খালেদাকে গুলিকরা সন্ত্রাসীকে পাশে রাখা, গাড়ি বিতর্ক ছিল মামুনের


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৩১ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, শনিবার
খালেদাকে গুলিকরা সন্ত্রাসীকে পাশে রাখা, গাড়ি বিতর্ক ছিল মামুনের

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক মামুন মাহমুদ পদে থাকা সময়ে বেশ সক্রিয় রাজনীতি করেছেন। হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি বেঁধেও তাকে হাজির করা হয়েছিল আদালতে। মামলার শিকার এ নেতা সজ্জন হলেও কিছু বিতর্কও তাকে ছুঁয়েছিল।

একইভাবে ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ ফতুল্লা থানার মডেল থানার দু’টি মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে একটি আদালতে উঠায় অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে। ওই সময়ে পুলিশ তাকে কোমড়ে দড়ি বেধে টেনে আদালতে নিয়ে আসে। ওই সময় তার হাতেও হ্যান্ডক্যাপ পরিহিত ছিল। আদালতপাড়ায় তাকে এভাবে নিয়ে আসার পর সাধারণ মানুুষের মাঝেও হায় হায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। দেখে মনে হয়েছিল কোন দাগী আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে নিয়ে আসা হয়েছে। একজন অধ্যাপক হওয়ার সত্ত্বেও তার প্রতি নূন্যতম সম্মান দেখায়নি পুলিশ।

২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কাজী মনিরুজ্জামান মনিরকে সভাপতি ও মামুন মাহমুদকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন লংমার্চের গাড়ি বহরে গুলি করা একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে কমিটি গঠনের পরেই দেখা যায় মামুন মাহমুদের পাশে। সাত খুনের মত আলোচিত মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী নূর হোসেনের অনুগামী ওই সন্ত্রাসীকে গত কয়েকদিন ধরেই মামুন মাহমুদের পাশে দেখা গেছে যাঁকে নিয়মিত দেখা যেত নূর হোসেনের পাশে। সেই সন্ত্রাসীর নাম মহিউদ্দিন মোল্লা। তবে ভোল পাল্টে নূর হোসেনের আস্কারায় তিনি পেয়ে যান বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদও। এছাড়া মামুন মাহমুদের পাশে দেখা মিলছে নূর হোসেনের অনেক ঘনিষ্টজনদেরকেও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাতিলের প্রতিবাদে বিএনপি ১৯৯৮ সালের ৯জুন চট্রগ্রাম মুখী লং মার্চ ঘোষণা করেন। লং মার্চ ঠেকাতে আগের দিন ৮ জুন রাত ৮টার পর থেকেই ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে শিমরাইল পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার এলাকায় অবস্থান নেয় আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীরা। ওই সন্ত্রাসীদের মধ্যে ছিল মহিউদ্দিন মোল্লা। সে এখন সিদ্ধিরগঞ্জের ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। সে বিভীষিকাময় রাতে রাস্তার পাশের গাছ কেটে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। যাত্রীবাহী বাস সহ বিভিন্ন পরিবহনের চাকার পাম্প ছেড়ে দিয়ে সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। চট্রগ্রাম, কক্সসবাজার, সিলেট, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সহ পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৩৮টি রুটের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে হয়ে যায়। ওইরাতে রাস্তায় আটকে পড়া যাত্রীদের অবর্ননীয় দুর্ভোগ আর ভোগান্তির শিকার হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই রাতে বিভিন্ন বাসে লুটপাট চালায় আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীরা। তারা অস্ত্রের মুখে জিম্মী করে যাত্রীদের কাছ থেকে মূল্যবান অনেক জিনিসপত্র লুট করে। এছাড়া অনেক যুবতী নারীদের ধরে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষন, শ্ল­ীলতাহানি করে। যা ওই সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় ফলাও করে প্রচারিত হয়। সে রাতে যাত্রীদের ওপর নির্যাতন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।

৯ জুন সকাল ৯ টার দিকে ঢাকা থেকে আসা বিএনপির গাড়ি বহর মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় থেমে যায়। আওয়ামীলীগ ক্যাডারদের প্রতিবন্ধকতার মুখে গাড়ি বহর আর এগুতে পারেনি। ওই সময়ে সাইনবোর্ড থেকে শিমরাইল পর্যন্ত সড়কে আওয়ামীলীগ ক্যাডাররা ফাঁকা গুলিবর্ষন করে উল্ল­াস করতে থাকে। ওই সময়ে মহিউদ্দিন মোল্লা সহ বেশীরভাগ ক্যাডারের হাতে দেখা যায় একে-৪৭ সহ অত্যাধুনিক সকল অস্ত্র। বাধার কারণে সাইনবোর্ডে মহানগর ফিলিং স্টেশন নামে একটি পেট্রোল পাম্পে অবস্থান নেয় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সহ দলের সিনিয়র নেতাকর্মীরা। গুলি করা হয় মহিউদ্দিন মোল্লার নেতৃত্বেও। খবরটি সেসময়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও ফলাও করে প্রচার হয়। বিকালের পর আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীরা পিছু হটে। এক পর্যায়ে রাত ৭টার পর পুলিশ গাছের গুড়ি সরিয়ে ফেললে যান চলাচল শুরু হয়।

যদিও লংমার্চ বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই সময়ের এমপি ও বর্তমানেও এমপি শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে। তবে শামীম ওসমান সম্প্রতি একাধিক টিভি টক শো অনুষ্ঠানে বলেছেন, আমরা লং মার্চ বাধা দেয় নাই। বরং আটকে দেওয়া হয়েছিল। কারণ আমাদের কাছে খবর ছিল ফেনীতে লং মার্চের গাড়ি বহর যাওয়ার পর সেখানে হামলা করা হবে আর সে দায় আওয়ামী লীগের উপর চাপাবে। সে কারণেই লং মার্চের সময়টা কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কমিটি গঠনেরন পরেই মামুন মাহমুদের একটি নতুন গাড়ি নিয়ে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ওই সময়ে গণমাধ্যমে গাড়ির মূল্য ১৮ লাখ টাকা উঠে আসলেও মামুন মাহমুদের অনুগামী একজন রেজাউর ওই গাড়ির দাম ২৫ লাখ টাকা জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন। সেই সঙ্গে খবর প্রকাশের পর গণমাধ্যম কর্মীদের বিরুদ্ধেও নানা ধরনের কুৎসা রটাতে দেখা গেছে।

গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের আগে বক্তব্য নেওয়ার পরেও মামুন মাহমুদ বার বার সংবাটি না করার জন্য পরোক্ষভাবে তদবির করেন। তিনি বলেন, ‘সংবাদটি হবে তার জন্য বিব্রতকর।’ যদিও তিনি গণমাধ্যমকে বক্তব্য দেওয়ার সময়ে বেশ দৃঢ় কণ্ঠেই বলেছিলেন, ‘একটি কেন প্রয়োজনে তিনটি গাড়ি কিনবেন আরো গাড়ি কিনবেন তিনি।’

বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন, মূলত মামুন মাহমুদ নিজের টাকায় গাড়ি ক্রয় করেনি। এ গাড়ি জেলা বিএনপির দুইজন শিল্পপতি ‘উপহার’ হিসেবে মামুন মাহমুদকে দিয়েছেন। বিনিময়ে তারা মামুন মাহমুদকে ‘পোষ্য’ হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তথা ওই দুইজন শিল্পপতি যা বলবেন যেভাবে কমিটি গঠন করতে বলবেন সেভাবেই চলবেন।

তখন জেলা বিএনপির ২৬ জনের মধ্যে ১২ নেতার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। শর্ত সাপেক্ষে কেউ নিজের নাম গণমাধ্যম কিংবা সংবাদে আনতে নারাজ। তাদের বক্তব্য ছিল, ‘বিগত দিনে অভিজাত হোটেলে বসে আর্থিক লেনদেনের কারণেই ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মামুন মাহমুদ ও আশরাফুল হক রিপনের জেলা যুবদলের কমিটি ভেঙ্গে দেওয়া হয়। সেই নেতাকে এখন আবার হঠাৎ করে জেলার সেক্রেটারী করাটা বোধহয় সঠিক হয়নি। তাছাড়া আমরা যারা কমিটিতে আছি আমাদের পাশ কাটিয়ে আমাদের সবার নাম ব্যবহার করে এভাবে সেক্রেটারী ফায়দা লুটবেন কিংবা তাকে খুশী করতে অন্যরা সচেষ্ট হবেন সেটার ভবিষ্যৎ শোভনীয় না।’

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর
আজকের সবখবর