষ্ট মাসের মধ্যে অপসারণ করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তারা এখনো ওইসব প্রতিবন্ধকতামূলক নির্মাণসামগ্রী অপসারণ করেনি। আমরা সেতু বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে চিঠি দিব। যদি দ্রুততম সময়ে সেতুর নিচের প্রতিবন্ধকতামূলক নির্মাণসামগ্রী অপসারণ না করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নিব।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর