বেপরোয়া হকার আসাদ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:৪৪ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০২১, রবিবার
বেপরোয়া হকার আসাদ

হকার নেতা আসাদ। উত্থান শুরু হয় ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু সড়ক দখল রেখে বাণিজ্য চালাবার অনৈতিক দাবীকে কেন্দ্র করে। সেবার তাকে কেউ না চিনলেও নারায়ণগঞ্জের বাম নেতাদের পাশে বসে রাতারাতি নেতা বনে যায় সে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তার। একের পর এক বিতর্কিত কর্মকান্ড করে রীতিমতো হকার মাফিয়া রূপে আবির্ভূত হয়েছে আসাদ। পুলিশের হাতে কয়েকদফা আটক ও গ্রেপ্তারের পরে জামিনে বেরিয়ে তার দাপট কমেনি একবিন্দু।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শামীম ওসমানের ঘোষণা অনুযায়ী হকার বসে ১৬জানুয়ারি বিকেলে। অপরদিকে শান্তিপূর্ন ভাবে হকার উচ্ছেদ করে আসছিলো মেয়র আইভী ও সিটি করপোরেশনের লোকজন। কিন্তু অতর্কিত হামলা শুরু করে আসাদ ও অন্যান্য হকার নেতারা। তাদের নেতৃত্বে জড়ো হয় শতাধিক হকার। এর সাথে যুক্ত হয় ওসমানপন্থী আওয়ামী নেতারা। যৌথভাবে হামলা চালায় মেয়র আইভীর উপর। ঘটনার পরদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখা যায় হকার নেতা আসাদ বিশাল বড় ইট ছুটে মারছেন মেয়র আইভীর দিকে। এই ঘটনায় মামলা দায়ের করা হলেও আজ পর্যন্ত তাতে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হত্যাচেষ্টার পর এবার পুলিশকে হত্যার চেষ্টা করেছেন বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে বসা হকাররা। গত বছরের ১০ মার্চ এমন অভিযোগে সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় গ্রেফতার হকার সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আসাদুল ইসলামসহ ২৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর সিটি মেয়র আইভীর উপর হত্যাচেষ্টার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগে মামলা করা হয়েছিল। ওই মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখ সহ আরও ১০০০ জনকে আসামি করা হয়।

২০২১৮ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় হকার নেতা আসাদকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। আর প্রতিবারই জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম তাকে ছাড়াতে তদবির করতে গিয়েছেন। সবশেষ গত বছর পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায় হকাররা। সেসময় প্রথমবারের মত আসাদকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। তখনও আসাদের অনুসারীরা পুলিশের উপর হামলা চালানো সহ, অগ্নিসংযোগ, গাড়ি ভাঙচুর করে।

গ্রেপ্তারের কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আসে আসাদ। শুরু করে তার রামরাজত্ব। ফুটপাতে দখলদারিত্ব পাকাপোক্ত করার পর নিয়মিত চাঁদাবাজি, হকারদের উপর আধিপত্য বিস্তার এবং মারধর করে থাকে সে। এছাড়া তার রয়েছে প্রায় ১০/১২ জনের একটি দল যারা আসাদের কথামত হকারদের শাসিয়ে থাকে। কথা না শুনলেই মারধর সহ নানা ভাবে হেনস্থা করে হকারকে। আর তাই আসাদের ভয়ে মুখ বন্ধ করে ব্যবসা চালিয়ে যায় হকাররা।

সবশেষ গত ১৪ অক্টোবর হকারকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে নিজের দাপট প্রকাশ্যে জানান দিলো আসাদ। এই ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে আসাদের নাম দেখে পুলিশের গড়িমসি করার অভিযোগ উঠে। আসাদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে পুলিশের এমন আচরণ দেখে অবাক হয়েছেন অনেকেই। প্রশ্ন তুলেছেন, আসাদ কি তবে এতটাই শক্তিশালী হয় উঠলো এই শহরে যে তার বিরুদ্ধে মামলা নিতে কয়েকবার ভাবতে হয়?

তবে শেষপর্যন্ত ভোর ৪ টায় মামলা রুজু করা হয়, এতে আসামী করা হয়, ইকবাল ওরফে ডাক্তার (৩০), হকার নেতা আসাদ (৪০), স্বপন (৩২), সায়মন (২১), হাসান (১৯), সানি (২৩), রাসেল (২৪), মহসিন (৬০) সহ অজ্ঞাত ৪/৫ জন। মামলায় বলা হয়, শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে সাধু পৌলের গির্জার সামনে ফুটপাতে সাদেকের জুতার দোকানে চাকুরী করতো জুবায়ের। ফুটপাতে দোকান বসানো নিয়ে স্বপনের সঙ্গে ঝগড়া হয় জুবায়েরের। পরে জুবায়েরকে বলাকা পেট্রোল পাম্পের সামনে নিয়ে চর থাপ্পড় মারতে থাকে স্বপন। এসময় হকার নেতা আসাদের হুকুমে মামলার প্রধান আসামী ইকবাল মহসিনের দোকান থেকে ধারালো চাকু এনে জুবায়েরকে কুপিয়ে জখম করে।

মামলার আসামী সায়মন মৃত্যু নিশ্চিত করতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জুবায়েরের হাতের রগ কেটে দেয়। অপর দুই আসামী হাসান ও সানি লোহার রড ও কাঠের ডাসা দিয়ে পিটিয়ে হাড় ভেঙ্গে দেয়। রাসেল ও মহসিনসহ অজ্ঞাত আসামীরা মারধরে যুক্ত হয়ে জুবায়েরকে অচেতন অবস্থায় রেখে পালিয়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল ও পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হকার আসাদের দৌরাত্ব ক্রমেই শহরবাসীর কাছে ফুটে উঠছিলো। সে যেভাবে একজন জনপ্রতি জনপ্রতিনিধিকে হত্যা করতে ছুটে গিয়েছিলো তখনই তার উত্থান টের পেয়েছেন অনেকেই। কিন্তু বার বার হকার হিসেবে সহানুভূতি পেয়ে উৎরে যায়। আর সেই কারনেই হত্যা করার মত নির্দেশ দেয়ার সাহস পেয়ে যায় আসাদ ও তার অনুসারীরা। যদি প্রথমেই এই আসাদকে আইনের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে জুবায়েরের মত একটি প্রাণকে অকালে হারাতে হতো না।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর