পদত্যাগ করেও পদের জন্য টাকা ঢালছেন শাহআলম!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:৩৪ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, শনিবার
পদত্যাগ করেও পদের জন্য টাকা ঢালছেন শাহআলম!

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা বিএনপির পদ ছাড়ার পর রাজনীতি থেকে নিস্ক্রিয় থাকার পরেও পর্দার অন্তরালে কলকাঠি নাড়ছেন শাহআলম। এবার তিনি টার্গেট করছেন আসছে জেলা বিএনপির সদস্য সচিবের পদ। এছাড়াও কমিটিতে ফতুল্লা থানা বিএনপির আহবায়ক আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাসকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শাহআলম।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির নতুন কমিটির জন্য খসড়া প্রস্তুত করে কেন্দ্রে জমা দেয়া হয়েছে। খসড়ায় আহবায়ক কমিটির জন্য নবীন প্রবীণের সমন্বয়ে তালিকা করা হয়েছে।

এতে আহবায়ক করা হয়েছে তৈমুর আলম খন্দকারকে। আহবায়ক কমিটিতে সাবেক জেলা বিএনপির একজন শীর্ষ নেতাকে সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক করা হয়েছে। এতে নবীন অনেক নেতাকে পদে আনতে চেষ্টা করা হয়েছে যেন দলের নেতাকর্মীরা রাজপথে সরব অবস্থানে থাকতে পারে।

২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কাজী মনিরুজ্জামান মনিরকে সভাপতি ও মামুন মাহমুদকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। এর দুই বছর পর জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। দুই বছর মেয়াদী এ কমিটি তিন বছর আট দিনের মাথায় ২০২০ সালেই ২১ ফেব্রুয়ারি সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক মামুন মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

এদিকে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব পদে বিলুপ্ত কমিটির সেক্রেটারী মামুন মাহমুদকে পদায়িত করতে উঠেপড়ে লেগেছেন শাহআলম। এছাড়া আজাদ বিশ্বাসকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার চেষ্টায়রত এ শাহআলম। ইতোমধ্যে তিনি কেন্দ্রে নানা লবিং শুরু করেছেন। প্রয়োজনে তিনি অর্থ ব্যয় করতেও রাজী হয়েছেন।

বিএনপির নেতারা জানান, বিগত দিনেও শাহআলম প্রচুর টাকা খরচ করেছিল। এবারও টাকা খরচ করে নিজেদের অধীনস্তদের কমিটিতে আনার চেষ্টা করছেন।

দলের একাধিক সূত্র জানান, মামলা থেকে রক্ষা পেতেই গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারী শাহআলম কেন্দ্রে পদ ছাড়ার আবেদন করেন। দীর্ঘদিন ধরেই অর্থের জোরে ফতুল্লা বিএনপির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রক বনে যাওয়া এ নেতা নির্বাচনের আগে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ১৪টি মামলায় জড়িয়ে যাওয়ায় মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে ও জামিনের সহজের জন্যই এ পদত্যাগ কৌশল বেছে নিয়েছেন বলে দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

জানা যায়, ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সোনার হাস খ্যাত শাহ আলম চেয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচন করতে। বিএনপির টিকেটে নির্বাচন করবেন বলে দলের পেছনে অর্থ বিত্ত ব্যয় করেছেন। কিন্তু ২০ দলীয় জোটের শরীক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে নির্বাচনের আগেই স্বপ্নভঙ্গ হয় শাহ আলমের। এতে করে দলের বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন শাহ আলম। এর মধ্যে মামলায় জড়িয়ে পড়ায় কেন্দ্রীয় বিভিন্ন নেতাদের সাথে ম্যানেজ করে তিনি জেলা ও থানার পদ থেকে অব্যাহতি নেন। তবে কেন্দ্রীয় পদে ঠিকই রয়ে যান তিনি। এতে করে একদিকে তার রাজনৈতিক অবস্থানও টিকে থাকলো আবার জেলায় মামলার ঝামেলা থেকেও মুক্তি পেলেন।

শাহ আলমের ছক অনুযায়ী আগে থেকেই তার তৈরী করা ফতুল্লা থানা বিএনপির কমিটিই অনুমোদন দেয় জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক মামুন মাহমুদ। এখানে শাহ আলমের বলয়ের বাইরের কাউকেই সুযোগ দেয়া হয়নি। কমিটিতে কতজন আছেন এবং কাকে কোন পদ দেয়া হয়েছে তা স্বয়ং জেলার সাধারণ সম্পাদকও বলতে পারেনা।

ওই সময়ে শাহ আলম জানান, স্বাস্থ্যগত কারণে এই পদে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয় বলে পদত্যাগ করেছি। দেশ, জাতি ও জনগণের সেবা করার জন্য রাজনীতিতে এসেছিলাম। তবে আমার মা-বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত আফিয়া-জালাল ফাউন্ডেশন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জান্নাহ ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আজীবন জনগণের সেবা করে যাব। জনকল্যাণমূলক কাজে দলমত-নির্বিশেষে সকল এলাকাবাসীর সহযোগিতা কামনা করি।

নাশকতার মামলা দায়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন গত সেপ্টেম্বরে আমার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মোট ১১টি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। সম্প্রতি এই বিষয়ে অবগত হয়ে উচ্চ আদালত থেকে নাশকতার ওই মিথ্যা মামলায় জামিন পেয়েছি।’

জানা যায়, বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ সভাপতি শাহ আলমের কোন অংশগ্রহণ ছিল না। রাজপথে নেয়া দলীয় কোন কর্মসূচিতেই তার অংশগ্রহণ থাকতো না। মাঝে মধ্যে ঘরোয়া কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে থাকলেও সেটা খুব বেশি সময়ের জন্য না। এমনকি বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবীতেও শাহ আলমের সক্রিয় কোন ভূমিকা নেই। তার অবস্থা অনেকটা ‘কিতাবে আছে গোয়ালে নেই’ প্রবাদের মতো।

প্রসঙ্গত ২০০৭ সালের ওয়ান এলেভেনের পর থেকে হঠাৎ করেই আলোচনায় আসার চেষ্টা করেন ফতুল্লার জনপ্রিয় জালালউদ্দিন আহম্মেদ এর ছেলে শাহআলম। ওই বছরের তৃতীয় ধারার কিছু রাজনৈতিক দল গঠন হলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন শাহআলম। তিনি তখন নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে একটি ইফতার মাহফিলে মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিমকে অতিথি করেন। এ অনুষ্ঠানে অতিথিরা দেশের দুই দলের দুই নেত্রীর তীব্র ভর্ৎসনা করেন।

ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে একটি মিলনায়তনে কিংস পার্টি খ্যাত কল্যাণ পার্টির প্রকাশ ঘটে। এ অনুষ্ঠানে লোকজন নিয়ে শাহআলম উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দিয়ে কল্যাণ পার্টির জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করেন। কল্যাণ পার্টির প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিম সেদিন তার বক্তব্যে শাহআলমের উপর দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রদান করেন। শুরু হয় শাহ আলমের রাজনীতি। তখন শাহআলম মোটা অঙ্কের টাকা কল্যাণ পার্টিকে অনুদান দেন।

কিন্তু ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে বিএনপির মনোনয়ন পান শাহআলম। এ নির্বাচন নিয়েও অনেক নাটকীয়তা হয়। নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সারাহ বেগম কবরীর সঙ্গে পরাজিত হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর