‘মৃত্যুযন্ত্রণা’ থেকে ফিরে আসা ছাত্রদল সভাপতির দুঃসহ স্মৃতি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৩১ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, শুক্রবার
‘মৃত্যুযন্ত্রণা’ থেকে ফিরে আসা ছাত্রদল সভাপতির দুঃসহ স্মৃতি

নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মশিউর রহমান রনি ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ১০ টায় ঢাকার পল্টন থেকে নিখোঁজ হন। এর দুদিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে ফতুল্লার একটি মাঠ থেকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে পুলিশ। পরে তার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

দুই বছর আগের সেদিনের কথা মনে করে এখনো আঁতকে উঠেন রনি। সেদিনের সেই দুঃসহ সৃতি তুলে ধরেছেন রনি। পাশাপাশি এমন ঘটনা যেন আর কোন নাগরিকের সাথে না হয় সেজন্য দাবি তুলেছেন তিনি। নিজের গুম হবার পর ফিরে আসাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা হিসেবে উল্লেখ করেছেন রনি।

রনি বলেন, সেদিন রাতে আমি ফকিরাপুল জমিদারপ্লেসে আমার অফিস ছিল সেখানে বসতাম সেটার নিচে ছিলাম। পেছন থেকে তারেক নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে ডাক দেন, তিনি জানতে চান আপনি রনি না। আমি বলি না, আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে। পরে তিনি বলেন, আপনি তো মশিউর রহমান রনি। বলেই আমার কোমরে আর হাতে পিস্তল ঠেকিয়ে বললো যে, আপনি নড়াচড়া করবেন না আপনার সমস্যা হবে। পরে তারেক এনামসহ ৬/৭ জন পুলিশ আমাকে ধরে গাড়িতে উঠিয়ে ফেললো। পরে আমাকে তারা চোখ বেধে ফেললো।

পাশেই পল্টন থানার একটি ফোর্স ছিল। তারা জানতে চাইল আপনারা কে বা কারা, উত্তরে জানাল আমরা নারায়ণগঞ্জ এসপি স্যারের স্পেশাল ফোর্স। পরে এসপি অফিসে ফোন দিয়ে তারা কনফার্ম হলো। সম্ভবত রিয়াদ নামে পন্টনের সেই পুলিশ কর্মকর্তা নাম, গাড়ির নাম্বার এসব লিখে রেখে যেতে দিলো।

তিনি বলেন, তারপর আমাকে বিভিন্ন স্থান ঘুরিয়ে কাঁচপুর ব্রিজের দিকে নিয়ে গেল, আমি সেখানে ট্রলারের শব্দ পাই। এখানে অনেক লোকের সাথে যোগাযোগ শেষ করে তারা আমাকে ফতুল্লার তক্কার মাঠে নিয়ে এলো। আমি জানতে চাইলাম এখানে নিয়ে এলেন কেন? তারা জানাল এখানে নিজাম ভাই আসতেসে কথা বলবে।

সেখানে ২০/২৫ মিনিট তাদের কথা বার্তার পর আমাকে নিয়ে গেল নারায়ণগঞ্জ এসপি অফিসের নিচে। তখন বাজে রাত সাড়ে ১০টা। সেখানেই আমাকে গাড়িতে বসিয়ে রাখে চোখ বাধা অবস্থায়। আমি জানতে চাইলে তারাই জানায় আমাকে নতুন কোর্টের এখানে এনেছে।

পরে ফোনে তারা কথা বলে, এসময় আমি বলতে শুনি, একেক স্যার একেক সময় একেক কথা বলতেসে। এখন কি করবো? সম্ভবত আওয়ামীলীগের কোন নেতার সাথেই তারা কথা বলছিল। পরে আবার তক্কার মাঠে নিয়ে গিয়ে পৌনে ১ ঘণ্টার মত বসিয়ে রাখলো। সেখানে সম্ভবত রাত ১২ টা বাজে। পরে সেই তারেক এসে বললো ‘দূর স্যারেরা কোন সিদ্ধান্তই দিতে পারেনা।’

পরে আমাকে নিয়ে গেল ফতুল্লা থানায়। এসময় আমাকে চেনে ফোর্সরা বললো আপনাকে তো চিনি তবে আপনাকে যে ধরবে তা তো জানতাম না। আমাদের বলা হয়েছে অপারেশন আছে চলো।

তখন আমার পকেটে ৬ হাজার টাকা ছিল সেটি দিয়ে বললাম আমার বন্ধু সুমনকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে দাও আর ১ হাজার রেখে দাও। কিন্তু পরে আমার বন্ধু সুমন আর ভয়ে ফোন ধরেনি।

রাত ১ টায় গাড়ি ঘুরিয়ে আমাকে আবার পাগলা মেরি এন্ডারসন নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে প্রায় ১ ঘণ্টার মত আমাকে বসিয়ে রেখে ড্রিংকস করে তারা আমি গন্ধ পাই। পরে আমাকে গাড়িতে বসেই তারা বলে, সুরা পড়, তর মনে হয় কপালটা ভালোনা। দোয়া কালাম পড়। পরে পৌনে ২ টার দিকে আমার চোখ খুলে দিল নদীর পাড়ে নিয়ে। সেখানে আমাকে বললো, ‘কত বড় সাহস? এমপি সম্পর্কে তর ধারণা আছে? তরে তো এখন মেরে ফেলবো। তোকে মেরে ফেললে কি হবে বল?’

তখন আমি বলি, আমাকে মেরে ফেলবেন ভালো কথা সেটা করতে পারেন আপনাদের ক্ষমতা আছে। আমাকে মেরে আপনাদের লাভ কি? আপনি এতে পাপী হবেন খুনি হবেন, আপনাকে আপনার পরিবারকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

পরবর্তীতে সে জানায়, আমাদের তো হুকুম আছে তোকে মেরে ফেলার। আমি বলি, মেরে ফেলেন।

তারপর নিজে নিজেই কিছুক্ষন কথা বলে আমার কানের সামনে দিয়ে দুটি গুলি করে তারেক বলেন, তর কপাল ভালো কিছু বলার নাই তরে থানায় নিয়ে যেতে বলসে স্যার। পরে আমাকে থানায় নিল তখন বাজে পৌনে ৩ টা। এর আগে আধাঘন্টা থানার পাশের গলিতে বসিয়ে রাখে গাড়িতে। পরে কালো বোরখা পড়িয়ে আমাকে থানায় ঢুকায়। রাতে আমাকে আর খাবার দেয়নি। থানার একেবারে পেছনের ঘরে আমাকে চোখ বেধে, পিঠে পাথর দিয়ে, পেছনে হাত বেধে ফেলে রাখে।

ফজরের নামাজের পর ৪/৫ জন লোক এসে আমাকে এমন নির্যাতন করে যা ছিল একেবারে মৃত্যু যন্ত্রণা। আমার প্রতিটা আঙ্গুলে গরম সুই ঢুকায় তারা। ওই পাথরের উপর আবার দুজন বসে। আবার আমার মুখের ভেতর কাপড় দিয়ে দেয় যেন চিৎকার করতে না পারি। পরে আবার দুপুরের দিকে এসে তারাই স্যাভলন দিয়ে সব পরিষ্কার করে। আমাকে ৩টার দিকে ডিম ডাল আর ভাত দেয়। পরে কি আর খাওয়া যায়। আমি পানি চাইলে আমাকে ছোট বোতলে পানি দেয়। আমি পরে বমি করে দেয়ার পর মাগরিবের নামাজের পর আমাকে ওরস্যালাইন খাওয়ায়। পরে আমাকে বলে, আওয়ামীলীগের এক বড় নেতা আসবে তাকে বলবি তরে রাতে অনেক নির্যাতন করসে। আমি বলি, নির্যাতনের আর কি বাকি রাখসেন। আরো কি নির্যাতন করবেন?

পরে তিনি চলে যাবার পর আবার ৫/৬ জন লোক আসে। একজন আমাকে লাঠি দিয়ে পিঠে আঘাত করে বলে, তোর কত বড় সাহস তুই চাচ্চুকে গালি দিস? এর দুই তিন মিনিট পর তারা চলে যায়। আমি তখন চুপ থাকি কিছু বলিনা।

রাত সাড়ে ১১ টায় দিকে আবার এসে আমাকে পা দুটা চেয়ারের সাথে বেধে রাখে। চোখ তো বাধাই ছিল। পরে আমার হাত পেছনে বেধে ফেলে। পরে বলে, তুই বলবি, শামীম তর বাপ লাগে, তুই যা বলসোস তরে দিয়া বলাইসে, তুই নিসে বলিস নাই। ক্ষমা চাই মাফ চাই, আমি আর রাজনীতি করবোনা।

এই দুদিনে আমাকে একবেলাই খেতে দিয়েছিল আর কিছু খেতে দেয়নি। পরদিন সকাল ১১ টায় চোখ বাঁধা অবস্থায় মুখোশ পড়িয়ে আমাকে আবার ফতুল্লা পাইলট স্কুলের মাঠে নিয়ে গেল। আমি তো হাঁটতে পারছিলাম না তাই আমাকে কোলে তুলে নিল। পরে তারা বলে, ওরে আর বাঁচাতে পারলাম না এটা সেটা বলে ভয় দেখায়। আমি জিজ্ঞাসা করায় উত্তর দেয় তরে জায়গামত নিয়ে যাচ্ছি। পরে আমার চোখ খুলে দেয়। সেখানে মোহাম্মদ আলী সাহেবের ভাগ্নে লিটন সাহেবের একটি নোয়া গাড়ি আসে। তখন সে আমাকে দেখতে পেয়ে বলে, তোমাকে তো আমরা তিনদিন ধরে খুঁজছি, তুমি এখানে কি কর? পরে পুলিশের কামরুল বলেন, আপনারা চলে যান, তারা বলে আমরা তো তিনদিন ওকে খুঁজছি পাচ্ছিনা ওর সমস্যা কি। পরে সেখান থেকে আমাকে তারা অস্ত্র দিয়ে উদ্ধার দেখায়।

রনি বলেন, সেদিনের সেসব ঘটনা মনে পড়লে এখনো আঁতকে উঠি। এমন হতে পারে ভাবতেই পারিনি। মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখিয়েছে তারা। কিভাবে মানুষকে ধরে নিয়ে গুম খুন করে ফেলে তা একেবারে সামনে থেকে দেখেছি।

২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল মহসিনের আদালতে রিমান্ড শুনানি করা হয়। শুনানি শেষে রনির তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

এর আগে ওইদিন দুপুরে নিখোঁজ সভাপতি মশিউর রহমান রনিকে অস্ত্র-গুলিসহ আটক দেখিয়ে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাফিউল আলম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলায় রনির সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়।

এর আগে ভোর ৫টার দিকে ফতুল্লার দাপা ইদ্রাকপুর থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও তিন রাউন্ড গুলিসহ তাকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফতুল্লা মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের।

১৫ সেপ্টেম্বর রাত থেকেই নিখোঁজ ছিল রনি। তাকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তুলে নিয়ে গেছে দাবি করে ১৬ সেপ্টেম্বর পরিবার ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দলের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে তার সন্ধান দাবি করেছিলেন নেতারা।

রনির ছোট ভাই মহিবুর রহমান রানা তখন জানিয়েছিলেন, তার বড়ভাই মো. মশিউর রহমান রনি ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় পারিবারিক কাজে ঢাকা যান। আর রাত পর্যন্ত ফিরে আসেননি। রাত সাড়ে ১০টায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ঢাকা থেকে টেলিফোনে জানান কালো মাইক্রোবাসে করে কয়েকজন সাদা পোশাকধারী নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয়ে রনিকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিলেন রনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর